এই যুদ্ধ আমাদের শেষ করিয়া দিবে!

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৪:৩০

ইউক্রেন যুদ্ধের এক বছর পূর্তি হইয়াছে। গত বৎসরের ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ ইউক্রেনের মাটিতে বোমা ফেলিয়া যেই সংঘাতের সৃষ্টি করিয়াছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তাহা সর্বাত্মক রূপ ধারণ করিয়াছে। যুদ্ধ বেশি দূর গড়াইবে না—বিশ্লেষকদের এমন ভবিষ্যদ্বাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করিয়া এই যুদ্ধ কেবল সামনের দিকেই অগ্রসর হইতেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে সমগ্র বিশ্বের যে কী পরিমাণ ক্ষতি হইতেছে, তাহাই আজিকার দিনে প্রধান আলোচ্য বিষয়। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন ঘটিয়াছে। জ্বালানির সংকট এবং ইহার বাড়তি মূল্যের অভিঘাতে প্রতিটি দেশেই ত্রাহি অবস্থা উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানগুলির। ইহার জের ধরিয়া সরকারগুলি অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সামলাইতে হিমশিম খাইতেছে। কতিপয় উন্নত দেশ ক্ষেত্রবিশেষে সংকট কাটাইয়া উঠিতে পারিলেও অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশকে বরণ করিতে হইয়াছে এক করুণ পরিণতি। বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করিয়া তাহারা পা ফেলিতেছে অত্যন্ত সন্তর্পণে। যুদ্ধের পক্ষবিপক্ষ লইয়া চলিতেছে টানাটানি। চলিতেছে বিশ্ব রাজনীতি ও বিশ্বব্যবস্থা লইয়া জটিল সকল হিসাবনিকাশ!

ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে পুতিনকে বেশ আত্মপ্রত্যয়ী হিসাবে দেখা গিয়াছিল। সম্ভবত তাহার চিন্তা ছিল—জ্বালানি অস্ত্র দিয়া বিশেষত শীত মৌসুমে পশ্চিমা বিশ্বকে ঘায়েল করা যাইবে অতি সহজে। যেভাবেই হউক, বরফশীতল আবহাওয়ার পরীক্ষা উতরাইয়া গিয়াছে ইউরোপ। এমনকি তাহাদের নিকট আজ যে পরিমাণ জ্বালানি মজুত রহিয়াছে তাহাতে আগামী শীতকালেও কোনো সমস্যা হইবে না; কিন্তু ইউরোপ সংকট কাটাইয়া উঠিলেও পুতিনের জ্বালানি অস্ত্র তোপ দাগিতেছে এখন উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশের অবস্থা শোচনীয়। বিশ্বব্যাংকসহ অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, ‘২০২৩ সাল হইবে মন্দার বৎসর’—এই আশঙ্কাবাণী অহেতুক নহে। বর্তমান বাস্তবতা হইল, উন্নয়নশীল দেশগুলির পিঠে যুদ্ধের অভিঘাতে মন্দা অবস্থার চাবুক পড়িতেছে প্রতিটি মুহূর্তে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাস্বরূপ যখন পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার খড়গ নামিল, পালটা ব্যবস্থা হিসাবে জ্বালানি সরবরাহে রাশিয়ার চাবি মারিবার ফলে সংকট ছড়াইয়া পড়িল বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। এই অবস্থায় বাড়িতে থাকিল বিভিন্ন পক্ষের দরকষাকষি-রেষারেষি। ভাঙিয়া পড়িল ধুঁকিতে থাকা ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার।’ একদিকে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ রুদ্ধ হইয়া পড়িল, অন্যদিকে সরবরাহ আটকাইয়া যাওয়াই ইউক্রেনের খাদ্যগুদামগুলিতে পচিতে থাকিল খাদ্যশস্য। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থায় পড়িয়া বিশেষ করিয়া এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলি খাদ্য ও জ্বালানিসংকটে আজো অবর্ণনীয় কষ্টে দিন যাপন করিতেছে। কোনো কোনো দেশ দেউলিয়া হইয়া যাইতেছে। এই সকল দেশ যুদ্ধের মধ্যে না থাকিয়াও যুদ্ধে রহিয়াছে। এই যুদ্ধ যে বাঁচামরা, তথা জীবনযুদ্ধ, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। 

পরিতাপের বিষয়, এত কিছুর পরও শান্তির পথে হাঁটিতেছে না বিবদমান পক্ষগুলি। বরং গোপনে ইউক্রেন সফর বা প্রকাশ্যে রাশিয়া সফরের মাধ্যমে এই যুদ্ধকে আরও উসকাইয়া দেওয়া হইতেছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। সব মিলাইয়া বিশ্ব এক চরম সংকটে নিপতিত। প্রভাবের দিক হইতে কেহ কেহ ইহাকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হিসাবেও অভিহিত করিতেছেন। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহিত রাশিয়ার পরমাণুসংক্রান্ত নিউ স্টার্ট কৌশলগত অস্ত্র চুক্তির শর্ত রাশিয়া আর মানিবে না বলিয়া স্টেট অব নেশনের ঘোষণায় উল্লেখ করিয়াছেন পুতিন। শুরু হইতেই তাহার মুখ হইতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকিও শুনিয়া আসিতেছি আমরা। ইহার বিপরীতে, পুতিন ও রাশিয়ার জন্য ‘কঠিন পরিণতি’ অপেক্ষা করিতেছে বলিয়া হুংকার দিয়া আসিতেছে পশ্চিমা পক্ষ। এই পালটাপালটি অবস্থান বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলির ঘাড়ে ফেলিতেছে যমদূতের নিঃশ্বাস। নেপোলিয়ান বলিয়াছিলেন, ‘যুদ্ধ হইল বর্বরদের ব্যবসা।’ এই উক্তি বাস্তব হইয়া প্রতিঘাত করিতেছে এই সকল দেশের জনজীবনে। এখানে স্বার্থই আজ বড়ই হইয়া উঠিয়াছে। আমরা আজ যেন এক আদিম ও অসভ্য পৃথিবীতে বসবাস করিতেছি! এইখানে মানবতা যেন মূল্যহীন। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইউক্রেনের হাজার হাজার বেসামরিক নারী, পুরুষ ও শিশুর আর্তচিৎকারে আমাদের কর্ণকুহরে পৌঁছিতেছে না।

যুদ্ধ হইল ধ্বংসের খেলা, অসহায়ের ক্রন্দনধ্বনি। ব্যক্তিগত কিংবা সমষ্টিগত অহমিকার বশবর্তী হইয়া পক্ষগুলি যুদ্ধের মাধ্যমে সামাজিক স্তরবিন্যাসের যেই ছন্দপতন ঘটায়, তাহা সারাইয়া তুলিতে লাগিয়া যায় যুগের পর যুগ। এই সত্য জানিবার পরও যুদ্ধের মধ্য দিয়া সংকটের ঘেরাটোপে ক্রমাগতভাবে নিক্ষেপ করা হইতেছে মানবসভ্যতাকে। এই মহাসংকটের শেষ কোথায়, তাহা কাহারও জানা নাই। আমরা শুধু স্মরণ করিতে পারি বিজ্ঞানী হারবার্ট জর্জ ওয়েলশের এই উক্তি—‘আমরা যুদ্ধ শেষ না করিলে, যুদ্ধ আমাদেরকে শেষ করিয়া দিবে’।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন