সিরিয়ায় ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়ের পর দ্রুত সাড়া প্রদানে জাতিসংঘের এই ব্যর্থতা লজ্জাজনক। যখন আমি জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, কেন সাহায্য সময়মতো পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো, তখন এর উত্তর ছিল—আমলাতন্ত্র! বিশ্বে বছরের পর বছর নানা রকমের দুর্যোগ আঘাত হানছে। এই দুর্যোগের সবচেয়ে মারাত্মক বিপর্যয়ের সময় মনে হচ্ছে জাতিসংঘের হাত বাঁধা থাকে লাল ফিতা দিয়ে।
তুরস্ক ও সিরিয়ায় স্মরণাতীতকালে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে আমরা যে ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখলাম, তা সিরিয়া যুদ্ধের অন্ধকারতম সময়েও এতটা ব্যথা-বেদনা অনুভব করিনি। উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় আমাদের হোয়াইট হেলমেট স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধারকর্মীদের দল রাত-দিন কাজ করে চলেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকদের টেনে আনছে এবং আর কেউ বেঁচে আছে কি না, তার অনুসন্ধান করছে। কার্যত বহির্বিশ্বের তেমন কোনো সাহায্য ছাড়াই তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছে।
বেঁচে থাকা নতুন কাউকে আর খুঁজে পাওয়ার আশা আমাদের এখন ফিকে হয়ে আসছে। আমরা যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে আরো মৃতদেহ টেনে আনছি, তখন আমাদের হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। প্রত্যেকের জন্য আমাদের কষ্ট হচ্ছে। কেননা, আমরা সময়মতো প্রয়োজনীয় সাহায্য পেলে এসব লোককে বাঁচানো যেত। আমরা অযথাই তাদের হারিয়ে ফেললাম। এখানে আমরাই একমাত্র সংস্থা, যাদের এমন দুর্যোগে অনুসন্ধান চালানো এবং উদ্ধারের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকেরা অসম্ভব কাজ করে চলেছেন। আমি নিঃস্বার্থ ও নিবেদিতপ্রাণ এই মহত্ কাজের জন্য তাদের প্রতি বিণীতভাবে সম্মান জানাই।
যদিও জাতিসংঘের মানবতাবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ও জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী মার্টিন গ্রিফিথস ভূমিকম্পের পরে অনুসন্ধান ও উদ্ধার প্রচেষ্টাকে ‘ইতিহাসে অতুলনীয়’ কাজ বলে স্বাগত জানিয়েছেন, তথাপি উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় বিদ্যমান সীমিত সাজ-সরঞ্জাম ও জনবল দিয়েই আমাদের কাজ করে যেতে হচ্ছে। আরো খোলাসা করে বলতে হয়, উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে হোয়াইট হেলমেটরা জাতিসংঘের কাছ থেকে কোনো ধরনের সমর্থন পাননি। এমনকি আমাদের কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে এবং পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রচেষ্টায় সহায়তা করার জন্য এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের তরফ থেকে আমাদের কোনো ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।
গত রবিবার আমি গ্রিফিথসের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি স্বীকার করেছেন, জাতিসংঘ তাত্ক্ষণিকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে, উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার লোকদের হতাশ করেছে। ‘আমরা এখন পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার জনগণের জন্য কিছু করতে ব্যর্থ হয়েছি। তারা ঠিকই অসহায় ও পরিত্যক্ত বোধ করছে। তারা আন্তর্জাতিক সাহায্যের অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু তা আসেনি’—গ্রিফিথস গত রবিবার টুইটারে এমন কথাই লেখেন।
ভূমিকম্প আঘাত হানার পর বাব আল-হাওয়ায় জাতিসংঘের সাহায্য বিতরণের জন্য অনুমোদিত একমাত্র সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় যে কোনো আন্তর্জাতিক সাহায্য আসতে সময় লেগেছে চার দিন। প্রথম ডেলিভারিতে ছিল তাঁবু, আশ্রয়সামগ্রী এবং মৌলিক ত্রাণসামগ্রী। কিন্তু আমাদের উদ্ধার প্রচেষ্টায় সাহায্য করার মতো কিছুই ছিল না।
সিরিয়ায় ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়ের পর দ্রুত সাড়া প্রদানে জাতিসংঘের এই ব্যর্থতা লজ্জাজনক। যখন আমি জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, কেন সাহায্য সময়মতো পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো, তখন এর উত্তর ছিল—আমলাতন্ত্র! বিশ্বে বছরের পর বছর নানা রকমের দুর্যোগ আঘাত হানছে। এই দুর্যোগের সবচেয়ে মারাত্মক বিপর্যয়ের সময় মনে হচ্ছে জাতিসংঘের হাত বাঁধা থাকে লাল ফিতা দিয়ে।
গ্রিফিথস সপ্তাহান্তে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে দুটি অতিরিক্ত সীমান্ত ক্রসিংয়ের মাধ্যমে সহায়তা পাঠানোর বিষয়টি অনুমোদন করার জন্য বলেছে। এটা একটা বিভ্রান্তিকর পদ্ধতি। এর জন্য মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে। আইনি বিশ্লেষক ও পণ্ডিতেরা এর বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছেন। মানবিক ও ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে, যে কোনো দেশে এ ধরনের ত্রাণসাহায্যের গাড়ি প্রবেশে রাজনীতিকরণের প্রয়োজনীয়তা নেই।
জাতিসংঘকে আরো ভালো কাজ করতে হবে। জরুরি অবস্থার সময় মানুষের জীবন রক্ষা ও বাঁচানোর জন্য বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে, যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে শিশুরা আর মারা না যায়। তাদের রক্ষায় নষ্ট না হয় মূল্যবান মিনিট ও ঘণ্টা।
জাতিসংঘ গত সোমবার ঘোষণা করেছে, বাশার আল-আসাদ সরকার মানবিক ত্রাণসহায়তার সুবিধার্থে তিন মাসের জন্য উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় আরো দুটি ক্রসিং পয়েন্ট খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস বলেছেন, এই ক্রসিং পয়েন্টগুলো খোলার ফলে তা ‘দ্রুত আরো সাহায্য প্রবেশের পথ উন্মুক্ত করবে’।
আসাদের এই হস্তক্ষেপ অনেক দেরিতে এলো। এই কালক্ষেপণ একটি নিষ্ঠুর পদক্ষেপ। সিরিয়ার শাসকের অনুমতির অপেক্ষায় থাকার জন্য জাতিসংঘের এই জেদ ক্ষমার অযোগ্য। বিশেষ করে তারা এমন সরকারের অনুমতি চাইছেন, যারা নিজ নাগরিকদের ওপর বোমাবর্ষণ করেছে, গ্যাস দিয়ে মানুষ মেরেছে, মানুষকে ক্ষুধার দিকে ঠেলে দিয়েছে, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করেছে এবং লাখ লাখ সিরিয়ানকে কারারুদ্ধ করেছে। এই অবস্থায় সিরিয়ার সরকার যেসব সিরিয়ানের দুর্দশা মোকাবিলায় নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে কাজ করবে না, তা কোনো গোপন বিষয় নয়।
বছরের পর বছর ধরে আসাদ সরকার তার মিত্র রাশিয়ার সহায়তায় মানবিক সহায়তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বেসামরিক লোকদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে, যদিও ভূমিকম্পের আগেও প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ যুদ্ধবিগ্রহের কারণে ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়। রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে তার ভেটো অস্ত্র ব্যবহার করে বারবার সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দিয়েছে, তুরস্কের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত সাহায্য সরবরাহের পথগুলো দিয়ে প্রবেশ কমিয়ে দিয়েছে। তাই অস্থায়ী ভিত্তিতে অতিরিক্ত ক্রসিং খোলাই যথেষ্ট নয়, আরও আন্তঃসীমান্ত রুট এখন খুবই প্রয়োজন।
প্রয়োজনের সময় সিরিয়ার বেসামরিক নাগরিকদের দিক থেকে আবারও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা জাতিসংঘকে ক্ষমা করতে পারি না। আমরা যখন হাজার হাজার ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে অনুসন্ধান করেছি, তখন স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলোই আমাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে:মানবিক কাজে সাহায্য করতে তাদের গাড়ি ও ভারী যানবাহন ধার দিয়েছে, খননকাজে সাহায্য করেছে এবং জ্বালানি দান করেছে, যা তারা নিজেদের উষ্ণ রাখতে ব্যবহার করতে পারত। এই ভূমিকম্প যে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, তা মোকাবিলা করতে তারা হিমশিম খাচ্ছে। সিরিয়ানদের আরো সমর্থন প্রয়োজন এবং এটা তাদের প্রাপ্যও বটে। আমাদের স্থানীয় সংস্থা ও স্থানীয় নাগরিকদের স্বীকৃতি প্রয়োজন। পুনর্বাসনে তাদের প্রয়োজন আরো অর্থায়ন।
সময় নষ্ট করার কোনো অবকাশ নেই। ইতিহাসের সঠিক সময়ে নিজেকে মেলে ধরার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের অবশ্যই ভিশন ও সঠিক নেতৃত্ব থাকতে হবে। ভবিষ্যতে মানবিক সাহায্যের প্রবেশ সীমাবদ্ধ করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদ ও সরকারকে ব্যবহার করা সংগত হবে না। সিরিয়ায় আরো প্রাণহানি এড়াতে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো যাতে অবাধ প্রবেশাধিকার লাভ করে, গুতেরেসকে সেই বিষয়টি অবিলম্বে সুনিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা হোয়াইট হেলমেটের প্রধান। তার নেতৃত্বে সংস্থাটির প্রায় ৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের একটি দল সিরিয়ায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে কাজ করছে।
সিএনএন থেকে অনুবাদ : ফাইজুল ইসলাম
