ঝুঁকি সত্ত্বেও যে কারণে সামরিক বাজেট বাড়িয়েছে চীন

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৩, ১১:১৩

ক্রমবর্ধমান হুমকির মধ্যেও চীন এই বছর তাদের সামরিক ব্যয় সাত শতাংশের বেশি বাড়াতে যাচ্ছে। দেশটির পার্লামেন্ট জাতীয় পিপলস কংগ্রেসে (এনপিসি) রোববার (৫ মার্চ) এ কথা ঘোষণা করা হয়। এই পার্লামেন্ট থেকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নিশ্চিত করার ঘোষণা আসবে।

বেইজিং এর সামরিক বাজেটের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি, তবে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এখনও অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেটের আকার চীনের চারগুণ। চীনের অর্থনীতিতে যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সামরিক ব্যয় তার চেয়েও বেশি হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, দেশটি তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ক্রমবর্ধমান হুমকির মধ্যেও চীন এই বছর তাদের সামরিক ব্যয় সাত শতাংশের বেশি বাড়াতে যাচ্ছে।

অধিবেশনের শুরুতে ঘোষণা করা হয়, এ বছর চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫% নামিয়ে আনা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়বে ৭ শতাধিকেরও বেশি। রয়টার্স জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা বাজেটের বিষয়টি চীনের প্রতিবেশী দেশ সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, যারা বেইজিংয়ের কৌশলগত উদ্দেশ্য এবং এর সামরিক শক্তির বিকাশ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে।

বিশেষত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। জাপানের মতো ওই অঞ্চলের অন্য শক্তিধর দেশগুলোও তাদের সামরিক বাজেটের আকার বৃদ্ধি করছে। পার্লামেন্টের বার্ষিক অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং জানান, বড় ধরনের কাজগুলো সম্পাদন করার ক্ষেত্রে সামরিক অভিযান, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি সু-সমন্বিত হওয়া উচিত।

অধিবেশনের শুরুতে ঘোষণা করা হয়, এ বছর চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫% নামিয়ে আনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, 'আমাদের সশস্ত্র বাহিনী, পিপলস লিবারেশন আর্মি ২০২৭ সালে শতবর্ষে পা দেবে। সামরিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য, সামরিক অভিযান চালানো, যুদ্ধের প্রস্তুতি বাড়ানো এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কাজ করা উচিত।'

প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এনপিসিকে জানান, বাইরে থেকে চীনকে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা বাড়ছে। সার্বিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষণ এবং প্রস্তুতি আরও জোরদার করা উচিত। 'দ্য টু সেশনস' নামে পরিচিত এই সভা প্রতি বছর হয়ে থাকে। 

পিপলস লিবারেশন আর্মি ২০২৭ সালে শতবর্ষে পা দেবে।

তবে এই বছরের অধিবেশনগুলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এবারে প্রতিনিধিরা কয়েকটি প্রধান কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সপ্তাহে এনপিসির বৈঠকে শি এর নেতৃত্বকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়া হবে। 

তিনি হবেন চীনের প্রেসিডেন্ট ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। গত বছরের অক্টোবরে কমিউনিস্ট পার্টি শিকে তৃতীয় মেয়াদে তাদের নেতা হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত করে। এর মধ্যে দিয়ে চীনের ক্ষমতা কাঠামোয় তার শীর্ষ অবস্থান পাকাপোক্ত হয়। 

এই সপ্তাহে এনপিসির বৈঠকে শি এর নেতৃত্বকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়া হবে। 

সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হলো, ইউক্রেন যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক গুপ্তচর বেলুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেশ বিরূপ সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার উষ্ণ সম্পর্কও একটি কারণ। মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করেছেন, আগামী বছরগুলোতে চীন তাইওয়ানে আক্রমণ করতে পারে।

চীন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণসহ তাইওয়ানের আশেপাশে আকাশ ও সমুদ্র পথে সামরিক মহড়া চালিয়ে আসছে। চীন স্ব-শাসিত তাইওয়ানকে একটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রদেশ হিসেবে দেখে। এনপিসি একজন নতুন প্রধানমন্ত্রীর নামও ঘোষণা করবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এ বছর বিদায় নিচ্ছেন এবং শি এর অন্যতম বিশ্বস্ত সহকর্মী লি কিয়াং এই ভূমিকাটি গ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

চীন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণসহ তাইওয়ানের আশেপাশে আকাশ ও সমুদ্র পথে সামরিক মহড়া চালিয়ে আসছে।

চীনের প্রধানমন্ত্রী ঐতিহ্যগতভাবে প্রশাসনের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক দিকগুলো তদারকি করেন। চীনে প্রতি বছর পার্লামেন্ট ও সিপিপিসিসি নামে আরেকটি রাজনৈতিক সম্মেলন হয়। এই দুইটি বার্ষিক অধিবেশনকে বলা হয় 'টু সেশন্স'। এতে সারা দেশ থেকে হাজার হাজার প্রতিনিধিরা আসেন।

একটি হচ্ছে পার্লামেন্ট বা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস, যাকে কাগজেকলমে চীনের রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অঙ্গ বলা হলেও বাস্তবে এটি রাবার-স্ট্যাম্প হিসেবেই কাজ করে। ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি যেসব সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই নিয়ে নিয়েছে সেগুলোর ওপর করা আইনগুলো পাস করা হয় এ পার্লামেন্টে।

একটি হচ্ছে পার্লামেন্ট বা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস, যাকে কাগজেকলমে চীনের রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অঙ্গ বলা হলেও বাস্তবে এটি রাবার-স্ট্যাম্প হিসেবেই কাজ করে।

এবারের অধিবেশনে চীনের আইনপ্রণেতারা সুদূরপ্রসারী কিছু সংস্কার প্রস্তাব পাস করবেন। এতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শি জিনপিং এর তৃতীয় মেয়াদ এবং তার শীর্ষ সহযোগী দলের নিয়োগকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়া হবে। কমিউনিস্ট চীনের প্রতিষ্ঠার পর মাও জেদং ছাড়া আর কেউই শি জিনপিং এর মতো এতদিন শীর্ষ নেতার পদে ছিলেন না।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, চীনের অর্থখাত, বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও ব্যক্তিগত ব্যবসাসমূহের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হবে। ফলে চীনে সরকার ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ভেদরেখা আরও অস্পষ্ট হয়ে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মাও জেদং

অপর অধিবেশনটি হচ্ছে চাইনিজ পিপলস পলিটিকাল কনসাল্টেটিভ কনফারেন্স (সিপিপিসিসি), যার সত্যিকারের কোন আইনি ক্ষমতা নেই। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে তারা নিজেদের সদস্য সংগ্রহ করে। তারা মূলত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে থাকে।

ইত্তেফাক/ডিএস