উচ্ছ্বাস আর প্রত্যয়ী ঘোষণার মধ্য দিয়া আমরা মেট্রোরেল যুগে প্রবেশ করিয়াছি। মেট্রোরেলে চড়িয়া অনেকে মন্তব্য করিয়াছেন যে, তাহারা বিদেশ তথা উন্নত কোনো দেশ ভ্রমণ করিতেছেন। মেট্রোরেলের অভ্যন্তর ও ইহার স্টেশনগুলি যাহাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, এই জন্য সচেতনতা সৃষ্টিতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনের দিন মেট্রোরেলে পড়িয়া থাকা ময়লা নিজ হাতে কুড়াইয়া পরিষ্কার করিয়াছেন। এমনকি মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ ইহার পিলারগুলিও যাহাতে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন থাকে, এই জন্য সেখানে যে কোনো প্রকার পোস্টার লাগাইতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছেন। কিন্তু দেখা যাইতেছে, নিষেধাজ্ঞার পরও তাহা মানা হইতেছে না। পল্টন, শাহবাগ, কাওরান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পোস্টার লাগাইয়া মেট্রোরেলের পিলারের সৌন্দর্যহানি করা হইতেছে। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ পিলারের যেই অংশে ‘পোস্টার লাগানো দণ্ডনীয় অপরাধ’ লিখিয়া রাখিয়াছেন, সেইখানেই বেশি করিয়া পোস্টার লাগানোর দৃশ্যও চোখে পড়িতেছে। ইহা কোন মন-মানসিকতা?
এইখানে মেট্রোরেল একটি উদাহরণ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে পোস্টার লাগানোর ক্ষেত্রে সড়কের পাশের দেওয়াল, ভবন, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসার দেওয়াল কোনো কিছুই বাদ যাইতেছে না। ইহাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রচারণা ছাড়াও অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত প্রচার, স্কুল-কলেজে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি, বাড়িভাড়া, নতুন সিনেমা-নাটকের পোস্টারসহ বিভিন্ন প্রচারণায় পোস্টারিং করা হইতেছে হরহামেশাই। ইহার কারণেও নগরীর পরিবেশ দূষিত হইতেছে। পোস্টারগুলি অনেক সময় দেওয়াল বা পিলার হইতে পড়িয়া গিয়া রাস্তায় গড়াগড়ি খায়। ইহাতে রাস্তা আরও অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা হইয়া উঠে। এমন নেতার ছবিও পড়িয়া থাকে, যাহার উপর দিয়া হাঁটিয়া যাইতে লজ্জা হয়। অনেক সময় দিনের পর দিন তাহা পড়িয়া থাকে। কোনো একটি বিশেষ উপলক্ষ্য শেষ হইয়া গেলেও তাহাদের ছবিসংবলিত পোস্টার অপসারণ করিতে দেখা যায় না। এইভাবে যেইখানে সেইখানে পোস্টার লাগাইবার কারণে তাহা নগরীতে দৃষ্টিদূষণ সৃষ্টি করিয়া থাকে। পরিবেশদূষণের মধ্যে বায়ু, পানি ও শব্দদূষণের কথা আমরা জানি। তবে দৃশ্যদূষণও কম ক্ষতিকর নহে। ইহা শুধু বিরক্তিই উৎপাদন করে না, মানুষের মন-মেজাজের ওপর ফেলে নেতিবাচক প্রভাব। আপত্তিকর ছবি ও লেখায় তৈরি হয় অস্বস্তি। বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দুই-একটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও এই ধরনের চিত্র দেখা যায় না।
উন্নত নগরী গড়িয়া তুলিতে হইলে ইহার নাগরিকদের উন্নত মন-মানসিকতাও প্রয়োজন। নাগরিকদের প্রধান দায়িত্ব হইল আইন ও নিয়মশৃঙ্খলা মানিয়া চলা। আমাদের দেশে ‘দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’-এর ধারা-৬-এর উপধারা-২-এ এই আইন অমান্য করিবার শাস্তিস্বরূপ ৫ হাজার হইতে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রহিয়াছে। উপধারা-৩-এ অভিযুক্ত সুবিধাভোগীর শাস্তি হইল ১০ হাজার হইতে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড। তাই এই আইনটি অনুসরণ করিলে নগরীর পরিবেশ বহুলাংশে পরিচ্ছন্ন হইয়া উঠিবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই আইনটির প্রয়োগ তেমন নাই বলিলেই চলে। যদি আইন প্রয়োগই না করা হইবে, তাহা হইলে আইন প্রণয়নের সার্থকতা কোথায়?
কিছুদিন আগে ফ্লাইওভারের দেওয়াল লিখন ও পোস্টার অপসারণের নির্দেশ দিয়াছে হাইকোর্ট। এই ব্যাপারে একটি মনিটরিং টিম করিতেও নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। আশার খবর হইল, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রতি ওয়ার্ডে পোস্টার লাগানোর নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করিয়া দিতেছে। ইতিমধ্যে কাওরান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুর ১০ নম্বর, আসাদ গেটসহ কয়েকটি এলাকায় ‘পোস্টার লাগানোর নির্ধারিত স্থান’ লেখাসংবলিত ১৬/৬ ফুট সাইজের বোর্ডও স্থাপন করা হইয়াছে। কিন্তু তাহার পরও যত্রতত্র পোস্টার লাগানো হইতেছে। নাগরিকদের দায়িত্ব হইল, এই ব্যাপারে সচেতনতার পরিচয় দেওয়া এবং এমন সুন্দর ব্যবস্থাপনার সদ্ব্যবহার করা। তাহার পরও যদি কেহ যেখানে খুশি সেখানে পোস্টার লাগায়, তাহা হইলে এই জন্য অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হইবে। এই ব্যাপারে মাঝেমধ্যে পরিচালনা করিতে হইবে ভ্রাম্যমাণ অভিযান।
