অবহেলায় প্রসূতির মৃত্যু

১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় দফারফা, পরিবার পেল ৬৫ হাজার

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৩, ১৯:৫০

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা সদরের সুরমা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সাবিত্রী রানী (২২) নামে এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর রোগীর পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন ক্লিনিকের সামনে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু গভীর রাতে বিষয়টি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় সমঝোতা করা হলেও রোগীর পরিবার পেয়েছে মাত্র ৬৫ হাজার টাকা। তিনজন চেয়ারম্যান, ক্লিনিক মালিক, রোগীর পরিবারের লোকজন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গেরা মিলে এই সমঝোতা করেছেন। এ সময় বোদা থানা পুলিশও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

ছবি: ইত্তেফাক

জানা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রাজাগাঁও ইউনিয়নের চাপাতি এলাকার কমল চন্দ্র রায় তার প্রসূতি স্ত্রী সাবিত্রী রানীকে শনিবার (১ এপ্রিল) বিকালে সিজার করার জন্য বোদা উপজেলা সদরের সুরমা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি করে। প্রসূতির অবস্থা গুরুতর হলেও সময়ক্ষেপণ করতে থাকে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। দেড় ঘণ্টা ধরে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিয়ে রাখা হয় রোগীকে। সন্ধ্যায় ডাকা হয় বোদা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের গাইনি চিকিৎসক ডা. রহমতউল্লাহ ও ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (অবেদনবিদ) শামসুল হুদাকে। চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় চিকিৎসকরা গিয়ে রোগীর অবস্থা দেখেই সঙ্গে সঙ্গেই উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন। তড়িঘড়ি করে তাকে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। রোগী বাঁচাতে রোগীর লোকজন বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পেটেই মৃত্যু হয় নবাগত শিশুর। 

ছবি: ইত্তেফাক

রোগীর পরিবারের অভিযোগ, ক্লিনিকেই মৃত্যু হয় ওই প্রসূতির। দায় এড়ানোর জন্য ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ জোরপূর্বক বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। প্রসূতির মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ লোকজন ওই ক্লিনিকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের তর্কবিতর্ক শুরু হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। 

এদিকে বিষয়টি সমঝোতার জন্য শুরু হয় তোড়জোড়। গভীর রাতে পুলিশ স্থানীয় তিনজন জনপ্রতিনিধি, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ও রোগীর পরিবার নিয়ে সমঝোতা শুরু হয়। ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। রোগীর পরিবারকে দেওয়া হয় মাত্র ৬৫ হাজার টাকা। 

সুরমা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক বোদা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক সুরমা বেগম।

প্রসূতির স্বামী কমল রায় বলেন, মামলা করে কি হবে? অযথা ঝামেলা বাড়বে। স্ত্রী-সন্তানকে তো আর ফেরত পাব না? কত টাকায় দফারফা হয়েছে না জানলেও তিনি ৬৫ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন।

ছবি: ইত্তেফাক

প্রসূতির প্রতিবেশী দেবর দিপু রায় বলেন, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই আমার বৌদির মৃত্যু হয়েছে। তারা অপারেশন করতে পারবে না আগে জানিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু তারা তা না করে রোগী ও আমাদের অপেক্ষায় রাখেন। অপারেশন থিয়েটারেই রোগীর মৃত্যু হয়। তারপর তারা কৌশলে রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর তোড়জোড় করে। পরে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আনান আফসান তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আলট্রাসনোগ্রাম করে দেখা যায় বাচ্চাটিও পেটেই মারা গেছে। ৬৫ হাজার টাকা ওই প্রসূতির স্বামীকে দেওয়া হয়েছে বলে আমি শুনেছি।

ইজিবাইক চালক মনোরঞ্জন রায় বলেন, ক্লিনিকের লোকজন অপারেশন থিয়েটারে দেড় ঘণ্টা ওই প্রসূতিকে ঢুকিয়ে রাখে। তারা আমাদের ৬ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করতে বলে। ইফতারের পর ডাক্তাররা এসে তাড়াতাড়ি অন্য হাসপাতালে নিতে বলেন।এ সময় আমি প্রসূতি মায়ের পালস ও নাকে হাত দিয়ে দেখি কোনো সাড়া-শব্দ নেই। এর মধ্যেই তারা অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেয়। আমরা বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আনন আফসান বলেন, ওই প্রসূতি মাকে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (অবেদনবিদ) ডা. শামসুল হুদা বলেন, আমি যাওয়ার আগেই ওই রোগীকে রেফার্ড করা হয়েছে। তার জরায়ু ফেটে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। আইসিইউ ছাড়া তার অপারেশন সম্ভব ছিল না।

ছবি: ইত্তেফাক

বোদা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের গাইনি চিকিৎসক ডা. রহমতউল্লাহ বলেন, আমরা গিয়ে রোগীর অবস্থা দেখে দ্রুত রেফার্ড করতে বলেছি।
  
সুরমা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক সুরমা বেগম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ওই রোগীকে আমরা স্পর্শ করিনি। ডাক্তাররা দেখে দ্রুত রেফার্ড করতে বলেন। আমরা তো সঙ্গে সঙ্গে রেফার্ড করে দিয়েছি।

বোদা থানার ওসি সুজয় কুমার রায় বলেন, আমি কোনো মীমাংসায় উপস্থিত ছিলাম না। হট্টগোল হওয়ায় পুলিশ পাঠিয়েছিলাম। ওই পরিবার অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে শুনেছি টাকার বিনিময়ে আপোষ করা হয়েছে।

বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এস আই এম রাজিউল করিম রাজু বলেন, ওই ক্লিনিকটি এক সময় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা রেজিস্ট্রেশনের জন্য সব কাগজপত্র জমা দিলে তাদের কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়।

ইত্তেফাক/পিও