পদের মোহ কাহার না থাকে? কে না চাহেন বিপুল বৈভবময় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা? যদিও মহান সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এই জগতে কাহারো থাকিতে পারে না। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের কিংবা অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের ক্ষমতাও বিপুল ও ব্যাপক। এই ধরনের শীর্ষ পদ হইতে নিজেকে সরাইয়া লইবার সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ নহে। কিন্তু আমরা উন্নত বিশ্বে পদত্যাগ সংস্কৃতির উদাহরণ প্রায়শই দেখিতে পাই। বলা যায়, সময় থাকিতে সম্মানের সহিত পদত্যাগ করাটা উন্নত বিশ্বে দায়িত্বশীলতা ও কর্তব্যপরায়ণতার পর্যায়ে পড়ে। সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টার্জেন আকস্মিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়াছেন। বুধবার তিনি পদত্যাগের ঘোষণা প্রদানের সময় বলেন যে, তিনি বুঝিতে পারিতেছেন ক্ষমতা হইতে সরিয়া দাঁড়াইবার ইহাই উপযুক্ত সময়। কিছুদিন পূর্বে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন জাতীয় নির্বাচনের বেশ পূর্বেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিয়া বলিয়াছেন যে, তিনি পরিশ্রান্ত এবং নেতৃত্ব প্রদানের মতো তাহার ‘যথেষ্ট শক্তি নাই।’ এই দিকে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সমালোচনার মুখে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস পদত্যাগের ঘোষণা দিয়াছেন। বলা হইতেছে যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বিষয়ে নিজস্ব অভিমত হোয়াইট হাউজের সামনে ব্যাখ্যা করিতে ব্যর্থ হইয়াছেন ম্যালপাস। প্রকৃতপক্ষে, বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরিয়া টানাপড়েনও চলিতেছিল তাহার। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুসারে বিশ্বব্যাংকের প্রধান বাছাই করিয়া আসিতেছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। তাৎপর্যপূর্ণ, ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পদে বসাইয়াছিলেন ডেভিড ম্যালপাসকে। ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত ছিল তাহার মেয়াদ। আরও উদাহরণ দিয়া বলা যায়, বিগত ছয় বৎসরে চার জন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিয়াছেন ব্রিটেনে। মহান গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে ব্রিটেনে পদত্যাগ করাটাকে জবাবদিহিতার অংশ হিসাবেই দেখা হয়।
পদত্যাগ মানে বিবেকের দায়বদ্ধতা। সাধারণ মানুষের সমালোচনায় কেহ যখন পদত্যাগ করেন তাহাতে এই বার্তা যায় যে—ব্যর্থ হইলে, অনিয়ম করিলে, পদে থাকা যায় না। পদত্যাগের সংস্কৃতি এই জন্য উন্নত বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জন্য মাত্র ৩৫ বৎসর বয়সে ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হইবার পরও সামান্য সমালোচনার কারণে পদত্যাগ করিয়াছিলেন সানা। অথচ স্বচ্ছতা আর জবাবদিহির জন্য দেশটিতে দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। এই দিকে বত্সরখানিক পূর্বে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা পদত্যাগ করিয়াছিলেন এই কারণে যে, এক জরিপে তিনি দেখিয়াছেন—তাহার জনপ্রিয়তা কমিয়া গিয়াছে। তিনি মনে করিলেন, দেশ পরিচালনায় তিনি দক্ষতার পরিচয় দিতে পারিতেছেন না, সুতরাং পদত্যাগই সমাধান। এই সকল উন্নত দেশের পাশাপাশি পাশের দেশ ভারতেও আমরা মাঝেমধ্যে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘটনা ঘটিতে দেখি। করোনাকালে ভারতের মন্ত্রিসভার সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন আর প্রতিমন্ত্রী অশ্বিন চৌবেও ব্যর্থতার দায় লইয়া পদত্যাগ করিয়াছিলেন। ভারতে সরকারপ্রধানের পদ হইতে ক্ষমতা হস্তান্তর কখনই অগণতান্ত্রিক বা অসুস্থ পথে হয় নাই। গণতন্ত্রের জন্য ইহা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, পদত্যাগের যখন এতই মহিমা—তাহা হইলে উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু দেশে ক্ষমতা হইতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিবার ঘটনা কেন ঘটে না? তাহার কারণ হইল, উন্নয়নশীল বিশ্বে ক্ষমতা হইতে পদত্যাগ করিবার পর পদত্যাগকারীর পরিণতি বহু ক্ষেত্রেই ভয়ংকর হইয়া থাকে। দুঃখজনকভাবে, তৃতীয় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই ক্ষমতায় থাকা মানে ব্যাঘ্রপৃষ্ঠে আসীন থাকা। বহু দেশে দেখা গিয়াছে, যতক্ষণ ক্ষমতায় থাকা যায় ততক্ষণ ক্ষমতার ব্যাঘ্র তাহাদের রক্ষা করিয়া থাকে, কিন্তু বাঘের পিঠ হইতে নামিবামাত্র ঐ বাঘই ক্ষমতাত্যাগীদের জীবনে নরক নামাইয়া আনে। এইখানে ক্ষমতাশূন্য হইবার পর নূতন যাহারা ক্ষমতায় আসেন তাহারা যেনতেন প্রকারে সদ্য ক্ষমতাহীনকে শায়েস্তা বা হেনস্তা করিবার সকল বন্দোবস্ত করিয়া থাকেন। এই হেনস্তা চরিতার্থে নূতন ক্ষমতারোহীরা নিয়মকানুন কিংবা আইনের ধারার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইতেও দ্বিধা করেন না। এই যখন অবস্থা, তখন পদত্যাগের সংস্কৃতি কী করিয়া গড়িয়া উঠিবে উন্নয়নশীল বিশ্বে? সুতরাং উন্নয়নশীল বিশ্বে পদত্যাগ নামক মুদ্রার উভয় পিঠই দেখিতে হইবে।
