গত সেপ্টেম্বর মাসে মাশহাদের কাছে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এক শহরে বিক্ষোভ চলার সময় এলাহে তাভোকোলিয়ান নামের এক ছাত্রী ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত হন । ঐ ঘটনায় পিএইচডি ডিগ্রির এই ছাত্রী তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। ঘটনাটির তিন মাস পর এলাহে তাভোকোলিয়ান ইনস্টাগ্রামে তার জীবনের ঐ কঠিন অধ্যায়ের ওপর একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। ছবি বিবিসি।
'তোমরা আমার চোখের দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলে। কিন্তু আমার হৃদপিণ্ড এখনও সচল রয়েছে,' ঐ পোস্টে তিনি লিখেছেন। 'আমাকে দৃষ্টিহীন করার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ। কিন্তু এই ঘটনা বহু লোকের চোখ খুলে দিয়েছে।
'আমার হৃদয়ের গভীরে থাকা আলো আর আগামীতে সুদিনের আশা আমার মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু তোমাদের হৃদয় এবং তোমাদের সেনাপতির হৃদয় দিন দিন অন্ধকারে ডুবে যাবে।
'কিছুদিনের মধ্যে আমি পাবো একটি কাঁচের চোখ, আর তোমরা পাবে পদক।'
এলাহে সম্প্রতি ইরান ছেড়ে চলে গেছেন এবং তার খুলিতে ঢুকে থাকা একটি বুলেট অপসারণের জন্য ইতালিতে তার একটি বড় অপারেশন হয়েছে। হাসপাতালের বিছানা থেকে তিনি নিজের একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন: 'এই ঘটনা বর্ণনা করার জন্যই আমাকে বেঁচে থাকতে হবে।'
অপারেশনের পর তিনি এক গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে বুলেটটি দেখানোর পরিকল্পনা করছেন।
একা নন কেউ
গত সেপ্টেম্বরে ‘সঠিকভাবে’ মাথার স্কার্ফ পরতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে পুলিশের হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর থেকে হাজার হাজার মানুষ ইরানের ধর্ম-ভিত্তিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) বলছে, এরপর যে পুলিশি ধরপাকড় শুরু হয় তাতে প্রায় ২০,০০০ লোককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অন্তত ৫০০ জন নিহত হন।
পুলিশের গুলিতে যেসব তরুণ-তরুণী অন্ধ হয়ে গেছেন তারা বলছেন, বেছে বেছে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল। কিন্তু ইরানের দাঙ্গা পুলিশের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান কারামি সম্প্রতি ইরানি গণমাধ্যমে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেন, তার বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ প্রতিবাদকারীদের মুখে গুলি চালানোর অভিযোগগুলি আসলে ‘অপপ্রচার।’
যাদের মুখে গুলি লেগেছে আইনের ছাত্র গজল রঞ্জকেশ তাদের একজন। নভেম্বরে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বন্দর আব্বাসে তার গুলি লাগে। এই ঘটনা সবাইকে জানানোর জন্য ২১ বছর বয়সী গজলই প্রথম সোশ্যাল মিডিয়ায় তার আঘাতের বিষয়ে প্রকাশ্যে ভিডিও পোস্ট করেছিলেন।
হাসপাতালের বিছানা থেকে তিনি যে ভিডিওটি শেয়ার করেছেন তাতে দেখা যাচ্ছে তার ডান চোখ থেকে রক্ত ঝরছে। কিন্তু তিনি তখনও আঙ্গুল দিয়ে বিজয়-সূচক ভি চিহ্ন দেখাচ্ছেন।
এই ভিডিওটি ভাইরাল হয়, দেশ-বিদেশে ইরানিরা দেখতে পান যে কীভাবে তরুণদের বন্দুকের নিশানা করা হচ্ছে।
'আমাকে যখন গুলি করছিলে তখন তোমার মুখে হাসি ছিল কেন?' ভিডিওর পোস্টে লিখেছেন গজল।
কিন্তু গজলের এই পোস্টের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক অনন্য ঘটনা। একইভাবে আঘাত পেয়েছেন যেসব নারী-পুরুষ তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ঘটনা শুধু তাদের জীবনেই ঘটেনি। ট্রমায় সাহায্য পাওয়ার জন্য তারা অনলাইনে একই ধরনের কিছু মানুষকে খুঁজে পান।
সম্প্রতি তিনি নিজের কিছু নতুন ছবি পোস্ট করেছেন। ভালোভাবে লক্ষ্য না করলে ছবিগুলো দেখে মনে হবে এগুলো ফ্যাশন ফটোগ্রাফি।
'এখনও অসহ্য ব্যথা রয়েছে, কিন্তু এতে একসময় অভ্যস্ত হয়ে যাবো,' তিনি লিখেছেন। 'আমার জীবন চলতে থাকবে কারণ আমার কাহিনী এখনও শেষ হয়নি। আমাদের বিজয় এখনও আসেনি ঠিকই, তবে প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে।'
গজলকে একটি কৃত্রিম চোখ দেওয়া হয়েছে, এবং এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সময় তিনি তার কঠোর সংগ্রামের কথা লিখেছেন। তিনি জানালেন, মুখাবয়বের ক্ষতের সঙ্গে তিনি মানিয়ে নিয়েছেন এবং এমনকি এনিয়ে কিছুটা গর্বও অনুভব করেছেন। তবে প্লাস্টিক সার্জারি করাটা ছিল প্রচণ্ড বেদনাদায়ক।
কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে লড়াকু মনোভাব। 'একটি চোখ নিয়েই আমি স্বাধীনতার সাক্ষী থাকবো,' লিখেছেন তিনি।
'জীবন্ত সাক্ষী'
ইরানজুড়ে এভাবে মোট কতজন মানুষ আহত হয়েছেন তার সঠিক হিসেব কেউ জানে না। হাসপাতাল থেকেই গ্রেপ্তার হতে পারেন এই ভয়ে অনেক বিক্ষোভকারী চিকিৎসা সেবা নিতেও ভয় পেয়েছিলেন।
নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা হিসেব করে বের করেছে, একই রকম আহত অন্তত ৫০০ জন গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে তেহরানের তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
তেহরানের এক স্ট্রিট পারফর্মার মোহাম্মদ ফারজি (৩২) সেপ্টেম্বরে গুলিবিদ্ধ হন। বার্ডশট বা ছররা গুলি তার চোখে ঢুকে যায়।
'এনিয়ে আমার কোন অনুতাপ নেই,' বলছিলেন তিনি। 'আমি গর্বিত যে মানুষের মুক্তির জন্য আমি আমার চোখটা উৎসর্গ করতে পেরেছি।'
গ্রেপ্তারের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই ফারজি হাসপাতালে গিয়েছিলেন এবং তার চোখটিকে বাঁচানো সম্ভব হতো। কিন্তু তার টাকা-পয়সা ফুরিয়ে যাওয়ায় তৃতীয় দফা অপারেশনের আগে তার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়।
'মূল সমস্যা হল আর্থিক, মানসিক এবং মেডিকেল চিকিৎসা,' তিনি উল্লেখ করেন।
হাসপাতালের ফি বাবদ তার দু’হাজার ডলার সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে অনুমান করা হয়।
ডা. মোহাম্মদ জাফর ঘামপানাহ প্রায় ৪০০ জন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞদের একজন যারা একটি আনুষ্ঠানিক আবেদনপত্রে সই করেছেন। আবেদনপত্রে আহতদের প্রতি আরও বেশি চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
দৃষ্টিহীন বিক্ষোভকারীরা চির জীবনের জন্য সমাজের চোখে দোষী হয়ে থাকবেন, বলছেন তিনি।
'জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই যুবক-যুবতীরা ইরানের ক্র্যাকডাউনের জীবন্ত প্রমাণ হয়ে বেঁচে থাকবেন,' সম্প্রতি এক ভিডিওতে তিনি বলেন। ঐ ভিডিওটিও ভাইরাল হয়েছে।
মোহাম্মদ ফারজি নিশ্চিত যে অনলাইনে তিনি মানুষের কাছ থেকে যে সমর্থন পেয়েছেন তা বাস্তব জীবনে বন্ধুত্বে পরিণত হবে।
আরেকজন আহত নারী কোসার ইফতেখারিকে সাথে নিয়ে এলাহে তাভোকোলিয়ানকে হাসপাতালে দেখতে তিনি প্রায় ৯০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। এলাহের সামনে একটা বড় অপারেশন ছিল।
'এই সামান্যটুকুই আমরা একে অন্যের জন্য করতে পারি,' বলছেন তিনি। 'আমরা একে অন্যের ব্যথা, কষ্ট সম্পর্কে জানি। এজন্যই আমাদের একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে।'
সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা একটি ছবি শেয়ার করেছেন, যেখানে আহত সবাই বিজয়ের ভি চিহ্ন তুলে ধরেছেন।
