শেক্সপিয়রের পর যে লেখককে নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা ও বই লেখা হয়েছে তিনি ফ্রানত্স কাফকা (১৮৮৩— ১৯২৪)। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগের আগেই তাঁকে নিয়ে লেখা হয়ে গেছে ১০ হাজার বই। আর ১৯৯৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে প্রতি ১০ দিনে তাঁর ওপর বের হয়েছে একটি করে নতুন বই। বিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী রূপকাশ্রয়ী জার্মান ভাষার এ লেখক। এ যাবত্ সাহিত্যে নোবেলজয়ী ১০৯ জন লেখকের মধ্যে ৩২ জনই নিজেদের ওপরে কাফকার প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। তাছাড়া, বিংশ ও একবিংশ শতকের সেরা লেখক আলবেয়ার কাম্যু, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, জে এম কোয়েিজ ও জ্যাঁ পল সার্ত্রে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, তাঁরা কাফকা দ্বারা প্রভাবিত।
বিংশ শতকের সেরা লেখক হলেও তাঁর জীবদ্দশায় গুটিকয়েক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখক হিসেবে তিনি জীবিত থাকাকালীন খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। প্রকাশক কুর্ট ভোল্ফ তাঁর সময়কার তরুণ, মেধাবীদের নিয়ে কাজ করেছিলেন। তবে কাফকার সঙ্গে তাঁর কঠিন সময় গেছে। ১৯১২ সালে কাফকার প্রথম গল্পের বই প্রকাশ করেন তিনি। বইটির আটশ কপি ছাপা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো ভালো বিক্রি হয়নি। বই প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পর কাফকা লিখেছিলেন, ‘এগার কপি বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে দশ কপি আমি নিজেই কিনেছি। এগারোতম কপিটি কে কিনেছে সেটা জানতে মন চাইছে।’
মাত্র নয়টি পূর্ণাঙ্গ গল্প, তিনটি অসমাপ্ত উপন্যাস, সামান্য কয়টি অসমাপ্ত বড় গল্প, কিছু গদ্য-স্কেচ, ডায়েরি ও চিঠি রেখে যাওয়া এই লেখকের বন্ধুকে তিনি অনুরোধ করে গিয়েছিলেন তাঁর সব লেখা পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু ১৯২৪ সালের ৩ জুন কাফকার মৃত্যুর পর বন্ধু ম্যাক্স ব্রড তাঁর লেখাগুলো প্রকাশের উদ্যোগ নেন। অখ্যাত কাফকা হয়ে ওঠেন শতাব্দীর সেরা কথাশিল্পী। উল্লেখ্য, তাঁর ক্ষুদ্রায়তন পাণ্ডুলিপির দাম ধরা হয়েছিল ১০ কোটি পাউন্ড, কিন্তু অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তা বিক্রি করেনি। কাফকা সাহিত্যে ‘নিয়তি বা সম্ভবত এই লেখাগুলোর মহত্ত্ব এটাই যে, সবকিছু আছে এতে, কিন্তু কোনো কিছুই নিশ্চিত করা হয়নি।’
আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম এ ব্যতিক্রমী শিল্পী ফ্রানত্স কাফকা জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৩ সালে, প্রাগে, এক সচ্ছল মধ্যবিত্ত ইহুদি ব্যবসায়ী পরিবারে। অস্তিত্ববাদ ও অভিব্যক্তিবাদ তত্ত্ব প্রভাবিত জার্মানভাষী এ লেখকের কম শিক্ষিত বাবা হ্যারমান কাফকা (১৮৫২-১৯৩১) পেশায় ছিলেন একজন মাংস বিক্রেতা। প্রাগের জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের পাঠ সমাপ্ত করে ১৯০৬ সালের পরবর্তী কয়েক বছর একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন ফ্রানত্স কাফকা। অংশ নেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। হারমেইন এবং জুলির ছয়টি সন্তানের মধ্যে ফ্রানত্স কাফকা ছিলেন জ্যেষ্ঠ। ফ্রানত্স-এর বয়স যখন মাত্র সাত বছর তখন তাঁর ছোট দুই ভাই জর্জ এবং হাইনরিখ শিশুকালেই মৃত্যুবরণ করে। তাঁর তিন বোন এলি (১৮৮৯-১৯৪৪), ভেলি (১৮৯০-১৯৪২) এবং ওতলা (১৮৯২-১৯৪৩)। প্রত্যেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
কাফকার সময়ে প্রাগ ছিল ইউরোপের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এটি ছিল হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং উনিশ শতকের শেষে এটি জার্মান ও চেক সাহিত্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। কাফকার মতো অনেক লেখক উভয় ভাষাতেই পারদর্শী ছিলেন। মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এই শহর ও শহরের মানুষ কাফকার ওপর প্রভাব ফেলেছিলেন। একই সালে কাফকা প্রাগ শহরের জার্মান চার্লস-ফার্দিন্যান্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নশাস্ত্রে ভর্তি হন। তবে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি রসায়ন ছেড়ে আইনশাস্ত্রে ভর্তি হন। আইনশাস্ত্রে কাফকার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। কিন্তু তারপরও দুটি কারণে তিনি এই বিষয়ে অধ্যয়ন করার জন্য মনস্থির করেন। প্রথম কারণ হলো আইন পেশায় যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকায় তাঁর বাবা খুশি থাকবেন। অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অনেক দীর্ঘ কোর্স হওয়ায় তিনি দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করতে পারবেন এবং তাঁর প্রিয় বিষয় যেমন—ইতিহাস, কলা ও জার্মান শিক্ষায় ছোট ছোট কোর্স করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় কাফকার কয়েকজন বন্ধু ছিলেন, যাঁরা পরবর্তী জীবনে সাহিত্য ও কলার বিভিন্ন বিভাগে জনপ্রিয় হয়েছিলেন।
জীবনের অনিশ্চয়তা, অর্থহীন বিষাদমাখা অযৌক্তিক কাণ্ডকারখানা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গতা তাঁকে পীড়িত করে। তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। মানসিক দিক থেকেও তিনি বিধ্বস্ত বোধ করলেন। তাঁর মনে হলো এই জীবনের জন্য তিনি যথেষ্ট উপযুক্ত ও সক্ষম নন। ততদিনে তাঁর স্বাস্থ্য আরো খারাপ হয়েছে। দুরারোগ্য যক্ষ্মা শেষ পর্যন্ত কাফকার জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে দেয়। অনেক কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগের পর ১৯২৪ সালের মাঝামাঝি মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে ফ্রানত্স কাফকা মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর পূর্বেই তিনি রচনা করে ফেলেছেন অসাধারণ কয়েকটি উপন্যাস ও ছোটগল্প। কাফকার শ্রেষ্ঠ রচনাবলির মধ্যে রয়েছে তিনটি উপন্যাস—দি টায়াল (১৯২৫), দি ক্যাসল (১৯২৬) এবং আমেরিকা (১৯২৭)। উপন্যাস ছাড়াও কাফকা বেশ কয়েকটি অত্যন্ত উন্নতমানের, শিল্পগুণসম্পন্ন, গভীর মনঃস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণসমৃদ্ধ, আবেদনময় ছোটগল্প রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘মেটামরফোসিস’ (Die Verwandlung) বা রূপান্তর, ‘অ্যা হাঙ্গার আর্টিস্ট’, ‘অ্যান ওল্ড পেজ’, ‘দ্য মিসিং ম্যান’, ‘দ্য জাজমেন্ট’।
অন্তর্মুখী স্বভাবের এ জার্মানভাষী ইহুদি লেখকটি ধার্মিক হবার চেষ্টারত ছিলেন, প্রেম ও নারী বিষয়ে আজন্ম তিনি সুস্থির কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি, পিতার সঙ্গে দ্বন্দ্বটা চিরকালই তাঁকে ভুগিয়েছে অথচ স্পষ্টবাদিতা তো তাঁর মধ্যে তেমন ছিল না; সুতরাং নিজস্ব চিন্তাধারা বয়ান করবার জন্য বাধ্য হয়েই তাঁকে বেছে নিতে হয়েছিল রূপক, প্রতীক, গল্প বলবার জটিল ও জান্তব এক কৌশল, যেখানে প্রতিটি গল্পের পরিণতি তাঁকে ছেড়ে দিতে হয়েছে নিয়তির নিষ্ঠুর হাতুড়ির নিচে। তাঁর সময়কালে প্রাগের অধিকাংশ মানুষ চেক ভাষায় কথা বলত। চেক আর জার্মান ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে বিভাজন ছিল একটি স্পর্শকাতর বাস্তবতা, যেহেতু উভয়পক্ষই একই জাতীয় পরিচয়ের দাবিদার ছিল। কাফকা উভয় ভাষাতেই পারদর্শী হলেও জার্মান ভাষাকে নিজের মাতৃভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবর্ষের অধ্যয়নের শেষের দিকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাক্স বোর্ড নামে একজন ছাত্রের সঙ্গে পরিচিত হন, যাঁর সঙ্গে কাফকার আজীবন বন্ধুত্ব ছিল। ম্যাক্স বোর্ড লক্ষ করেছিলেন যে, কাফকা অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির এবং মিতভাষী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কথার মধ্যে নিগূঢ় উপলব্ধি থাকত। এছাড়াও কাফকা ছিলেন আজীবন একজন ক্ষুধিত পাঠক।
ফ্রানত্স কাফকা’র ‘ডি ভারওয়াল্ডলুং’ (দ্য মেটামরফোসিস) বা রূপান্তর একটি অস্তিত্ববাদী উপন্যাস হিসেবে সারা পৃথিবীতে খ্যাত। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে। এই উপন্যাসে যে দর্শন ও নির্মাণশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে তাতে উপন্যাসটির মধ্য থেকে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তবতার যথেষ্ট উপাদান পাওয়া যায়। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বা সালমান রুশদী যে ভাবে সচেতনভাবে জাদুবাস্তবতাবাদকে তাঁদের রচনায় ব্যবহার করেছেন, কাফকা ঠিক সেভাবে ব্যবহার করেননি। ফ্যান্টাসি ও জাদুবাস্তববাদী রচনাশৈলীর যুগল মিশ্রণ ‘রূপান্তর’ উপন্যাসে প্রয়োগ করেছেন কাফকা। ফ্যান্টাসি আসলে কল্পনার জগত্। প্রকৃত বিশ্বের সমস্যাকে অতিক্রম করে ফ্যান্টাসি অপ্রাকৃত জগতের দিকে নিয়ে যায়। সেই জগত্টা যতই কাল্পনিক বা অপ্রাকৃত হোক না কেন লেখকের নিপুণ রচনাশৈলী সেটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
জাদুবাস্তবতাবাদ ও ফ্যান্টাসির মিশ্রণে রচিত ‘রূপান্তর’ রূপক, দর্শনাত্মক অথবা প্রতীকাশ্রয়ী আখ্যান হিসেবে বিবেচিত। উপন্যাসে গ্রেগর সামসা নামে একজন ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায় সে একটি বড় আকারের পোকায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই রূপান্তর ঘটনায় তার পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করে যার জন্য শেষ পর্যন্ত সে মারা যায়। এটাই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। জাদুর বিষয় বা ঘটনা এমন—যার প্রত্যক্ষ বা পরীক্ষণলব্ধ প্রমাণ নেই। ইন্দ্রিয় দিয়ে তাকে বোঝা যায় না। তাই একে অতীন্দ্রিয় বা অতিপ্রাকৃতিক বলা হয়। অপ্রাকৃতিক বলা হলেও আসলে এসব ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে কোনো স্থান বা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, চর্চা বা জীবনাচরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে সংস্কৃতিরই অংশ হিসেবে।
এ উপন্যাসে গ্রেগরের রূপান্তরটাই হলো সত্যিকারের একটিমাত্র ফ্যান্টাস্টিক উপাদান। পরে যখন তার পরিবারের সদস্যরা জানতে পারল তার পোকায় রূপান্তরের ঘটনাটি, তখন তাদের আচরণের মধ্যে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটে সেটাই এ গল্পের আসল রূপান্তর। তা কিন্তু ফ্যান্টাসি নয়। মানুষ গ্রেগরের পোকায় রূপান্তরিত হওয়াটা বাস্তবে ঘটে না। এটা অতিমাত্রায় কাল্পনিক গল্পমাত্র। এই কারণে এটা সাহিত্যের অভিধায় ফ্যান্টাসি। আবার গ্রেগরের পোকায় রূপান্তরের কারণে তার বাবা, মা, বোনদের স্বভাবে যে আমূল পরিবর্তন ঘটল, তা কিন্তু অতিকল্পনা নয়। এটা বাস্তবসম্মত। যতই গ্রেগর এই পরিবারের কারো ছেলে বা কারো ভাই হোক না কেন, সে তো আর মানুষ নয়—পোকা মাত্র। কে পারে পোকাকে সহ্য করতে?
এ উপন্যাসের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত অংশ হচ্ছে গ্রেগরের বাবার পরিবর্তনটা যেভাবে হয়েছে সেটা। গ্রেগর আর তার বাবার ভেতরকার লড়াইটাও আসলে কল্পনাপ্রসূত। দ্বিতীয় অংশের শেষের দিকে ক্ষিপ্ত বাবা গ্রেগরের দিকে আপেল ছুড়ে মারেন। একটি আপেল তার পিঠে আটকে যায়। গ্রেগর ভীষণ ব্যথা পায়। অবশেষে সেটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়। গ্রেগর-এর চরিত্র চিত্রণ প্রকৃষ্টভাবেই জাদুবাস্তবতার একটি আদর্শ উদাহরণ। মানুষের চেহারার দিক থেকে একটি পোকায় রূপান্তরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনেরও রূপান্তর ঘটে। সে পোকার মতো আচরণ করতে থাকে। কিন্তু চিন্তা করে মানুষের মতো আবেগ ও অনুভূতি দিয়ে।
গল্পের শেষে গ্রেগর বুঝতে পারে তার পরিবার তাকে আর আগের মতো ভালোবাসে না। বরং তীব্র ঘৃণা করে। তার বাবাও আর তাকে স্নেহ করে না, সহ্য করতে পারে না। গ্রেগরের ইচ্ছে করে অন্তর্ধান হয়ে যেতে। অবিলম্বে মরে যেতে চায়। তার বোন যখন তাকে দেখে বলে ওঠে ওকে এবার যেতে হবে, তখন বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা লুপ্ত হয়ে যায়। তার বোনের উচ্চারিত শব্দ তিনটি তার পিঠে গেঁথে যাওয়া আপেলের ব্যথার চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক হয়ে দাঁড়ায়। গ্রেগর গভীর আবেগ ও ভালোবাসার সঙ্গে তার পরিবারের কথা ভাবে। তার প্রত্যয় হয় যদি সম্ভব হতো তবে সে এ জগত্ থেকে অদৃশ্য হয়ে যেত। অবশেষে যখন সে মারা যায় তখন তার বাবা বলে ওঠে, আমি এখন ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে পারি। এ গল্পে আছে কিছু কাল্পনিক এবং প্রচুর বাস্তব উপাদান। এ দুইয়ের মিশ্রণে পাঠক ভাবতে পারেন, কাফকা হচ্ছেন জাদুবাস্তববাদী কৌশলের অগ্রদূত। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, এ উপন্যাসে হোর্হে লুইস বোরহেস, ইতালো কালভিনো গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর তুলনায় জাদুবাস্তবতার উপাদান আছে অতি সামান্যই।
বিশ্বজুড়ে সাধারণ পাঠকের মনে ফ্রানত্স কাফকার নামের সঙ্গে উপন্যাসিকা বা বড় গল্প মেটামরফোসিস (রূপান্তর) অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। কেউ কেউ এর প্রারম্ভিক বাক্যটি সম্পর্কে বলেছেন যে, এটা হলো আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের সব চাইতে চমক জাগানিয়া অবিস্মরণীয় বাক্য। প্রিয় পাঠকদের কৌতূহলের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রথম বাক্যটি উদ্ধৃত করছি—Als Gregor Samsa eines Morgens aus unruhigen Träumen erwachte, fand er sich in seinem Bett zu einem ungeheueren Ungeziefer verwandelt.এই বাক্যটিকে David Wyllie ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন এভাবে—‘One morning, when Gregor Samsa woke from troubled dreams, he found himself transformed in his bed into a horrible vermin.’ যার বাংলা অনুবাদ হতে পারে এরকম—‘নানা আজেবাজে স্বপ্ন দেখার পর একদিন সকালে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে গ্রেগর সামসা দেখল, সে এক বিশাল পতঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে তার বিছানায় শুয়ে আছে।’ প্রথম লাইনটিতে অনেক ধরনের তাত্পর্যের সন্ধান দিয়েছেন কাফকা। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় আরশোলায় রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া গ্রেগর সামসা ধীরে ধীরে তার চিরচেনা জগত্ থেকে এবং তার স্নেহশীল পারিবারিক বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ তো গেল কাফকার মেটামরফোসিস গল্পের প্রসঙ্গ। আমরা কি ভেবে দেখেছি যে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কতবার আমরা রূপান্তরিত হচ্ছি। কত পরিসরে আমরা জীবনের অন্য রূপান্তর উপলব্ধি করছি?
একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করেন যে, তিনি এক বীভত্স, বিকটাকার পোকার রূপ ধারণ করেছেন। এই রূপান্তরের কারণে সমাজে তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। তিনি চাকরি হারান এবং তাঁর পরিবারও তাঁকে অস্বীকার করে। জীবনযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে রূপকাশ্রিতভাবে জীবন, সমাজ ও বাস্তবতার গভীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে উপন্যাসটিতে। মূলগল্প বলার চেয়ে এ পরিবেশনায় মুখ্য হয়ে উঠেছে গ্রেগরের জীবনযন্ত্রণার প্রতীকে পৃথিবীর তাবত্ জীবনবাস্তবতার নববিশ্লেষণ। ‘রূপান্তর’ বইটির মাধ্যমে কাফকা সমাজের কাছে একটি প্রশ্ন রেখেছেন, একজন মানুষ কেন অথবা কোন কারণে মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়?
আলোচ্য গল্পটির মূল চরিত্র গ্রেগর সামসা ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান—যাকে নিত্যদিন ভোর চারটার ট্রেন ধরতে হয় অফিসের জন্য, এক সকালে ঘুম ভেঙে দেখল চার পেরিয়ে সাত বেজে যাচ্ছে, রোজকার সময়ে তার ঘুম ভাঙেনি বরং সে বিছানায় চিত্ হয়ে শুয়ে আছে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আকারের এক পোকা হয়ে। অনুমান করি কাফকা তাঁর গল্পের নামকরণে ওভিদ থেকেই উত্সাহ পেয়ে থাকবেন। ‘মেটামরফোসিস’ নামে রোমান কবি ওভিদের লাতিন ভাষায় যে মহাকাব্য আছে ওতে দুর্দান্ত সব রূপান্তরের কাহিনি রয়েছে—যেখানে নার্সিসাস হয়ে যায় গাছ কিংবা জিউস যৌনকাতর হয়ে ষাঁড়ে রূপান্তরিত হন, ষাঁড়ের বেশেই মিলিত হন কাঙ্ক্ষিত নারীর সঙ্গে। অনুমান করি কাফকা তাঁর গল্পের নামকরণে ওভিদ থেকেই উত্সাহ পেয়ে থাকবেন। আবার এপুলিয়াসের গোল্ডেন অ্যাস (যার লাতিন অর্থও রূপান্তর)-ও কাফকাকে মুগ্ধ করে থাকবে হয়তো। সে রূপান্তর আরো বিচিত্র। এপুলিয়াসের নায়ক জাদু ব্যবহার করে পাখি হতে চায়। কিন্তু ভ্রান্তিজনিত কারণে সে মানুষ থেকে বদলে যায় গাধায়।
গ্রেগরের পোকায় রূপান্তর হবার সকালটি থেকে মূলত গল্পের শুরু বলা যায় না। মূল গল্প শুরু হয় তখন যখন বেলা বাড়ে, গ্রেগর তার রুমের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে জান্তব কণ্ঠে কথা বলতে থাকে, তার অফিসের বড় কেরানি চলে আসেন খোঁজ নিতে—এমন কী হলো যে অফিসে যেতে পারেনি গ্রেগর? এর কিছুক্ষণ পর গ্রেগর মুখ দিয়ে চাবি কামড়ে ধরে কোনোরকমে নিজের কামরার দরজা খুলে উঁকি মারে বাইরে, তার পোকার রূপান্তরিত অবস্থা দেখে মা অজ্ঞান হয়ে যান, কেরানি দৌড়ে পালায় এবং বাবা ভয় পান, ক্রোধান্বিত হন, কেরানির ফেলে যাওয়া ছড়িটা নিয়ে তার দিকে ধেয়ে আসেন, গ্রেগরকে বাধ্য করেন নিজের রুমে ফিরে যেতে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম যুবকটির এক সকালে হঠাত্ পোকা হয়ে যাওয়া অকল্পনীয়। পুরো বিষয়টাকে সরলাঙ্কে জাদুবাস্তবতা বলে মনে হয়, আসলে কি তা-ই? রূপান্তর নিখাদ বাস্তবতার গল্প, নিরেট এবং এক নিম্নমধ্যবিত্ত জার্মান পরিবারের। গল্পটায় পরিষ্কার হয়ে ওঠে কাফকার নির্মম ফ্যান্টাসি; যেহেতু তাঁর পৃথিবীটাও নির্মম। গ্রেগর সামসা সকাল-সন্ধ্যা হাড়ভাঙা পরিশ্রমেই অর্থ উপার্জন করে, ছুটির দিনগুলোয় পরিবার নিয়ে চলে যায় কোনো অবকাশযাপন কেন্দ্রে, এছাড়া আর কোনো নতুনত্ব তাদের জীবনে ছিল না। কাফকা ঠিক এই স্বাভাবিকতার মধ্যে ভয়ংকর গোলযোগ তৈরির জন্য সামসার মেটামরফোসিস কল্পনা করলেন, তাকে বানিয়ে দিলেন পোকা। পোকাটি খোলাচোখে কিম্ভূত, স্বাভাবিক আকৃতির চেয়ে বড় একটা মাকড়। কিন্তু আবিষ্কার করতে হয় সে আসলে এক অস্বস্তি, চারপাশে যে নিয়মে চলছে, তার বিরুদ্ধে সে একটা ব্যতিক্রম। যে পুত্রটি ছাড়া পরিবারের কোনো গতি ছিল না, সবার কাছে সে ছিল উন্নতি ও সমৃদ্ধির জীবন্ত প্রত্যাশা—হঠাত্ রূপান্তরে পরিবারের সকলের চোখে তার অবস্থান কেমন বদলে যেতে শুরু করে, আমরা সেটা নির্মমভাবে টের পেতে থাকি। এটাই মূলত রূপান্তর।
