উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি হ্রাস দুর্ভোগ ডেকে আনতে পারে

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০০:২০

জাতিসংঘ সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছে, যা অর্থনীতিবিদদের মধ্যে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ জটিলতার মধ্য দিয়ে যাবে। ২০২২-২০২৩ ও ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে উচ্চমাত্রায় বিরাজ করবে। পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম হবে। প্রবৃদ্ধি যে হারে কমবে, মূল্যস্ফীতি তার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় বাড়বে। এতে জনজীবনে সংকট বাড়বে। 

সংস্থাটি আরো বলেছে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। কিন্তু উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে সম্ভাব্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। পরের বছর মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়াতে পারে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, উল্লেখিত বছরগুলোতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বরাবরই মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম হবে। যদিও স্থানীয় অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির যে বাস্তব অবস্থা, তাতে মূল্যস্ফীতির হার আরো বেশি হতে পারে। কারণ চলতি অর্থবছরে একপর্যায়ে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ অতিক্রম করে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি + শ্লথ প্রবৃদ্ধি বিরাজ করছে। এই অবস্থাকে অর্থনীতির পরিভাষায় ট্যাগফ্লেশন বলা হয়। ট্যাগফ্লেশন অবস্থার সৃষ্টি হলে একটি দেশের অর্থনীতি অস্বাভাবিক মন্থর হয়ে পড়তে পারে। সেই অবস্থায় ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ স্তিমিত হয়ে পড়তে পারে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত করে দেশটির দারিদ্র্যবিমোচন কার্যক্রম মন্থরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার মার্কিন ডলারের বিপরীতে কমে গেছে। মার্কিন ডলারের সংকট দেখা দিয়েছে। জরুরি পণ্য আমদানি বিঘ্নিত হচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং স্থানীয় অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, তার পেছনে ভোক্তার চাহিদা ও পণ্য উৎপাদন হ্রাসজনিত কারণ যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি অবদান রাখছে পরিবহন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি। আমরা যদি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ইস্যুটি বিবেচনা করি তাহলে দেখব, অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও পরিবহন ব্যয় কমানোর ইস্যুটি আমাদের হাতে তেমন একটা নেই। কারণ বাংলাদেশকে পরিবহন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির জন্য দায়ী জ্বালানি বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আমাদের আন্তর্জাতিক বাজারের গতি-প্রকৃতির ওপরই এ ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হবে। এছাড়া রয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ)-এর কাছ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এই ঋণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে বিভিন্ন খাতে দেওয়া ভর্তুকি ব্যাপকভাবে হ্রাসকরণ। 

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে আইএমএফের দেওয়া শর্ত মোতাবেক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম কিছুদিন আগে বাড়ানো হয়েছে। গ্যাসে ও বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হচ্ছে। সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম যখন প্রায় ৫২ শতাংশ বাড়ানো হয়, তখন বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হবে। কয়েক মাস আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৩৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলে দাম প্রতি ব্যারেলে ৮০ মার্কিন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। এটা রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ-পূর্বাবস্থার সমান। কিন্তু স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়নি। অন্যান্য জরুরি ইউটিলিটি পণ্য ও সেবাসমূহের দাম আবারও বাড়ানো হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিই অনুসরণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) গত এক বছরে মোট সাত বার নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য এ পর্যন্ত অন্তত তিন বার নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। সর্বশেষ নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার আরো দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। নীতি সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পালন করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সেই শর্ত পালন করেনি। ফলে নীতি সুদহার বাড়ানোর উদ্যোগ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে তা উসকে দিতে পারে। অর্থনীতিবিদগণ অনেক দিন ধরেই বলে আসছিলেন, এই মুহূর্তে ব্যাংক ঋণের ‘আপার ক্যাপ’ তুলে না দিয়ে কোনোভাবেই নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কারণ নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে শিডিউল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ধার গ্রহণ করতে আগের চেয়ে ১ শতাংশ বেশি সুদ দিতে হবে। কিন্তু উদ্যোক্তা পর্যায়ে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো তাদের সুদের হারের সঙ্গে এই বর্ধিত ১ শতাংশ সুদ যোগ করতে পারবে না। নতুন মুদ্রানীতিতে কনজ্যুমার্স লোনের ক্ষেত্রে সুদের আপার লিমিট ১২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ব্যক্তি বা উদ্যোক্তা পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আগের মতোই সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ আরোপ করতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ ৯ শতাংশ বহাল থাকায় উদ্যোক্তাগণ দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে আরো বেশি তৎপর হয়েছেন। ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আগের মতোই ১৪ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মুদ্রানীতির আগের মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। সেই সময় ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ১১ শতাংশর মতো। গত মুদ্রানীতি বাস্তবায়নকালীন ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি একপর্যায়ে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। পরে অবশ্য তা কিছুটা কমেছে। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়ার অর্থই হচ্ছে দেশে বিনিয়োগ কার্যক্রম স্বাভাবিক আছে। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের স্বাভাবিক বা উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলে দেশের দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? করোনাকালে ৩ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এদের উন্নয়নের জন্য তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কি শিল্পায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানই সে কথা বলছে না। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলা হয়েছে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি হয়েছিল ৩ দশমিক ৬৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির জন্য যে পরিমাণ টাকার এলসি খোলা হয়েছে, তা আগের বছরের একই সময়ের ৬৫ দশমিক ৩২ শতাংশ কম। একইভাবে গত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানি করা যথাক্রমে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছর এ দুটি পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শিল্পে ব্যবহার্য মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৩ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত ছয় মাসে ২ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে আমদানি কমেছে ৩৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। এখানেই রহস্য লুকিয়ে আছে। একদিকে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে শিল্পের ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ব্যক্তি খাতে যে ব্যাংক ঋণ মঞ্জুর ও ছাড়করণ হচ্ছে তা কোথায় যাচ্ছে? এই ঋণের অর্থ যে শিল্প খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না, তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হচ্ছে শিল্পে ব্যবহার্য আবশ্যিক পণ্যের আমদানি হ্রাস। ব্যক্তি খাতে যে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তা অন্য কোনো খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। অথবা দেশের বাইরে পাচার করা হচ্ছে। দেশ থেকে অর্থ পাচারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। কিন্তু কোনো দেশই বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ নির্ধারণ করে দেয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ নির্ধারণ করে দিয়ে আসলে পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতিকেই উসকে দিয়েছে। কাজেই ঘোষিত মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রত্যাশা কোনোভাবেই পূরণ হবে না।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক।

 

ইত্তেফাক/ইআ