হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু। এদিকে লুর সঙ্গে পররাষ্ট্রসচিবের সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, সুশাসন, নির্বাচন, ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। আলোচনার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দুই পক্ষের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পুরোনো বন্ধু। সামনের ৫০ বছর কীভাবে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ডোনাল্ড লু বলেছেন, ‘আমি এখানে এসেছি দুই দেশের বন্ধুত্বকে শক্তিশালী করতে; যখন বর্তমান বিশ্ব শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম করে চলেছে।’ তিনি বলেন, র্যাবের বিষয়ে ভালো আলোচনা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতি লক্ষ করলে দেখবেন, বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা কমানোর ক্ষেত্রে র্যাবের অসাধারণ অগ্রগতির কথা স্বীকার করা হয়েছে। আমরাও এই অগ্রগতির বিষয়টি স্বীকার করি। এটি অসাধারণ কাজ। এতে প্রমাণিত হয়, র্যাব মানবাধিকার রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সন্ত্রাসবাদ দমনে ভালো কাজ করছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে ডোনাল্ড লু বলেন, ‘জিএসপি পুনর্বহালে কংগ্রেস যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তবে প্রথম তালিকায় বাংলাদেশ থাকবে।’ এসব বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের মধ্যে যদি কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তবে আমরা আলোচনা করে সমাধান করব। যদি গঠনমূলক পরামর্শ আসে, আমরা অবশ্যই সেটি গ্রহণ করব। এর নমুনা আমরা দেখিয়েছি। আমাদের যদি কোনো দুর্বলতা থাকে, সেটি আমরা দূর করব।’
ডোনাল্ড লু সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে আমাদের মধ্যে সৎ আলোচনা হয়েছে। আমরা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা যদি কোনো সমস্যা দেখি, তখন আমরা বিষয়টি উত্থাপন করি এবং আমরা পরামর্শ দিতে পারি। আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখায় বিশ্বাস করি এবং বাংলাদেশের মতো অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করি। ডোনাল্ড লু আরও বলেন, আইপিএস নিয়ে আমাদের চমৎকার আলোচনা হয়েছে। এটি কোনো ক্লাব নয়, বরং একটি কৌশল।’
যা হোক, মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে দেখা যায়, দেশে শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত গণমাধ্যম রয়েছে; যারা মুক্তভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে পারছে। বর্তমানে দেশে ৫৪৪টি দৈনিক, ৩৫৭টি সাপ্তাহিক, ৬২টি পাক্ষিক ও ৯৩টি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। ৩৩টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সচল আছে, যাতে সরকারের নীতি ও কার্যক্রম নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। টকশোতে আলোচকগণ মুক্তভাবে আলোচনায় অংশ নিয়ে থাকেন, সেখানে সরকারের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে মুক্ত আলোচনা হয়। টিভি মিডিয়া কর্তৃপক্ষ কিংবা আলোচকদের পক্ষ থেকে আলোচনার বিষয়ে বাধা প্রদানের বিষয়ে কোনোরূপ অভিযোগ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, মিডিয়ার ওপর সরকারের কোনোরূপ হস্তক্ষেপ নেই। স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম পূর্বশর্ত, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে মিডিয়া অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে।
গণতন্ত্র সূচকেও এক ধাপ এগিয়ে ৭৫তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সূত্র মোতাবেক, সূচকে ধারাবাহিক উন্নতির পথে রয়েছে বাংলাদেশ। এটি নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বিষয়। কেননা, যেখানে একটি গোষ্ঠী সব সময়ই বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই বলে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে রাজনীতির মাঠ সরগরম করে তোলার চেষ্টায় লিপ্ত, সেখানে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উন্নতি হচ্ছে সংক্রান্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশের জন্য মর্যাদার ও প্রশংসার। বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনগুলোতে নির্বাচন কমিশন যথাসময়ে তপশিল ঘোষণার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলায় নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ও ভোট পরিচালনাসংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে নিয়েছে। প্রয়োজন মোতাবেক নির্বাচনে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে পুনরায় ভোট আয়োজনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে কমিশন। এসব ইতিবাচক দিকের কথা তো উল্লেখ করতেই হয়।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা ছিল জঙ্গিবাদ। জঙ্গিবাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সরকারের বিচক্ষণ ও তড়িৎ ব্যবস্থার কারণে সন্ত্রাসীরা কখনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। হলি আর্টিজানের ঘটনার মাধ্যমে জঙ্গিরা তাদের উপস্থিতি সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল এবং ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু সরকার অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ঘটনার মোকাবিলা করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরতে সমর্থ হয়। শুধু তাই নয়, মাদক ও জঙ্গিবাদের মতো ভয়াবহ অপরাধ মোকাবিলায় সরকার বদ্ধপরিকর। এসব ভয়ংকর অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেই সরকার ক্ষান্ত হয়নি, অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত নানাবিধ পদক্ষেপের কারণে জনমনে স্বস্তি ও আস্থা ফিরে এসেছে।
মানবাধিকার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর; মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় সরকারকে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার প্রত্যয়টি খুবই আপেক্ষিক। কেননা, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে সরকারকে উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হয়। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ করোনা মহামারির সময় দুর্ভোগে থাকা মানুষের জন্য সহযোগিতার দ্বার উন্মোচন করতে হয়েছে সরকারকে। সরকারি সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে দেশব্যাপী, সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিতে সরকারকে কাজ করতে হয়েছে এবং এর ফলে উপকৃত হয়েছে দেশের আপামর জনসাধারণ। মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে সরকার সাধারণ জনগণের জন্য আইনগত সহযোগিতা নিশ্চিত করেছে। ৯৯৯ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে পুলিশি সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রতী হয়েছে এবং এই সেবায় অজস্র মানুষ ?উপকৃত হয়েছে তথা মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। অনলাইনে জিডি গ্রহণের মতো বেশ কিছু ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে সরকার।
সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে সামাজিকভাবে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে কাজ করছে সরকার এবং এ প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ও অপরাধী উভয়েই ন্যায্যতার ভিত্তিতে মীমাংসার সুযোগ পায়। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকে জোরদারে কাজ করছে পুলিশ। যে কোনো মানুষের যে কোনো বিষয়ে তথ্য পাওয়ার নিশ্চিতে তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন করেছে সরকার। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণ মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সর্বোতভাবে মানুষের অধিকার নিশ্চিতে কাজ করছে, সরকারের কোনো বিষয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হলে সে বিষয়ে যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণে কমিশন মতামত প্রদান করছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে জনমানুষের মানবাধিকার রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর—এ কথার বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম। এমতাবস্থায় মানবাধিকার রক্ষার্থে সংশ্লিষ্ট সবার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে জনগণের সচেতনতা যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনিভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করার যেমন প্রয়োজন রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে দেশের সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান—এ বিষয়ের অনুশীলন অত্যন্ত জরুরি। তাহলেই বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র সমুন্নত করা সহজতর হবে।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান
