আমার কবিতা-বিষয়ক একটি কবিতায় আমি বলেছি—‘প্রথম পঙিক্তটি আসবে আকাশ থেকে উড়ে।’ এই কাব্যপঙিক্তটি যে আমার কোন কবিতার অন্তর্গত, তা আমার চার খণ্ড কাব্যসমগ্রে চোখ বুলিয়েও বের করতে পারিনি। তন্ন তন্ন করে খুঁজলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে—কিন্তু তা হবে সময়ের অপচয়। আছে নিশ্চয়ই কোনো কবিতায় ঘাপটি মেরে। তা থাকো। শান্তিতে থাকো। পাঠকদের মধ্যে কারও জানা থাকলে, আমাকে জানালে খুশি হবো।
এই যে আকাশ থেকে উড়ে আসা কাব্য-পঙিক্তর কথা বললাম, তা আমার সকল কবিতার বেলায় সত্য না হলেও, আমার বেশকিছু কবিতার বেলায়ই সত্য। আমার মাথায় বা মনের মধ্যে হঠাত্ কোথা থেকে যেন একটি পঙিক্ত চলে আসে। ঐ পঙিক্তটিকে আমি কখনো আমার কবিতার শুরুতে, কখনো কবিতার মাঝখানে, আবার কখনো কবিতার অন্তিম চরণ হিসেবে ব্যবহার করে আমার কবিতার পূর্ণাবয়ব নির্মাণ করি। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, ‘ভালোবেসে যাকে ছুঁই সেই যায় দীর্ঘ পরবাসে’—এই পঙিক্তটিও হঠাত্ করেই একদিন আমার মনে এসেছিল। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর আমার কবিবন্ধু আবুল হাসান মারা গেলে আবুল হাসানের জন্য আমি যে এলিজিটি রচনা করি, ঐ হঠাত্-পাওয়া কাব্য-পঙিক্তটি তার অন্তিম চরণে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের কাছাকাছি সময়ে লেখা আমার ‘আগ্নেয়াস্ত্র’ কবিতার অন্তিম পঙিক্ত—‘হূদয়ের মতো মারাত্মক একটি আগ্নেয়াস্ত্র’ও ঠিক এভাবেই আমার মাথায় এসেছিল। ১৯৭৬ সালে লেখা ‘আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি’ পঙিক্তটিও এভাবেই আমার মনে আসে। পরে ঐ পঙিক্তটি ‘আমি আজ কারও রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতার প্রতি স্তবক শেষে মোট পাঁচবার ব্যবহার করা হয়। আমার আরো অনেক কবিতা রচনায় এই পদ্ধতিটি অনুসৃত হয়েছে।
‘তোমার চোখ এতো লাল কেন’—কবিতার এই পঙিক্তটিও ঠিক এভাবেই একদিন আমার মাথায় এসেছিল। ঐ কবিতাটির রচনাকাল ১৯৮৮-১৯৮৯ সালের মাঝামাঝি কোনো সময় হবে। আমার কোনো কবিতারই রচনা তারিখ বা স্থান আমি কখনো লিপিবদ্ধ করে রাখিনি। আমার কবিতার রচনাকাল সবই অনুমাননির্ভর। শুধু একটি ব্যাতিক্রম—‘নেই কেন সেই পাখি’ কাব্যগ্রন্থটি। ঐ গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোর শিরোনাম করা হয়েছে প্রতিটি কবিতার রচনা-তারিখকে। রচনা-তারিখ ছাড়া ঐ কবিতাগুলোর পৃথক কোনো শিরোনাম নেই।
‘তোমার চোখ এতো লাল কেন’ কবিতাটির রচনা-সময় ১৯৮৮-১৯৮৯ সালের মধ্যে বলছি এজন্য যে, এই কবিতাটি যে কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেই কাব্যগ্রন্থটির (যখন আমি বুকের পাঁজর খুলে দাঁড়াই) প্রকাশকাল হচ্ছে ১৯৮৯ সালের জুন মাস।
ঐ সময় আমি বুয়েটের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহূত পলাশী ব্যারাকের একটি সাবলেট নেওয়া কক্ষে থাকতাম। পাকা মেঝে, পাকা দেয়াল কিন্তু টিনের চাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সৈন্যদের থাকার জন্য এই টিনশেডগুলি তৈরি করা হয়েছিল। আমি থাকতাম ১৯ নম্বর টিনশেডে। বুয়েটের মালী সুন্দরলালের নামে বাসাটি বরাদ্দ ছিল। আমি তাঁর কাছ থেকেই বাসাটির একটি রুম সাবলেট নিয়েছিলাম। আমি সেখানে অনেক সময়ই একা থাকতাম। বাকি একটি রুমে সুন্দরলাল তাঁর পরিবার নিয়ে থাকতেন।
আমি প্রায়ই গভীর রাত করে বাড়ি ফিরতাম। ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেবার মতো কেউ ছিলো না বলে নিজের হাতে দরোজার তালা খুলেই আমাকে তখন ঘরে ঢুকতে হতো। বাইরে থেকেই খেয়ে আসতাম। বাইরে থেকে তালা খুলতে গিয়েই একদিন আমার মনে হলো—আমি ক্লান্ত প্রাণ এক। ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেয়া বা আমার চোখ এতো লাল কেন—এইরকম প্রশ্ন করার মতো ঘরের ভিতরে কেউ একজন থাকলে মন্দ হতো না। নিজেকে হঠাত্ খুব দুঃখী মানুষ বলে মনে হলো। এই ভাবনাটাকে উপজীব্য করেই এই কবিতাটি রচিত হয়, সম্ভবত ঐ রাতেই, আর নিশ্চিতভাবেই তার জন্মস্থান হচ্ছে পলাশী ব্যারাকের ঐ বাসাটি।
এখন যখন শুনি ঐ কবিতাটি কেউ-কেউ তাদের মুঠোফোনের রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করছেন, তখন আমার বেশ ভালো লাগে। বুঝি আমি একা নই।
নির্মলেন্দু গুণ, জন্ম :২১ জুন ১৯৪৫
