‘সামগ্রিক রচনার প্রতিটি উপাদান মিলে কাহিনির নবতর ইউনিক পালস তৈরি হওয়াকে মৌলিক বলা যায়’

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৯, ১৯:১৩

নাট্যকার আনন জামান। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নাট্যকর্মীদের কাছে এক পরিচিত নাম। তাঁর এই পরিচিতি নাট্যকার হিসেবে। মঞ্চে বর্তমানে যারা নিয়মিত নাটক লিখছেন, তাঁদের একজন আনন জামান। তাঁর লেখা নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘নিশিমন বিসর্জন’, ‘নীলাখ্যান’, ‘শ্রাবণ ট্র্যাজেডি’, ‘সিক্রেট অব হিস্ট্রি’, ‘শিখণ্ডী কথা’। সম্প্রতি মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের প্রযোজনা ‘শিখণ্ডী কথা’ নাটকের ১৭৫তম প্রদর্শনী সম্পন্ন হলো। বাংলা নাটকের সামগ্রিক বিষয় এবং ‘শিখণ্ডী কথা’ নাটকের ১৭৫তম প্রদর্শনী নিয়ে নাট্যকার আনন জামানের সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব আলম

নাটক রচনার ক্ষেত্রে মৌলিক ধারা কতটা বজায় থাকছে?

বাংলা নাটকের রচনারীতি ও প্রয়োগক্ষেত্রে সেলিম আল দীনের কথা উল্লেখ করতে চাই। সেলিম আল দীন পূর্ব পর্যন্ত বাংলা নাটকের উদ্ভব ও রচনারীতি নিয়ে একটি বিভ্রান্তিকর ইতিহাস প্রচলিত ছিল। লিয়েবেদেবের কালকে বাংলা নাটকের সূচনা হিসেবে ধরা হতো। ব্রিটিশরা দু শত বছর সাংস্কৃতিক শাসন করে পঞ্চাঙ্ক বা অংক বিভাজনের মাধ্যমে নাটক রচনার যে চল রেখে গিয়েছিল, তাই অনুসৃত হতো বাংলা নাটক রচনার মাধ্যম হিসেবে।  সেলিম আল দীন ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটক মন্থন করে আধুনিক বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির মাধ্যমে নাটক রচনার চর্চা আরম্ভ করলেন। সেখানে নাটক রচনার উপকরণ হয়ে দাঁড়াল ভূমিজাত নাট্য উপাদান—কথা, বর্ণনা, সংগীত, সংলাপ। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলা নাটকের প্রধান প্রকাশভঙ্গি ছিল সংগীত। দীর্ঘদিন নাটকের প্রতিশব্দ হিসেবে গান বা পালা শব্দটি প্রযুক্ত ছিল। আমরা কিন্তু নাটককে ভাসান গান, রুপবান গান, মহুয়া পালা, যাত্রা পালা, গুলে বাকাওয়ালির পালা এভাবে চিনতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। সমকালীন নাটক রচনার ক্ষেত্রে গান একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অথবা বর্ণনা, সংলাপ রচনায়ও। কারণ সুর-সংগীত-কাব্যের দেশজ মহিমা উপস্থিত থাকে।

গল্প বা উপন্যাসকে আশ্রয় করে মঞ্চ নাটক লিখলে তাকে মৌলিক নাটক বলা যায় কি না? ব্যাখ্যা কী?

গল্প বা উপন্যাসের বিষয়ের সঙ্গে যখন সমকালীন নবতর বিষয়, চরিত্র, প্রেক্ষাপট, ভিন্ন দর্শন, সংকটসহ সামগ্রিক রচনার প্রতিটি উপাদান মিলে কাহিনির একটি নবতর ইউনিক পালস তৈরি হয়, তখন তাকে অবশ্যই মৌলিক নাটক বলা যায়। বুদ্ধ জাতকের গল্প আশ্রয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটককে আমরা মৌলিক নাটক-ই বলছি কিংবা শেক্সপিয়ারের প্রচলিত লোকগল্প আশ্রয়ে রচিত প্রায় প্রতিটি নাটকই বিশ্ব নাটকের ইতিহাসে মৌলিক নাটক হিসেবে বিবেচিত। জঙ্গিবাদকে বিষয় হিসেবে নিয়ে নতুন ক্রাইসিস ও চরিত্র এবং কাহিনির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিসর্জনের চরিত্রগুলোকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ফেলে রচিত ‘নিশিমন বিসর্জন’ যখন মামুন ভাইকে (মামুনূর রশীদ) পাঠ করে শোনালাম। তিনি বললেন, আনন এটা তো মৌলিক নাটক লিখে ফেলেছ।

নাট্যকার-নির্দেশকের মধ্যে সামঞ্জস্য কতটা জরুরি বলে মনে করেন?

সামঞ্জস্য প্রয়োজন বলে মনে করি, কেননা নাট্যকার তাঁর নাটকের মাধ্যমে দর্শককে যা বলতে চান, তারই প্রায়োগিক দৃশ্যমান শরীর নির্মাণ করেন নির্দেশক। নাট্যকার-নির্দেশকে সামঞ্জস্যতা যথাযথ হলে রচনা ও প্রয়োগের সঠিক উদ্দেশ্য একটি বিন্দুতে মিলিত হয়ে নাটকটির মুখ্য বক্তব্য দর্শকের সামনে অভিনীত হতে পারে বলে বিশ্বাস করি।

‘শিখণ্ডী কথা’ নাটকের ১৭৫তম প্রদর্শনী নাট্যকার হিসেবে আপনার স্বপ্নকে কিভাবে আন্দোলিত করে?

বাংলা নাটকের সকল মানুষের জন্য এটি একটি আনন্দ সংবাদ। ‘শিখণ্ডী কথা’ নাটকের পর বাংলাদেশ সরকার হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, ভোটাধিকার দিয়েছে এবং তাদের পেশার সুযোগ করে দিচ্ছে। একটা সময় পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, কবিতা, গানে হিজড়াদের রঙঢঙ আর হাসি-ঠাট্টাকে বিনোদনের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হতো। রঙের আড়ালে থেকে যেত এক আকাশ বিস্তারী ক্রন্দন আর বঞ্চনার গল্প। ‘শিখণ্ডী কথা’ নাটকের মাধ্যমে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর প্রতি সর্বত্রই একটি ইতিবাচক দিক তৈরি হয়েছে।