যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবী: ‘হে কবি! নীরব কেন?’

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:০০

আমরা এ কোন পৃথিবীতে বসবাস করিতেছি আজ! ইউক্রেন যুদ্ধের এক বৎসর পূর্তি হইতে যাইতেছে। অথচ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর কোনো প্রতিবাদ নাই? শান্তিকামী বিশ্ববাসীর বিক্ষোভ আজ কোথায়? ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও হতাহত নারী ও শিশুদের সহায়তার জন্য নাই ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহের কোনো প্রচেষ্টা! বিশ্বের তাবৎ বুদ্ধিজীবীর মুখে আজ নাই কেন ভাষা? আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন হইতে শুরু করিয়া সর্বশেষ ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বারংবার যুদ্ধের দামামা কি আমাদের বোবা ও অসাড় করিয়া দিয়াছে? আমরা কি ‘অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর’-এর ন্যায় নীরব ও  নিস্তব্ধ হইয়া গিয়াছি? কিংবা যুদ্ধের মধ্যে না থাকিয়াও যুদ্ধের মধ্যে থাকিবার কারণে হইয়া পড়িয়াছি নিরুপায় ও স্বার্থপর?

ইউক্রেন যুদ্ধ সমস্ত পৃথিবীকে বদলাইয়া দিয়াছে, করিয়া তুলিয়াছে নিষ্ঠুর ও নিষ্প্রাণ। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ইহা পরোক্ষভাবে যে ক্ষতের সৃষ্টি করিয়াছে, তাহার মহৌষধ কোথায়? করোনা মহামারির পর এই সকল দেশ হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিতে চাহিয়াছিল; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধ আজ তাহাদের করিয়া তুলিয়াছে দিশাহারা। তাহাদের দুঃখ-দুর্দশার অন্ত নাই; কিন্তু তাহারও চাইতে কষ্টদায়ক হইল, তাহারা সকল কিছু অনুভব করিতে পারে বটে; কিন্তু মুখ ফুটিয়া কিছুই বলিতে পারে না। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার খড়েগ তাহাদের হাত-পাও যেন বাঁধা। শক্তিধরদের নাখোশ হইবার ভয়ে প্রতিনিয়ত তটস্থ। এই কোন পৃথিবীর রূপ দেখিতেছি আমরা? একটা বৃহত রাষ্ট্র একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের উপর সর্বশক্তি দিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িয়া তাহাকে মাটির সহিত মিশাইয়া দিতেছে। ঠুঁটো জগন্নাথ জাতিসংঘও বলিতে গেলে নীরব ও নিশ্চুপ। সেইখানে সাধারণ সদস্য দেশগুলির পক্ষ হইতে উঠিতেছে না প্রতিবাদের ঝড়।

এইদিকে ইউক্রেনকে যাহারা অস্ত্রশস্ত্র ও টাকাপয়সা দিয়া সহায়তা করিতেছেন, তাহারা বলিতেছেন, আক্রমণকারীকে রেহাই দেওয়া হইবে না; কিন্তু হামলাকারী দেশটিতে আছড়াইয়া পড়িতে পারে—এমন কোনো অস্ত্র তাহারা দিতে নারাজ। যদিও ইহাতে পরমাণু যুদ্ধসহ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। এইখানে দেখা যাইতেছে, ইউক্রেনকে উসকাইয়া দেওয়ার মতো লোকের অভাব নাই। একদিকে দেশটিতে আবার সর্বাত্মক হামলার প্রস্তুতি চলিতেছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলি বলিতেছে—আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি, আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নাই। ইহা ছাড়া শক্তিধর দেশগুলির ঔদ্ধত্য আর কাহাকে বলে! তাহারা কথায় কথায় পৃথিবীবাসীকে ভয় দেখাইতেছে। তাহারা ছোট দেশগুলির পিঠ চাপড়াইয়া দিতেছে; কিন্তু মার খাইবার সময় এই সকল ছোট দেশই মার খাইতেছে। তাহারা শক্তিধর দেশগুলির গিনিপিগে পরিণত হইয়াছে। তাহা হইলে পৃথিবীতে আজ এতগুলি রাষ্ট্র রাখিয়া কী লাভ? এই যুদ্ধবিগ্রহে আজ আদর্শের কোনো বালাই নাই। যুদ্ধ কখন শেষ হইবে তাহাও আমাদের জানা নাই। তবে এই পর্যন্ত ইউক্রেনের যে ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছে তাহাতে পুনর্বাসনের জন্য লাগিবে ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও অধিক অর্থ। যেই সকল অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হইতেছে তাহা সকলই যে অনুদান, তাহাও তো সঠিক নহে। অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হইয়া গেলেও এই দেশটিকে মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে বহু বৎসর নূতন করিয়া সংগ্রাম করিয়া যাইতে হইবে।

সমস্ত পৃথিবী আজ থমকাইয়া রহিয়াছে। শান্তিকামী মানুষ কি আজ পালাবদলের অপেক্ষা করিতেই থাকিবে? কেননা শক্তিধররা আজ যতই ছড়ি ঘুরাক, একদিন না একদিন তাহাদের পরাজয় হইবেই। কবি কী চমৎকারভাবে বলিয়াছেন যে, মানবের তরে মাটির পৃথিবী, দানবের তরে নহে; কিন্তু দানবদের পরাস্ত করিতে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষকে কি জাগিয়া উঠিতে হইবে না? এখানেই কবি নীরব। কবি সুফিয়া কামালের সেই ‘তাহারে পড়ে মনে’ কবিতার মতো—‘হে কবি! নীরব কেন—ফাল্গুন যে এসেছে ধরায়,/ বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?’ স্বজন হারানোর ব্যথা-বেদনা ও দুঃখকষ্টে আজ তাহার সেদিকেও কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। পৃথিবীবাসীর অবস্থাও কি আজ হইয়াছে তাহাই?

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন