৬ কোটি টাকার সেতুর সংযোগ সড়কে উদ্বোধনের ২ মাসেই ধস

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:১৮

পঞ্চগড়ের বোদায় নির্মাণের মাত্র দুই মাসের মাথায় একটি গার্ডার ব্রিজের দুই পাশের সংযোগ সড়ক ধসে পড়েছে। প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে সেতুটি। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছিল নির্মাণকাজ। সর্বশেষে দুই মাস আগে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

কিন্তু টানা বৃষ্টিও নয়, রাতের হালকা বৃষ্টিতেই ধসে পড়েছে সেতুর দুই পাশের প্রায় ২০০ মিটার সংযোগ সড়ক। এতে প্রতিদিনই ঘটছে নানা ধরনের দুর্ঘটনা, আর চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয় মানুষ ও যানবাহনকে।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বোদা উপজেলার ঝলই শালশিরী ইউনিয়নের ধরধরা এলাকায় টাঙ্গন নদীর ওপর নবনির্মিত ব্রিজটিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।

এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত ব্রিজের ক্ষতিগ্রস্ত সংযোগ সড়ক সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা হোক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। এর মধ্যে ব্রিজ সংলগ্ন টাঙ্গন নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে সংযোগ সড়ক ভরাটের অভিযোগও ওঠে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

স্থানীয় ইউপি সদস্য প্রিয় নাথসহ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, নদী থেকে বালু তুলে সড়ক ভরাটের সময় তাদের বলা হয়েছিল, এতে রাস্তা আরও মজবুত ও টেকসই হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এলজিইডির মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এমন আশ্বাসে তারা তখন কাজে বাধা দেননি। তাদের দাবি, নদী থেকে তোলা নরম বালুর ওপর পর্যাপ্তভাবে মাটি ও অন্যান্য উপকরণ না দিয়ে দ্রুত হেরিংবোন সড়ক নির্মাণ করায় এখন তা ধসে পড়ছে।

এর আগে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয়দের অভিযোগের মুখে তা আর উদ্বোধন করা হয়নি বলে জানা গেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ সেসময় এলাকাবাসীর অভিযোগ শুনে কাজের দুরবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এলজিইডির জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন বলে স্থানীয়রা জানান। ওই ঘটনার ভিডিও ও খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুর রহমান বলেন, চার বছরের বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ চলার পর মাত্র দুই মাস আগে সড়কটি মানুষের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে সামান্য বৃষ্টিতে সড়ক ধসে পড়া নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তার মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এলজিইডির তদারকি যথাযথ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

তবে সড়ক ধসে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে এলজিইডি।

বোদা উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী আকরাম হোসেন বলেন,

সেতুর দুই দিকের প্রায় ২০০ মিটারের এইচবিবি রাস্তাটি বৃষ্টিতে ভেঙে পড়েছে। ইতিমধ্যে রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করতে সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে রাস্তাটি এভাবে ধসে যাবে, তা আমরাও ভাবিনি। নিম্নমানের কাজের পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কী ধরনের গাফিলতি ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি জানান, ব্রিজের বোদা উপজেলার ধরধরা ও আটোয়ারী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া অংশের সংযোগ সড়কটি এইচবিবি পরিবর্তে স্থায়ীভাবে কার্পেটিং করার জন্য নতুন বরাদ্দের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

পঞ্চগড় এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানার পরপরই আমরা সেখানে যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এখনও চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়নি। তদন্তে যদি ঠিকাদারের গাফিলতি বা কাজের নিম্নমানের প্রমাণ মেলে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস কর্পোরেশন। ৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত জনগুরুত্বপূর্ণ এই ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক ব্যবহারের দুই মাসের মধ্যেই ধসে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, সাময়িক সংস্কার নয়, নির্মাণকাজের মান যাচাই করে ত্রুটির স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

পঞ্চগড় জেলার দুই উপজেলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য টাঙ্গন নদীর ওপর দুই উপজেলার নির্মাণ করা হয় সংযোগ ব্রিজ। এই ব্রিজ দিয়ে বোদা উপজেলার ধরধরা ও আটোয়ারী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। তবে নির্মাণ শেষ হওয়ার মাত্র ২ মাসের মধ্যেই ব্রিজটির দুই পাশের সংযোগ সড়ক ধসে পড়ে। ফলে ব্রিজের উভয়পাশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে যানবাহন ও পথচারীদের চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানান স্থানীয়রা।

ইত্তেফাক/এপি