সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে গড়িমসি

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৪:৪১

২০২২ সালে ভয়াবহ বন্যার পর সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে গড়িমসি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, অধিকাংশ স্থানে মাটি দুরমুজ হয়নি। এছাড়া আগামী বোর ফসল নিয়ে উদ্বিগ্ন হাওয় অঞ্চলের কৃষকরা। তবে এ নিয়ে পানি বোর্ডের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটি বাতিলের পাশাপাশি মার্চের প্রথম সপ্তাহে কাজ শেষ হবে আশা প্রকাশ করেছেন উপমন্ত্রীর একেএম এনামুল হক শামীম। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর সুনামগঞ্জে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় জেলার ছয় হাজার ৮৮০ হেক্টর জমির ১২১ কোটি টাকা  ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এতে কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। তারপরও এবার অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে কোমর বেঁধে সুনামগঞ্জের কৃষকরা বোরো ফলিয়েছেন মাঠে মাঠে। বর্তমানে সবুজ ধানের চারা লিক লিকিয়ে বেড়ে উঠছে।  

এদিকে, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও অকাল বন্যার কবল থেকে ফসলটি রক্ষায় ‘হাওর রক্ষা বাঁধ’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। 

এবিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগীতায় হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়। আর বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ড কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে থাকে। এ বছর জেলায় এক হাজার ৮৯ প্রকল্পের জন্য ২০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। এ পর্যন্ত ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। অর্থ ছাড় হয়েছে মাত্র ২৫ কোটি টাকা। কিন্তু পিঅইিসিগুলোর গড়িমসির কারণে অনেক স্থানে বাঁধের কাজে মন্থর গতিতে চলছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানায়, কাজ বিলম্বের কারণে কৃষকরা এবারও তাদের ফসল নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় রয়েছে। হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা। কারণ ফেব্রুয়ারির শেষ বা মার্চে চেরাপুঞ্জির কাছে অবস্থিত সুনামগঞ্জে অনেক সময় বৃষ্টি ও ঢল নামে। তাই সমুদয় ফসল তলিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। 

তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এক হাজার ৭৮ বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এতে ৭৪৫ দমমিক ৭৭৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও পুননির্মাণ করা হবে। ২১৮টি ক্লোজার বন্ধ করা হবে। এ জন্যে এক হাজার ৬৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়। এ পর্যন্ত ১৪৭ পিআইসির কাজ চলমান। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক স্থানে শুধু বাঁধের ওপর মাটি ফেলা হয়েছে। কম্পেকশন বা ড্রেসিং হয়নি। গুরমার হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ সুন্দর হলেও বার্ধিত অংশের (টাঙ্গুয়া সংলগ্ন) অবস্থা খারাপ। সেখানে এক্সভেটর দিয়ে মাঠি ভরাট করা হলেও কাজের গতি কম। তবে কোনো কোনো স্থানে বাঁধের গায়ে দুর্বাঘাসও লাগানো হচ্ছে।   

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমাল চন্দ্র সোম জানান, সিলেট বিভাগের মধ্যে সুনামগঞ্জ সবচেয়ে বেশি বোরো ফসল উৎপাদন হয়ে থাকে। ১২ উপজেলার প্রকৃতি নির্ভর মৌসুমী এ ফসল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ফসল জাতীয় খাদ্য ভাণ্ডারে যুক্ত হয়। এবার দুই লাখ ২২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ চলছে। সব ঠিক থাকলে সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন চাল পাবে কৃষক। 

তিনি জানান, খাসিয়া ও জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে জেলা অসংখ্য নদী ও হাওর বেষ্টিত জেলায় মৌসুমের শুরুতেই অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল নেমে অকাল বন্যা দেখা দেয়। তখন ফসলের মাঠ, বাড়িঘর বিপন্ন হয়ে পড়ে। গত বছর স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জে ছয় হাজার ৮৮০ হেক্টর জমির ১২১ কোটি টাকা ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায়।     

এদিকে একে তো পিআইসি গঠনে দেরি, অন্যদিকে একমাত্র বোরো ফসল রক্ষায় হাওরের বাঁধ নির্মাণে অনেক স্থানে নিয়মনীতিই মানা হচ্ছে না অনেক বাঁধের পাশ থেকেই মাটি তুলে শুধু মাটি ফেলেই শেষ, দুরমুজ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। পিআইসি গঠনেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। 

উপজেলার মাটিয়ান হাওর পাড়ের কৃষক ফারুক মিয়া জানান, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে বাঁধ নির্মাণ কাজ করার কারণে সামান্য পানির চাপে বাঁধে ভেঙে যাবে। আর চালু হওয়া বেশিরভাগ পিআইসি নিয়ম মোতাবেক দুরমুজ না করায় বাঁধ মজবুত থাকবে না। পানি আসলে সেই ফাঁকা অংশ দিয়ে চুইয়ে বাঁধ ভেঙে যাবে। 

তাহিরপুর উপজেলা হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী শওকতুজ্জামান জানান, এই বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করে আমরা ব্যবস্থা নেব। 

তাহিরপুর উপজেলা হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুপ্রভাত চাকমা জানান, যে সকল পিআইসি নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তাহিরপুর উপজেলায় এবার ১১৩টি পিআইসি অনুমোদন করা হয়। এবার ৮৪.৫০০ শত কিলোমিটার বাঁধ হবে আর বরাদ্দ ২০ কোটি ৮৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকা বলে তথ্য পাওয়া গেছে।  

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হাসান উদ দৌলা বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে ১৭ হাজার ৩৯৩ হেক্টর জমিতে ইরি-বোর ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ৮০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি চাল উৎপাদন হবে। এর মূল্য ২শ ৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি।

এদিকে বুধবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) হাওর রক্ষা প্রকল্প পরিদর্শন করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম  বলেন, এ পর্যন্ত ৫৪ ভাগ বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি মার্চের প্রথম সপ্তাহে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সকল কর্মকর্তা কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে দিয়েছেন বোরো ফসল ঘরে উঠা না পর্যন্ত। 

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষকদের নিয়ে ভাবেন। তাই হাওর রক্ষা বাঁধে কোনো অনিয়ন বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। সরকার এব্যাপারে কঠোর।

ইত্তেফাক/আরএজে