কোথাও শৃঙ্খলা নাই কেন 

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০০:২৭

কি সরকারি প্রতিষ্ঠান আর কি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশের সর্বত্রই যে বিষয়ের সর্বাধিক ঘাটতি, তাহা হইল শৃঙ্খলা। ঘরে ও বাহিরে—সর্বত্র। রাস্তায় শৃঙ্খলা নাই, ভবনের ভিতরে শৃঙ্খলা নাই, এমনকি টেবিলের ফাইলেও নাই শৃঙ্খলা। অথচ আমরা জানি, উন্নত হইবার প্রধান উপজীব্য হইল শৃঙ্খলা। দীর্ঘকাল যাবত শৃঙ্খলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রে একটি কথা চালু রহিয়াছে। বলা হয়—অর্থ, ক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থানের উপর সফলতা নির্ভর করে না, নির্ভর করে একমাত্র শৃঙ্খলার উপর। ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি এই কথা একটি রাষ্ট্র বা জাতির সকল কর্মতৎপরতার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য। যেই জাতির শৃঙ্খলা নাই, সেই জাতি সর্বার্থেই দরিদ্র। অতএব, শৃঙ্খলা শিখানো না গেলে আমাদের অগ্রযাত্রা হোঁচট খাইতে বাধ্য হইবে। ইহা মানুষকেও শিখাইতে হইবে, ইহার সহিত দায়িত্বশীলদেরও শিখিতে হইবে। দেশ স্বাধীন হইয়াছে অর্ধশতাব্দী হইয়া গেল। এখনো যদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা শিখানো না যায়, তাহা হইলে কোনো প্রচেষ্টাই বরকত আনিবে না বলিয়াই আমরা মনে করি। আর এই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করিতে হইলে অন্যায়কে অন্যায় বলিয়া বিবেচনা করিতে হইবে। অন্যায়ের যদি সঠিক শাস্তি না হয়, তাহা হইলে কোনো প্রচেষ্টাতেই শৃঙ্খলা আসিবে না। ভাবিতে হইবে, যাহারা অন্যায় করিতেছেন তাহাদেরকে শাস্তির আওতায় আনিলে দেশের জনগণ কাহার পক্ষে থাকিবে? নিশ্চয়ই তাহারা সমস্বরে শাস্তির আওতায় আনাকেই স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানাইবে! 

প্রশাসনের ক্ষেত্রে আমরা কী দেখিতে পাইতেছি? রাস্তায় সিগন্যাল হইতে শুরু করিয়া উঁচু ভবনে উপবিষ্ট কর্মকর্তা—সর্বত্র শৃঙ্খলার অভাব দৃষ্টিগোচর হয়। সড়কে সিগন্যাল আছে, মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সার্জেন্ট দাঁড়াইয়া আছেন। ভয়ানক যানজটের এই দেশে দেখা যায়—‘পাপা’ আসিল, তাহাকে সর্বাগ্রে সিগন্যাল পার করিতে হইবে! যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে আর সিগন্যালের প্রয়োজন কী? বিশৃঙ্খলা এমন পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইন ও লিখিত নির্দেশাবলি পর্যন্ত মানা হয় না। আমরা প্রায়শই ‘সরকারি নির্দেশনা অমান্য করায় জরিমানা’ সংবাদ দেখিয়া থাকি; কিন্তু লক্ষ করিলেই দেখা যাইবে, তাহা নিতান্তই চুনাপুঁটি ব্যক্তি বা ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। ‘রুইকাতলা’ তো বটেই, এমনকি সরকারের প্রতিষ্ঠানও যখন নিয়ম মানে না, তাহাকে কী বলিব? সরকারি উন্নয়ন খাতে প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতি সম্পর্কে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশ রহিয়াছে, কোনো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকা বা তাহার অধিক হইলে উহা বাস্তবায়নের জন্য একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ করিতে হইবে। একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক হিসাবে নিয়োগ করা চলিবে না; কিন্তু দায়িত্ব পালনের উপর্যুক্ত কর্মকর্তা পর্যাপ্ত না থাকিবার অজুহাতে সরকারের সেই নির্দেশনা আজও বাস্তবায়িত হয় নাই। আবার দেখা যায় প্রকল্প চলাকালে পরিচালকের পদোন্নতি হইলে প্রকল্পে স্থবিরতা নামিয়া আসে। সরকারপ্রধানের উপর তো কেহ নাই। প্রয়োজনে লোক নিয়োগ করাটাই কি দরকার নহে? জনপ্রশাসনে চলিতেছে নানা ধরনের কনট্রাডিকশন। উপজেলা প্রশাসনের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রায়শই সেই সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসনে গিয়া বাতিল হইয়া যায়। ইহাতে দেখা যায়, উপজেলা প্রশাসনের সময় ব্যয় হইয়াছে, অর্থ ব্যয় হইয়াছে; তদুপরি ইহা উপজেলা প্রশাসনের জন্য অপমানকরও বটে। ইহা যে শৃঙ্খলা ঘাটতির কারণেই হইতেছে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।  

যাহারা রাষ্ট্রের কাজে সম্পৃক্ত আছেন তাহাদের বহির্বিশ্ব দেখিবার ঘাটতি রহিয়াছে। পৃথিবীতে যেই সকল রাষ্ট্র উন্নত হইয়াছে তাহাদের প্রত্যেকটি দেশই শৃঙ্খলাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়াছে। এই সকল উন্নত দেশের কর্মপদ্ধতি, কর্মনিষ্ঠা, কর্মের ব্যাপারে শক্ত অবস্থান লক্ষ করিতে হইবে। শুধু লক্ষ করিলেই চলিবে না, তাহা বাস্তবায়নেরও সর্বোচ্চ উদ্যোগ লইতে হইবে।  

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন