মহাপ্লাবনের মতো প্রযুক্তির ঢেউ আসিতেছে

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০০:২৯

ইহাকে বলা যাইতে পারে আধুনিক আলাদিনের চেরাগ। আপনি চেরাগে ঘঁষা দিলেন, দৈত্য বাহির হইল, তাহাকে আদেশ দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুযায়ী কার্যসিদ্ধি হইয়া গেল। নূতন আলাদিনের চেরাগের নাম হইল ‘চ্যাটজিপিটি’। আলাদিনের দৈত্যের মতো সরাসরি কোনো কিছু বানাইয়া দিতে পারিবে না বটে, তবে যে কোনো গবেষণালব্ধ তথ্য হাজির করিতে পারিবে চ্যাটজিপিটি। ইহা কত বিশাল ব্যাপার, তাহা সম্ভবত এখনো আমরা উপলব্ধি করিতে পারিতেছি না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তথ্যই শক্তি। তবে কেবল তথ্য থাকিলেই হয় না, তথ্যের সমুদ্রে হাবুডুবু না খাইয়া সবচাইতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংক্ষিপ্ত আকারে পাওয়াটা বিশাল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আধুনিককালে ‘সময়’ অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস। সেই ‘সময়’কেই বিশালভাবে বাঁচাইয়া দিতে পারিবে চ্যাটজিপিটি।

কী এই চ্যাটজিপিটি? ইহা হইল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। যাহার পুরা নাম—‘জেনারেটিভ প্রি-ট্রেইনড ট্রান্সফরমার’। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বরে বিশ্বের প্রথম সারির মার্কিন গবেষণা ল্যাবরেটরি ওপেন এআই এই চ্যাটবট বাজারে আনিয়াছে। বলা যায়, চালু হইবার পর সমগ্র বিশ্বে হইচই ফেলিয়া দিয়াছে। চ্যাটজিপিটি সম্পর্কে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস সম্প্রতি বলিয়াছেন, বিশ্বকে বদলাইয়া দিবে চ্যাটজিপিটি। গেটস মনে করেন, পূর্বের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাগুলি সকল বিষয়ে লিখিতে ও পড়িতে পারিত (অনেকটা তোতাপাখির মতো); কিন্তু বিষয়বস্তু বুঝিত না; কিন্তু চ্যাটজিপিটি বিষয়বস্তুও বুঝে। যেমন—এত দিন আপনি জগত-সংসারের যাবতীয় হদিস গুগল ঘাঁটিয়া পাইয়াছেন। যাহা জানিতে চাহেন, গুগল আপনাকে লক্ষ লক্ষ পাতার তথ্য দিয়া সেইগুলি আপনার সামনে উপস্থিত করিয়াছে। আপনি হয়তো নির্দিষ্ট কোথাও বেড়াইতে যাইবেন, একটা ভ্রমণসূচি বানাইবার জন্য সম্ভাব্য ভালো জায়গাগুলির তালিকা চাহিলেন। গুগল আপনাকে লম্বা একটা তালিকা ধরাইয়া দিবে নানারকম তথ্যসহ। আপনাকে সেইখান হইতে বাছিয়া নানারকম পছন্দ-অপছন্দ, পয়সাকড়ির হিসাব কষিয়া একটা যথাযথ যাত্রাপথ বানাইলেন; কিন্তু আপনি যদি চ্যাটজিপিটিকে আপনার বাজেট, দিনক্ষণ ও কতদিনের সফর জানাইয়া তাহার সেরা মতামতটি চাহেন, সে নিমেষে আপনাকে নিখুঁত ও প্রায়-সর্বোৎকৃষ্ট একটি ভ্রমণসূচি বানাইয়া দিবে। মনে হইবে, আপনার অত্যন্ত দক্ষ ও পেশাদার কোনো ব্যক্তিগত সহকারী আপনার সকল ভালোমন্দ, সীমাবদ্ধতা ও শক্তি জানিয়া একটি অভূতপূর্ব পরামর্শ উপস্থাপন করিলেন। 

আশঙ্কা করা হইতেছে, চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ চাকুরির বাজার সংকুচিত হইয়া যাইবে। প্রথমত, ইহা নিমেষের মধ্যে প্রোগ্রাম কোড লিখিতে পারে। ফলে, সাধারণ প্রোগ্রামারদের প্রয়োজনীয়তা হয়তো আর তেমন থাকিবে না। দ্বিতীয়ত, কনজিউমার কেয়ার একজিকিউটিভদের শনির দশা হইবে। কারণ, চ্যাটজিপিটি ক্রেতার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ও নির্দিষ্ট পরামর্শ দিতে সক্ষম। তৃতীয়ত, সংবাদ, সমীক্ষা, উপ-সম্পাদকীয় লেখার কাজও করিয়া দিতে পারিবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবট। ইহার প্রখর তথ্যজ্ঞান অবশ্যই ঈর্ষণীয়। চতুর্থত, চ্যাটজিপিটির লেখার গুণমান ও ব্যাকরণ-জ্ঞান এতটাই সমৃদ্ধ যে, আইনি নথি ও দলিলদস্তাবেজ তৈরিতেও ইহা পুরোপুরি সক্ষম। শুধু তাহাই নহে, চাহিলে একটি চিত্রনাট্য কিংবা গল্প অথবা ব্যবসা-বাণিজ্যের কাগজপত্র—সকল কিছুই সে নিমেষের মধ্যে লিখিয়া দিতে পারে। অর্থাৎ, নিকট-ভবিষ্যতে আপাত-দৃশ্যে প্রায় সমস্ত মানুষই লেখক। কারণ, কে জানিতেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বা অন্য কোথাও আপলোড বা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা ঝরঝরে গদ্যটি আপনার নাকি চ্যাটজিপিটির! ইতিমধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ব্যাপারে সতর্কতা জারি হইতেছে। দেখা গেল, গত মাসে নর্দার্ন মিচিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক অ্যান্টনি অউমান একটি কোর্সে যখন কোনো এক ছাত্রের নিখুঁত পরিচ্ছেদ বিন্যাস, যথাযথ উদাহরণ ও কঠোর যুক্তি সংবলিত একটি পেপার দেখিয়া অভিভূত, তখন সে ছাত্রই তাহার নিকট স্বীকার করিয়াছে যে পেপারটি আসলে লিখিয়া দিয়াছে চ্যাটজিপিটি! সম্প্রতি ফ্রান্সের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ‘সায়েন্সেস পো’ নিষিদ্ধ করিয়াছে চ্যাটজিপিটির ব্যবহার। বলা হইয়াছে, রেফারেন্সে স্বচ্ছতা না রাখিয়া কোনো শিক্ষার্থী চ্যাটজিপিটির কোনো লেখা বা প্রেজেন্টেশন জমা দিতে পারিবে না। 

পৃথিবীতে যুগে যুগে মহাপ্লাবনের মতো প্রযুক্তির ঢেউ আসিয়াছে। আমরা তেমনই একটি ঢেউয়ের মুখে। ইহাই এই সময়ের বাস্তবতা।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন