রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এক বছরে গড়িয়েছে। যুদ্ধ যে অচিরেই শেষ হচ্ছে, সে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ইউক্রেনের পক্ষে পশ্চিমা দেশগুলোর তৎপরতা, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের কূটনৈতিক বন্ধন আরও মজবুত করার প্রকাশ্য ঘোষণা, এ ধারণাই দেয়, সামনে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
সর্বশেষ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আকস্মিক ইউক্রেন সফর ও একই সময়ে চীনের শীর্ষ কূটনীতিকের রাশিয়া সফর বৈশ্বিক এই সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, চীন তার ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়াকে অস্ত্র সহযোগিতা দিতে পারে।
অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, তারা এ সংকটের কোনো পক্ষই নয় বরং তারা এ সংকটের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্যে একটি রূপরেখাও প্রস্তুত করছে। এই যুদ্ধের চীনের ভূমিকা কী, এক কথায় একক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কিছুটা জটিল বৈকি।
বরং এক্ষেত্রে যুদ্ধরত দুইটি দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক, ইউক্রেনকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের চীনের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি চীনের মনোভাব আলোচনা করলেই এ বৈশ্বিক সংকটে চীনের ভূমিকা কী, তা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।
গত কয়েক বছরে চীন অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক আধিপত্য ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ততই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে দেশটি। সর্বশেষ আমেরিকার আকাশে বেলুন কাণ্ড দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতি ভ্লাদিমির পুতিন ও শি জিন পিংকে আরও কাছে এনেছে। রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ককে পরস্পর অভিহিত করেছে পাথুরে শিলাখণ্ডের ন্যায় দৃঢ় ও মজবুত। আমেরিকার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে, তৃতীয় কোনো শক্তি চাইলেও এ বন্ধনে ফাটল ধরাতে পারবে না।
রাশিয়ার সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্ক বেশ মজবুত। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর কিছু দিন আগেই পুতিন ও শি জিন পিং কৌশলগত অংশীদারি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। পশ্চিমাদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চীনের সম্পৃক্ততা গত কয়েক দশকে বেড়েছে।
দেশটির অবস্থানের ওপর চলমান যুদ্ধের শক্তির ভারসাম্য নির্ভর করে। চীনের পররাষ্ট্রনীতি চাইলে সংকট আরও তীব্রতর করতে পারে। পারে চলমান বৈশ্বিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণধারা বদলে দিয়ে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে। অথবা এখন শক্তির যে প্রবাহে বিশ্ব চলছে, এমন স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে পারে কেবল চীন।
যুদ্ধ যখন বাধল, পশ্চিমারা চীনের প্রতি তখন আহ্বান জানিয়ে বলেছিল, রাশিয়াকে নিবৃত করতে সচেষ্ট হতে। চীন এ আহ্বান উপেক্ষা করেছে। উলটো পরাশক্তিগুলোকে সংযত হওয়ার পালটা আহ্বান জানিয়েছে চীন। নিজেকে নিরপেক্ষ অবস্থানে দেখাতে চেয়েছে।
একই সঙ্গে ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ নীতি ও আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের ঐ অঞ্চলে উত্তেজনায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ করেছে চীন। ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের ব্যাপারে কখনো কোনো নিন্দা জানায়নি চীন। পশ্চিমা সুরে সুর মিলিয়ে একে মস্কোর দখলদারিও বলেনি।
বরং চীন একে রাশিয়ার নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষার খাতিরে বিশেষ সামরিক অভিযান বলে অভিহিত করেছে। এ কারণে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যতবারই রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাবের জন্য উত্থাপন করা হয়েছিল, ততবরাই নিশ্চুপ ছিল চীন।
চীনের এ ধরনের নীতি গত কয়েক বছরে আমেরিকার সঙ্গে টালমাটাল সম্পর্ককে আরও ঝাঁকুনি দিয়েছে। বিশেষ করে, আমেরিকার সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক তৎপরতা চীনের সঙ্গে আমেরিকার দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে।
ঠিক এ জায়গাগুলোতে তাইওয়ান, হংকং ও দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে রাশিয়া ঘোষণা দিয়েছে চীনের পক্ষেই থাকবে। গত ১৪ মার্চ আমেরিকার গণমাধ্যম নামপরিচয় বিহীন সূত্রের ভিত্তিতে খবর প্রকাশ করে, রাশিয়া চীনের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা চেয়েছে।
আমেরিকা চীনকে সতর্ক করে জানিয়েছে, যদি কেউ মস্কোকে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক বা যে কোনো প্রকারের বস্তুগত কিংবা সমর্থন জানায় এর পরিণতি ভালো হবে না। আমেরিকা আরও অভিযোগ করেছে, মস্কোকে প্রাণঘাতী নয় এমন সহযোগিতা করেছে চীন।
এই অভিযোগর জবাবে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইং জানান, এই সংকটে চীন কোনো পক্ষ নয়। ইউক্রেন ইস্যুতে কিছু শক্তি চীনকে কলঙ্কিত করতে চাইছে ও অপসংবাদের জাল বুনছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জানান, চীন যদি রাশিয়ার অভিযানে সারথী হতো, তাহলে ইউক্রেনের সবচেয়ে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পক্ষ আমেরিকা ও ইউক্রেনের সীমান্তের দেশগুলো চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করত। তাই চীন এক্ষেত্রে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী রূপে আবির্ভূত হয়েছে।
যুদ্ধ বাধার আগে ইউক্রেনের সঙ্গে চীনের ভালো বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। চীন ২০১৯ সাল থেকে ইউক্রেনের সবচেয়ে বৃহৎ বাণিজ্যিক সহযোগী। ২০২০ সালে ইউক্রেনের সঙ্গে প্রায় সাড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও সরাসরি চীনের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে ইন্ধন দেওয়ার কোনো অভিযোগ করেনি। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন এমন এক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যে এ দেশটি চলমান যুদ্ধের যে পক্ষে সমর্থন দেবে শক্তির পাল্লা সেদিকেই ভারী হবে।
