বুধবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৩, ১৮ আশ্বিন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

রাজধানীতে অনুমোদনহীন ভবন বৈধ করার সুযোগ

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৩, ১৭:১২

রাজধানীতে অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদন নিয়ে বিধিবর্হিভূত ভবন নির্মাণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই অনুমোদন ছাড়া বা নিয়মের ব্যত্যয় করে নির্মিত ভবন অপসারণ করাই বিধান। কিন্তু রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন এলাকার অনুমোদনহীন ভবন নিয়ে বিকল্প চিন্তা করতে হচ্ছে সংস্থাটিকে। যার অংশ হিসেবে উচ্চ হারে জরিমানা দিয়ে অনুমোদনহীন ভবন বৈধ করার সুপারিশ এসেছে নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপের (২০২২-২০৩৫)। এজন্য ড্যাপের আওতায় বিধিমালা প্রণয়নে ১২ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। 

কমিটি গঠনের বিষয়ে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি একটি অফিস আদেশ জারি করেছে রাজউক। সেখানে বলা হয়েছে, ড্যাপের নতুন সুপারিশ অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বা শর্ত ভেঙে নির্মিত ইমারত বৈধ করার বিষয়ে খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের কথা জানানো হয় অফিস আদেশে। কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগ-১-এর অতিরিক্ত সচিবকে। সদস্য হিসেবে থাকছেন রাজউকের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা দুই সদস্য, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক, রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন), গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখা-৩-এর উপসচিব, রাজউকের নগর স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ (বাস্তবায়ন), অথরাইজড অফিসার (সংশ্লিষ্ট জোন), নগর পরিকল্পনাবিদ (পরিকল্পনা প্রণয়ন)।

কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদনের সময় শর্ত ভেঙে নির্মিত ইমারতগুলোকে বৈধ করার ক্ষেত্রে আবেদন পদ্ধতি, ফি ও জরিমানা নির্ধারণ পদ্ধতিসংক্রান্ত খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন। ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ (ইমারত বিধিমালা) অনুযায়ী, যেসব স্থাপনা অননুমোদিত অথবা বিধিমালার বা অনুমোদনের শর্ত না মেনে নির্মিত হয়েছে সরেজমিনে পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রণয়ন। অবশ্যই সেটি বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ এবং বিএনবিসি কোড পর্যালোচনা করে তৈরির জন্য বলা হয়েছে। সবশেষে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করার জন্য ড্যাপ রিভিউ-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করতে হবে। 

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম। ছবি: ইত্তেফাক

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো ভবন নির্মাণে হয়তো রাজউকের অনুমোদন নেওয়া হয়নি, তবে অবকাঠামোগত নিরাপত্তার ভেরিফিকেশন ঠিক আছে। তাহলে এক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে ১০ গুণ জরিমানার বিধান রয়েছে। ভারতের মুম্বাইসহ বিভিন্ন জায়গায় জরিমানার মাধ্যমে অবৈধ ভবন বৈধ করা বিধান আছে। বিএনবিসি (বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড) অনুযায়ী যদি অবকাঠামোগতভাবে ভবন নিরাপদ হয়, তখন তারা জরিমানা দিয়ে বৈধতা পাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ক্ষেত্রেই কেবল ড্যাপে যে প্রস্তাব রয়েছে সেই অনুযায়ী সুবিধা পাবে। এ বিষয়টি ইমারত নির্মাণ আইনেও রয়েছে। তবে ড্যাপের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এমন কোনো ভবনকে অনুমোদন দেওয়া হবে না। আবার সরকারি জমি বা রাস্তা, খাল-নদী দখল করে যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হবে, সেগুলোরও অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে একটি বিধিমালা জারি করা হবে। সেখানেই এসব বিষয় সুনির্দিষ্ট করা থাকবে।’

জরিমানা দিয়ে ইমারত ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ড্যাপে সুপারিশ করা হয়েছে, অনুমোদনহীন ইমারতের বিদ্যমান ব্যবহার, উচ্চতা, সেটব্যাক ইত্যাদির ক্ষেত্রে মাত্রা, পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি মহাপরিকল্পনা ও বিধিবিধানের আলোকে যাচাইপূর্বক অনুমোদন দিতে ইমারত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালা জরুরি। এ লক্ষ্যে দায়ী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে ইমারতের প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংশোধন বা অপসারণ বা পরিবর্তন সাপেক্ষে বৈধতা দেওয়া যেতে পারে। একটি নির্দিষ্ট মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জরিমানার প্রস্তাবিত বিধান প্রয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে। অর্থাৎ ক্ষেত্রবিশেষে শুধু জরিমানা আর কোনো ক্ষেত্রে জরিমানার সঙ্গে স্থাপনার কোনো অবৈধ অংশ অপসারণ করতে হবে, তা ওই কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। ক্ষতিপূরণ বাবদ আদায় করা অর্থ নিজ নিজ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নসহ নাগরিক সুবিধায় ব্যয় করা যেতে পারে, যেন পরিকল্পিত নগরায়ণে সহায়ক হয়। 

রাজধানী ঢাকা। ছবি: ইত্তেফাক

এদিকে, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০১৬ সালে স্থাপনার সংখ্যা বেড়েছে ৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩৩০টি। অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৯৫ হাজার নতুন স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গড়ে প্রতিবছর স্থাপনা নকশা অনুমোদনের হার প্রায় ৪ হাজার ১৭৫ (সূত্র-রাজউক বার্ষিক রিপোর্ট, ২০১৪-২০১৫, ২০১৫-২০১৬ ও ২০১৬-২০১৭)। অর্থাৎ গড়ে মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশ স্থাপনা রাজউক থেকে অনুমোদন নিয়ে বৈধভাবে নির্মিত।

রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা। ছবি: ইত্তেফাক

রাজধানীর অনঅনুমোদিত ভবন বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, রাজউক আওতাধীন এলাকার অনুমোদনহীন ভবন নিয়ে আমরা সুপারিশ করছি, যার অংশ হিসেবে অনুমোদনহীন ইমারত নির্মাণে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ইমারতের ব্যত্যয়ের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করতে পারে। এক্ষেত্রে ক্ষেত্রবিশেষে ইমারতে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংশোধন/অপসারণ/পরিবর্তন সাপেক্ষে অনুমোদনহীন ইমারতের বৈধতা দেওয়া যেতে পারে। তবে মহাপরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে, জনসম্পত্তি দখল করে, জলাশয় ভরাট করে, সিভিল এভিয়েশনের নির্ধারিত উচ্চতার সীমা লঙ্ঘন, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক ও রেললাইনের অংশ দখল করে ভবন নির্মাণ করলে জরিমানা দিয়েও স্থাপনার বৈধতা পাওয়া যাবে না।

ইত্তেফাক/এসসি/এএএম