স্তালিন

তর্ক হোক বিতর্ক হোক কিন্তু বন্ধ না হোক

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৯, ১৯:১৪

মা হ বু ব  আ ল ম

 

গণমানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক আন্দলোন সংগ্রামের অনেক অনেক ইতিহাস পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের কাছে আজ গল্প বলে মনে হতেই পারে। যেমন :বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে বা খানিককাল পরেও বাংলার মাটিতে লাল পতাকা যেমনটা দেখা যেত, গত প্রায় তিন দশক ধরে, সেটির ব্যবহার তেমন আর চোখে পড়ে না। এখন বাড়ির বাইরে লাল পতাকা তেমন চোখে পড়ে না—কৃষক ধানের দাম কম পেলেও না, মরে গেলেও না। সমাজতন্ত্রের লাল মিশেছে কৃষ্ণচূড়ায়। বর্ষা শুরুর আগে যখন কৃষ্ণচূড়ার গাছগুলো লাল হতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময়ে, গত ১০ মে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে লাল ছড়িয়ে দিল সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি)। বাংলা মঞ্চে যোগ হলো নাটক ‘স্তালিন’। এ নাটকের ড্রামাটার্গ ও নির্দেশক কামালউদ্দিন নীলু এবং এর ভাষান্তর করেছেন রায়হান আখতার।

বরাবরই নির্দেশক কামালউদ্দিন নীলু তাঁর নির্দেশিত নাটকে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করেন নানাভাবে। সিএটির পরিবেশনা দেখতে গিয়ে মনে হলো নাট্য পরিবেশনার কথা। নাট্য পরিবেশনার আগে নাট্য পরিবেশ তৈরি করে নেওয়া বেশ জরুরি। হলের লবিতে সেই পরিবেশ তৈরি করে নিলেন নাটকের শুরুটা করে। সেই সঙ্গে স্তালিন ক্যাপ মাথায় দিয়ে দর্শকের মনস্তাত্ত্বিক রূপ বদলে দেওয়াও একটি চমক।

যাহোক, সিএটির পরিকল্পিত প্রযোজনা ‘স্তালিন’ নিয়ে অনেক বির্তকের জন্ম হয়েছে। বির্তকের কারণ অবশ্য আছে। তা হলো মঞ্চে স্তালিনকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তাতে বেশির ভাগ সময়ে তাঁকে অত্যাচারী, খুনি, মাতাল, একগুঁয়ে স্বৈরশাসকই মনে হয়েছে। নাট্যকার কামালউদ্দিন নীলু স্তালিনের জীবনের ডার্ক পার্ট তুলে ধরেছেন ডার্ক কমেডির মধ্যে দিয়ে। কিন্তু নাটকের মূল দ্বন্দ্ব লেগে আছে পাণ্ডুলিপিতে। স্তালিনের জীবনের যে অংশটা নাট্যকার মঞ্চে দেখিয়েছেন, সেই অংশ প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে দেখানো শুধু জাবর কাটার মতো মনে হয়েছে। ঘটনাগুলো যেহেতু একই রকম, সেহেতু খুব অনায়াসেই সেগুলোকে কমিয়ে আনা যেত। এবার নাট্যবিষয়ের মূল প্রসঙ্গে কথা বলা যাক, স্তালিনের পলিটব্যুরো সদস্যরা যেভাবে চাটুকারিতা করতে থাকে এবং তাঁকে যেভাবে তাঁদের বিরুদ্ধের লোককে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করে, তাতে মনে হবে স্তালিন বোধহয় বোধ-বুদ্ধিহীন। কিন্তু নাটকে দেখা যায় ইয়েঝভের কাছ থেকে হত্যার একটি লিস্ট পাওয়ার পর স্তালিন তাঁকে গুপ্ত পুলিশের পদ থেকে বহিষ্কার করেন, পরে তাঁকে মেরে ফেলেন। আবার দেখা যায়, নিজের সন্তান যেহেতু একজন সাধারণ সৈনিক, তাই বন্দি বিনিময়ে তাঁর বদলে একজন অফিসার হলে দেশের ক্ষতি হবে বলে জানায় স্তালিন। এগুলো তাঁর বুদ্ধিমত্তারই বহিঃপ্রকাশ। অবশ্য জীবনের শেষ দিকে স্তালিনের মনে হয় যে, বেরিয়াদেরও অনেক আগেই মেরে ফেলা উচিত ছিল। কারণ ততদিনে স্তালিন বুঝে গেছেন যে, বেরিয়ারা তাঁর সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ—সমাজতন্ত্রের ক্ষতির কারণ। স্তালিনের মনে হয়েছিল তিনি ছাড়া সমাজতন্ত্রকে আর কেউ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না, তাই ট্রটোস্কিকে নির্বাসন দিয়েছিলেন ক্ষমতা পাওয়ার পরই। ক্ষমতার লোভে স্তালিন সবসময়ই যাকে নিজের পথের কাঁটা মনে করেছেন, তাঁকেই সরিয়ে দিয়েছেন। এই স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের আড়ালে যে তাঁর মহত্বের কোনো ঘটনা নেই, তেমনটা নয়; কিন্তু নাটকে সেগুলোর অনেক কিছুই উঠে আসেনি। এটি পাণ্ডুলিপির দুর্বলতাকে যেমন তুলে ধরে, তেমনি আবার নাট্যকারের একপেশে মনোভাবকেও পরিষ্কার করে দেয়। তবে নাটকে স্তালিন চরিত্রে অভিনেতা শাহাদাত হোসেনের অভিনয় এককথায় অসাধারণ। বাকিরাও ভালো অভিনয় করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সব থেকে ভালো লেগেছে নাটকের পলিটব্যুরোদের মুখে মুখোশ আঁকানো। আসলে এই রকম লোকেদের ভেতরটা যেমনই হোক, ওপরে মুখোশ থাকেই। পলিটব্যুরোদের এই মুখোশ ও চরিত্র মাঝেমধ্যেই এদেশের কতিপয় নেতাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে হয় মেরুদণ্ডহীন পলিটব্যুরো সদস্য একেকটা। নিজের স্বার্থের জন্য অন্যকে বলি দিতেও এদের বাঁধে না। উপলবি হয় বাংলাদেশেও মুখোশঅলা পলিটব্যুরোর সংখ্যা অনেক। পলিটব্যুরোরা যে মুখে রং মেখে সঙয়ের মতো অভিনয় করছেন সত্যি, কিন্তু তাদের সেই অভিনয় ভাঁড়ামো মনে হয়েছে, বিরক্তিকর মনে হয়েছে। এক্ষেত্রে নাটকের বাংলা রূপান্তরকে সহজ মনে হয়নি। নাট্যভাষ্যে কৌতুক না থাকলে অভিনেতার অভিনয় যে ভাঁড়ামি মনে হয়, ‘স্তালিন’ দেখে সেই অভিজ্ঞতা হবে। যাহোক, নাটক নিয়ে তর্ক হোক, বিতর্ক হোক; কিন্তু কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর আগ্রাসী মনোভাবে নাটক বন্ধ না হোক।

ছবি হামজা আনোয়ার