বুধবার, ২৬ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

যে চিন্তা এগিয়েছে অনেক দূর

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৩, ০০:০৫

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। এরপর মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে তিনি বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। একটি সফল রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় এমন কোনো বিষয় নেই, যা বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় ছিল না। তিনি রেখে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের শক্ত ভিত। কিন্তু দেশবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে শহিদ হন স্বাধীনতার এই স্থপতি। এরপরের ইতিহাস সবারই জানা। স্বাধীনতা অর্জিত হলেও দেশের মানুষ স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ আস্বাদনে ছিল ব্যর্থ। দীর্ঘ দুই দশক পর সৃষ্টিকর্তার অসীম অনুগ্রহে বাঙালি জাতির ভাগ্যাকাশে উদিত হয় সৌভাগ্যের শুকতারা। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। 

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জনগণের দুর্দশা লাঘবে বঙ্গবন্ধু ছিলেন একান্ত আন্তরিক। জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে—যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না—যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না—যদি এ দেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে, তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।’ 

জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। বর্তমানে তার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা শত বাধাবিপত্তির মধ্যেও বাবার আদর্শকে অনুসরণ করে বাঙালি জাতিকে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন দেশ গড়ার কাজে। শেখ হাসিনার সরকার অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পাশাপাশি হাতে নিয়েছে ডেলটা প্ল্যান ২১০০, ভিশন ২০২১ এবং ভিশন ২০৪১।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে এ দেশের শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে বঙ্গবন্ধু ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় ৩৬ হাজার ১৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়। এই সময় বাড়ানো হয় শিক্ষকদের বেতন। ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে একটি  প্রেস নোটের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে বই পাবে বলে ঘোষণা করা হয়। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বই পাবে বাজারমূল্যের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম মূল্যে। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে ১৯৭৩ সালে জানুয়ারি মাসে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু করার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বাধীন সরকার ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নতুন করে জাতীয়করণ করেছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষকের চাকরি সরকারিকরণ করেছে। ১৯৯০ সালে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর শতকরা হার ছিল ৬১। বর্তমানে তা উন্নীত হয়েছে শতকরা ৯৭ দশমিক ৭ ভাগে। সুবিধাবঞ্চিত গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট আইন, ২০১২’ প্রণয়ন করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে ‘শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট’। জেলায় জেলায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রসারিত হচ্ছে বৃত্তিমূলক গবেষণার সুযোগ। গুরুত্ব পাচ্ছে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা। 

স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর সরকার নগরভিত্তিক ও গ্রামীণ জীবনের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূরীকরণের পদক্ষেপ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৫০০ ডাক্তারকে গ্রামে নিয়োগ করেন। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘থানা স্বাস্থ্য প্রকল্প’ বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আজও স্বীকৃত। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে নজর দেন। ১৯৭৩ সালের ১৮-২৪ অক্টোবর জাপান সফরকালে জাপানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের সূচনা করেন। ১৯৯৬ সালে প্রথম বার ক্ষমতায় এসে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প গ্রহণ করে শেখ হাসিনার সরকার। ঐ প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে কমিউনিটি ক্লিনিকের মতো জনবান্ধব মানবিক উদ্যোগকে বন্ধ করে দেয়। তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার আবার ক্ষমতায় আসার পর পুনরায় এই প্রকল্প চালু করে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে সুযোগ-সুবিধা। স্থাপন করা হয়েছে হূদেরাগ, কিডনি, লিভার, ক্যানসার, নিউরো, চক্ষু, বার্ন, নাক-কান-গলাসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। ক্রমবর্ধমান নার্সের চাহিদা মেটাতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নার্সিং ইনস্টিটিউট। প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি করে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন করার কাজ চলছে। প্রত্যেক বিভাগে একটি করে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৫টি সংস্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) সদস্যপদ লাভ করেন। আর্থসামাজিক জরিপ, আবহাওয়ার তথ্য আদান-প্রদানে আর্থ-রিসোর্স টেকনোলজি স্যাটেলাইট প্রোগ্রাম বাস্তবায়িত হয় তারই নির্দেশে। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু বেতবুনিয়ায় স্যাটেলাইটের ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধুর শুরু করা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন পরিপূর্ণতা পায় তারই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। তিনি ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের ঘোষণা দেন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিস্ময়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। সবার জন্য কানেকটিভিটি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, ই-গভর্নমেন্ট এবং আইসিটি ইন্ডাস্ট্রিজ প্রমোশন—এই চারটি সুনির্দিষ্ট স্তম্ভের ওপর বাস্তবায়িত হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। এরই ধারাবাহিকতায় পদ্মা সেতু বাঙালির সক্ষমতার প্রতীক হয়ে সগর্বে দণ্ডায়মান। ঢাকা মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ এবং কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেলের মতো প্রকল্পগুলো শেখ হাসিনা দূরদর্শী চিন্তা ও প্রজ্ঞার প্রতিফলন। সময়ের পরিক্রমায় এটাই প্রমাণিত, ‘রক্ত কথা বলে’। তাই তো তার ধ্যান-জ্ঞান-কর্ম ও বিশ্বাসে এ দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও প্রগতির ঐকতান। 

লেখক : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ