গতকাল ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি সংবাদ শিরোনাম হলো, ‘সামাজিক নিরাপত্তায় ৫ কোটি মানুষ’। এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে দেশের দরিদ্র মানুষের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশে সাড়ে ১৪ কোটি মানুষের হিসাবে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি। এর মধ্যে অতি দরিদ্র দেড় কোটির মতো। এই চিত্র আসলে করোনার আগের। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী বর্তমানে জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি করোনা ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণে দরিদ্র লোকের সংখ্যাও বেড়েছে। শুধু চালের দাম বাড়ার কারণেই অনেকে নতুন করে দারিদ্র্যের কবলে নিষ্পেষিত হয়েছে।
বর্তমানে চলছে আমনের মৌসুম। আমনের ফলন আশানুরূপ। কিন্তু আমন ধানের ‘হার্ভেস্টিং’ বা কাটামারি মৌসুমেও চালের দাম কমছে না। ব্যাপারটা কী? গৃহস্থরা এই ধান নিয়ে সারা বছরের অপূরিত স্বপ্নসাধ পূরণের জন্য পরিকল্পনা নিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রান্তিক কৃষকেরা এই দাম বাড়ার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অন্যদিকে খেটে খাওয়া দিনমজুর ও স্বল্প আয়ের মানুষ বাজারে মোটা চালের অগ্নিমূল্যের কাছে অসহায় হয়ে ক্রয় কমিয়ে দিয়ে কম করে খাচ্ছেন। দরজার সামনে আগে যে ভিক্ষুক পাঁচ টাকা পেলে খুশি হতো, বর্তমানে সে টাকাপয়সার পরিবর্তে একমুঠো ভাত খেতে চায়!
বিষয়টা একটু খোলাসা করে বললে বলা যায়, প্রান্তিক কৃষকেরা ধান ঘরে তোলার শুরুতেই বিক্রি করে ঋণ শোধ ও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সে সময় সবাই একসঙ্গে ধান বিক্রি শুরু করলে স্থানীয় বাজারে নতুন ধানের দাম হঠাৎ কমে যায়। ফড়িয়ারা কম দামে ধান কিনে জমা করেন। কিন্তু সেই ধান কিছুদিনের মধ্যে বেশি লাভের হিসাব কষে মিলমালিক ও সরকারি শস্য সংগ্রহকারী বা ক্রয়কারীদের কাছে বিক্রি করে দেন। এতে মাঠ পর্যায়ের উত্পাদনকারী ক্ষুদ্র কৃষক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা লাভের নাগাল না পেলেও মুনাফার অঙ্ক বেড়ে চলে যায় মিলের মালিক ও বড় ব্যবসায়ীদের হাতে। তারা চাল বানিয়ে বাজারে বিক্রি করেন অধিক মুনাফায়।
সেই অগ্নিমূল্যের চাল এখন বাজারে সয়লাব। কিন্তু দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ সেই নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল কিনতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। চালের বাজার নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে কতিপয় মুনাফালোভী মিলমালিক ও মজুতদার ব্যবসায়ীদের হাতে। এটাকে তারা বলছেন ‘সুপার নরমাল প্রফিট’। কিন্তু সাধারণ ভোক্তারা এই ‘সুপার নরমাল প্রফিট’-এর ফাঁদে অসহায় হয়ে পড়েছেন।
তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য মেলাতে না পেরে গোলমেলে অবস্থার মধ্যে জীবনযাপন চলছে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ আগে চালের দাম বাড়লে আটা কিনে রুটি খেতেন। ব্যবসায়ীরা আমদানি করা গম বা আটার মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাই এখনকার বাজারে আটার অগ্নিমূল্য আকাশ ছুঁয়েছে। সেখানে তাদের বিকল্প খোঁজার কোনো উপায় নেই। এছাড়া সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে বিকল্প উপায় হারিয়ে সাধারণ মানুষ হাবুডুবু খাচ্ছে।
এক্ষেত্রে আমার একটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে। আমরা লক্ষ করছি, হঠাত্ করে বসতবাড়িতে ভিক্ষুক ও ভাসমান দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শহরের সুন্দর সুন্দর ভবন সম্বলিত আবাসিক এলাকায় ভিক্ষুক প্রবেশের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বহুতল ভবন বেড়ে যাওয়ায় নিচতলার সদর দরজায় ভিক্ষুকদের আটকে দেওয়ার কৃষ্টি শুরু হয়েছে। করোনার সময় নিষেধাজ্ঞা মাথায় নিয়ে বাড়িতে ভিক্ষুক আসা কমে গেলেও ২০২৩ সালের শুরুতে দৈনিক ৩০ ও শুক্রবার ৭০ জন পর্যন্ত ভিক্ষুক লক্ষ করা গেছে। তারা আগের মতো ৫-১০ টাকা ভিক্ষা নিতে চায় না। তারা এখন টাকাপয়সা ভিক্ষার পরিবর্তে ভাত বা খাবার পেতে করুণ আকুতি জানায়। কারণ, ভিক্ষার টাকা দিয়ে তারা বাজার থেকে প্রয়োজনীয় চাল-আটা ও অন্যান্য খাবার কিনতে পারছে না। সরকারি সাহায্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে এসব ভিক্ষুক ও ভাসমান মানুষের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ মেলে না। বিত্তশালীদের বদ্ধ দুয়ারনীতি শুরু হওয়ার ফলে এদের বেঁচে থাকার অবলম্বন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এভাবে দরিদ্রদের প্রতি ধনীরা কপট হয়ে ঘরের কপাট বন্ধ করে দিতে থাকলে অভাবীরা হাত পাতবে কোথায়?
এ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে কার্যত বলা যায় আমাদের চিরায়ত সামাজিক নিরাপত্তাবলয় ভেঙে গেছে। স্বীকার করি, আমাদের সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির আওতায় ভাতা প্রদান কার্যক্রমে ডিজিটালের ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে কেন? আসলে গলদটা কোথায়? আসলে আমরা সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নিম্ন আয়ধারী, ভাসমান দরিদ্র ও প্রকৃত ভিক্ষুকদের জন্য স্থায়ী খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারিনি। হঠাত্ করে সেটা সম্ভবও নয়।কিন্তু এভাবে বাড়বে কেন? ভিক্ষুকদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যানও নেই। তাদের ব্যাপারে আরো খোঁজ-খবর করে পুনর্বাসনের চেষ্টা করতে হবে। এই সামাজিক ব্যাধি বা ভয়ানক আনস্মার্ট বিষয়টি প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে হবে সবার আগে।
অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষকদের অবস্থা বেগতিক হওয়ার কারণ তারা নিজের সামান্য জমি ছাড়াও চুক্তিতে অন্যের জমি বর্গাচাষ করেন। কিন্তু সেচের জ্বালানি, বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদির দাম বাড়ার কারণে উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ফসল ফলিয়ে তাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাদের লাভের অঙ্ক পিঁপড়া ও বড় ব্যবসায়ীরা খেয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে গ্রামীণ সমাজে দরিদ্র কৃষকেরা আরো বেশি দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। এভাবে বাপ-দাদার কৃষি পেশা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ায় কৃষিশ্রমিকের অভাবে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সে জন্য কোনোভাবেই চাল বা খাদ্যপণ্যের দাম কমানোর সরকারি নীতি-নির্দেশনা কাজে আসছে না। মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম কম, কিন্তু চালের দাম কমছে না। বাজারে চাহিদা বেশি, সরবরাহ কম। তাই দাম বেশি হওয়ার কথা। অর্থনীতির এই তত্ত্ব যদি সঠিক হয়, তাহলে চালের চাহিদার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সংকটের সময় সরবরাহের তথ্য প্রকাশ করা হয়। পর্যবেক্ষকগণ বলেন, তাহলে নিশ্চয়ই পথে যেতে যেতে সরবরাহের চাল হারিয়ে যায়। তা-না হলে চালের বাজার গরম কেন?
আমনের ভরা মৌসুমে চালর দাম কেন বাড়ে—এ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের শেষ নেই। প্রতিদিন আলোচনা শেষে অভিযোগের পাল্লা চলে যাচ্ছে একশ্রেণির চালকল মালিক ও বড় চাল মজুতদার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। তারা খেয়ালখুশিমতো চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করেন। এটা নিয়ন্ত্রণ নয়, বাড়ানোর কারসাজি। তাদের অতি মুনাফা ও লোভের কাছে ভোক্তারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষ যাবে কোথায়?
ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। তাই চাল একটি নিত্যপণ্য। এ নিয়ে ইঁদুর-বিড়াল খেলা ঠিক নয়। সরকারি ভাষ্যে প্রায়শই বলা হয়, ‘চালের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।’ সরকারি গুদামে মজুত বা ব্যবসায়ীদের সাইলোতে মজুত থাকলে বণ্টনে গরমিল কেন? যথার্থ মনিটরিং কি নেই? বাজারে মুদি দোকানে আজকাল চালসহ মাছ, মাংস, তেল, বিস্কুট, আটা, লবণ, চিনি ইত্যাদির মূল্যতালিকা ঝুলিয়ে রেখে অসহায় ক্রেতাকে প্রহসন করে। মজুত আছে সেই হিসাব শুনে অসহায় ভোক্তাদের কী লাভ? ক্রেতারা চায় নিজেদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে খাদ্যপণ্য কিনতে। এজন্য সবার ক্রয়ক্ষমতার দিকে লক্ষ না রেখে সরকারি প্রচারণা শুনতে শুনতে সাধারণ মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে কম কম খেয়ে বা না খেয়ে দিনাতিপাত করে চলেছে। এসব কথা দরিদ্র মানুষের ঘরে গিয়ে পাশে বসে না শুনলে বা পর্যবেক্ষণ না করলে রাজধানীতে বসে উপলব্ধি করার উপায় নেই। সাধারণ মানুষ টিভি বা অনলাইনে দেওয়া পর্যাপ্ত খাদ্য মজুতের কথা শুনে তাদের পেট ভরাতে পারবে না।
কোনো কিছুতে মুনাফা হলে সরকার সেটাকে নিজের করে নেয়। সাধারণ মানুষের আয় বা লভ্যাংশ তাতে বাড়ে না। কিন্তু সরকার কোনো কিছুতে লস্ বা ক্ষতির সম্মুখীন হলে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে জনগণের ওপর সেই দায়ভার চাপিয়ে দেয়। দেশের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ নিম্ন আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এ দেশে শতকরা ২০ ভাগ মানুষের হাতে ৮০ ভাগ সম্পদ ও সুযোগ কেন্দ্রীভূত বা কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। কোনো কিছুর মুনাফা অর্জিত হলে সেটার মূল ভাগ তারাই ভোগ করে। ফলে ক্রয়ক্ষমতা ও মৌলিক চাহিদা ভোগের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের সামাজিক ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়ে গেছে। সামাজিক নীতিনির্ধারকগণ এ কথা জেনেও কিছুই করতে পারছেন না।
এদিকে দেখা যাচ্ছে খোলাবাজারে বিক্রির (ওএমএস) চাল কেনার জন্য মানুষের লম্বা লাইন। কিন্তু ওএমএসের পণ্য কিনতে একটি অসাধু চক্র নিজেরা নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি একত্রিত করে রেখে সবার আগে লাইন দখল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। এটা একটা জালিয়াতি। একই ব্যক্তির বারংবার লাইনে দাঁড়ানো ঠেকানোর জন্য হাতের তালুতে সিরিয়াল লিখেও দুষ্ট চক্রের কারণে ঠেকানো যাচ্ছে না ওএমএসের এই অবৈধ পণ্য ক্রয়। ট্রাক দেখলে সবার সামনে সিরিয়াল দিয়ে ঠেলে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনে সেগুলো অন্যত্র বিক্রি করে মুনাফা লুটছে। এখানেও দুষ্ট সিন্ডিকেট আগেভাগে চাল কিনে ফেললে অসহায় দরিদ্র মানুষ কোথায় কার কাছে খাদ্যের নিরাপত্তা পাবে?
এভাবে অদক্ষ শ্রমিক, ভিক্ষুক ও অসহায়দের খাদ্যসাহায্য পাওয়ার জায়গাগুলো সংকুচিত হওয়ায় তাদের আয় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এদের মধ্যে কম আয়, কম ভিক্ষাপ্রাপ্তি, কম কেনা, কম খাওয়ার যুগও শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে ক্রমাগত অপুষ্টি স্বাস্থ্যহীনতার জন্য স্বাস্থ্যনীতির ওপর আরো চাপ বেড়ে যাবে অচিরেই। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নৈতিকতাসহ সার্বিক সামাজিক নিরাপত্তাবলয় ভেঙে দুর্বিষহ সামাজিক অস্থিরতা ও ভাঙন শুরু হয়ে যাবে।
আমনের ভরা মৌসুমেও কিনতে অপারগ মোটা চালের ভোক্তারা। নিয়ন্ত্রণহীন খাদ্যপণ্যের বাজারে অভুক্ত মানুষের বোবা কান্না কে শোনে? সৎভাবে বাঁচার জন্য চেষ্টা করে যাওয়া স্বল্প আয়ের লোকদের কান্না শোনার কেউ কি নেই? এসব ভাবনা ও আশঙ্কাকে বিনাশ করার জন্য নতুন কর্মপরিকল্পনা কোথায়? সাধারণ জনগণ চায় মৌলিক নিত্যপণ্যের বাজারমূল্য তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও নাগালের মধ্যে থাক। সহজে খাদ্য মিলুক, সহজে পুষ্টি মিলুক, বাঁচার পথ খোলা থাকুক সবার জন্য।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন
