ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমির প্রথাগত অধিকারের সুরক্ষা প্রয়োজন

আপডেট : ২০ জুন ২০১৯, ২১:৫৮

 ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘প্রান্তিক ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর বৈষম্য, বিচ্ছিন্নতা এবং অধিকার’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী জাতীয় সম্মেলন। গতকাল আগারগাঁওয়ের এলজিআরডি মিলনায়তনে সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি), খ্রিস্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (সিপিডিপি) এবং গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র (জিবিকে)-এর যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেড-এর পরিচালক ফিলিপ গাইন।

ফিলিপ গাইন বলেছেন, ‘বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি ছাড়াও অনেক ধরনের জাতিসত্তার মানুষ আছে। সরকার আগের ২৪ জাতিসত্তার পরিবর্তে এখন ৫০টিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আরো ৫০-এর অধিক জাতিগোষ্ঠীর স্বীকৃতি দিতে হবে। এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান থাকা দরকার; কিন্তু সরকারিভাবে এর জন্য উদ্যোগ অপর্যাপ্ত।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মধুপুরের ৪৪টি গ্রামে জরিপ করেছি। এক সময় যেখানে সবাই গারো ও কোচ ছিলো সেখানে এখন ৬৫ শতাংশ বাঙালি। এসব গ্রামে ১১ শতাংশ বাঙালির ভিটেমাটির মালিকানা দলিল আছে আর গারোদের আছে মাত্র চার শতাংশ। বন মামলা মধুপুরের মানুষকে আতঙ্কিত করে রেখেছে। এখানে একজনের নামে ১০০টি পর্যন্ত মামলা হয়েছে। হরিজনদের চাকরির জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পরিষ্কারভাবে ৮০ শতাংশ কোটার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। চা বাগানে মাতৃমৃত্যুর হার অন্য জায়গার চেয়ে বেশি; কিন্তু কেন?’

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, মাঝে মধ্যে আমরা শুনি চা বাগানে ন্যায্য মজুরির জন্য আন্দোলন হচ্ছে। গারোদের জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে। মূলত যাদের টাকা আছে, রাজনৈতিক  ক্ষমতা আছে, তারাই এসব শোষণ ও দখলদারিত্বের সঙ্গে জড়িত। এসব সমস্যা সমাধানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে শক্তি অর্জন করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমির প্রথাগত অধিকারের সুরক্ষা প্রয়োজন। এজন্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।  বাজেটে এসব মানুষের কথা থাকতে হবে। অন্যথায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের একাত্তরের চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘সমাজের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের কাছে প্রান্তজনদের সমস্যা-সংকট পৌঁছে দেওয়া আজকের এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য। প্রান্তিক সব সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ’

সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন সাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রামভজন কৈরী, সিপিবির সম্মানীত ফেলো অধ্যাপক রওনক, সিসিডিবির নির্বাহী পরিচালক জয়ন্ত অধিকারী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি অর্ডে ম্যালিয়ট প্রমুখ। সম্মেলনে বেদে, হরিজন, কায়পুত্র, চা জনগোষ্ঠী, বিহারি, ঋষিসহ ৫০ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের তিন শতাধিক মানুষ অংশ নেন।

সম্মেলনে ‘মধুপুর: দ্যা ভ্যানিশিং ফরেস্ট এন্ড হার পিপুল ইন অ্যাগোনি’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আইনুন নাহারের সভাপতিত্বে ‘বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি এবং ভাষা’, ইএনএফপিএ-এর কর্মকর্তা মো. শামসুজ্জামানের সভাপতিত্বে ‘প্রান্তিক বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’, এবং ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার সভাপতিত্বে ‘প্রান্তিক ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সনদ ও জাতীয় আইন’ নিয়ে তিনটি সমান্তরাল অধিবেশনে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেন এবং ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।