সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
কা-কা-কা। কয়েকটি কাক তারস্বরে চেঁচিয়েই যাচ্ছে। অন্যসময় হলে তোতা চাকলাদার ভীষণ বিরক্ত হতো। সকালবেলা মাত্র ব্যবসার শুরু, এই সময়ে কা-কা শব্দ কারই বা ভালো লাগে! যখন পাড়ার ছেলে-ছোকরার দল এসে তাকে ‘কাকা, পাঁচটা চা’ বলে দোকানের সামনে পেতে রাখা বেঞ্চিতে বসে পড়ে, তখন মনে দারুণ পুলক অনুভব করে তোতা চাকলাদার। সেই একই ‘কাকা’ রব তুলে কাকেরা ডাকলেই আর সহ্য হয় না! তবে, আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। আজ যেন কাকদের ‘কা-কা’ আর পাড়ার ছেলেদের ‘কাকা’ তার কাছে মিলেমিশে একাকার!
চাকলাদার চা বানিয়ে কুল পাচ্ছে না। মাত্রই দিনের শুরু। সারাটা দিন তো পড়েই আছে। হিরুর চ্যালা-চামুন্ডার দল এরমধ্যে এসে আসন গেড়েছে। গোগ্রাসে কয়েককাপ চা খেয়ে ফেলল, তিনদিনের অভুক্ত মানুষ হঠাত্ খাবার পেলে যেভাবে খাবার গিলে আর কী! ‘আহা! এমনি করেই যদি বছরের প্রতিটা দিনের সূচনা হতো...’ চাকলাদার দিবাস্বপ্ন দেখে।
একটু পরে হিরু এসে উপস্থিত হলো। সে আসা মাত্রই তার চ্যালাদের মধ্য থেকে কয়েকজন উঠে হিরুর পুরো শরীরটা চেক করে দেখল।
একজন আরেকজনকে শুনিয়ে নিচু স্বরে বলল, ‘কই, দেখছি না তো।’
‘তোরে কি পাগলা কুত্তায় কামড়িয়েছে!’ বলল দ্বিতীয়জন। ‘হিরু ভাই এখান অবধি তা বয়ে নিয়ে আসবে নাকি? আসার পথে কলের পানির সদ্ব্যবহার করেছে, বুঝলি!’
‘কী নিয়ে আলাপ করছিস রে তোরা?’ হিরু জানতে চাইল।
‘কিছু না, ভাই।’ চেপে গেল ওরা। আসলে ওরা এতক্ষণ ধরে তর্কাতর্কি করছিল—হিরু এখানে আসতে গিয়ে নিশ্চিত কাকদের লক্ষ্যে পরিণত হবে। হিরুদের বাসার সামনের রাস্তার দুপাশের গাছগাছালিতে এক দঙ্গল কাকের বসবাস। সকাল হলেই তারা প্রথমে তাদের জাতীয় সংগীত ‘কা-কা-কা’ প্র্যাকটিস করে। তারপর প্রাতঃরাশের পূর্বে সবাই মিলে বসে পেট ক্লিয়ার করতে! নিচের রাস্তা দিয়ে চলাচল করা মানুষ হয় তাদের মূল টার্গেট! ব্যাপারটা এমন—যে ঠিকঠাক মানুষের গায়ে তাদের ইয়ে মানে হাগু ফেলতে পারবে, তার দিনটা ততো বেশি ভালো যাবে। আশ্চর্যের বিষয় হলো—হিরু ও পথ দিয়েই যাতায়াত করে। কিন্তু ওর শরীরে কখনো কাকের ইয়ে পড়েছে—এমন রেকর্ড নেই। একটু আগে এখানে আসার সময় ওর চ্যালাদের কয়েকজনই কাকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কেবল, কীভাবে কীভাবে জানি হিরুটাই বেঁচে যায় বারবার!
এসব কথা ওরা হিরুকে জানাল না। ‘বিষয়টা নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ করা বাকি। দূর থেকে হিরু ভাইয়ের ওপরে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে’—এমনই চিন্তাভাবনা ওদের। হিরুও আর নাক গলাল না। তবে, চাকলাদারের পেতে রাখা বেঞ্চিতে দেহ এলালো।
‘চাকলাদার ভাইসাব, চা দাও।’ হাঁক ছাড়ল সে। চাকলাদারের চা বানানোর ফাঁকেই সে জানতে চাইল, ‘মনটা বেশ ফুরফুরে মনে হচ্ছে!’
‘বুঝলে হিরু ভাই, বাংলাদেশে আসলে বছরের বারো মাসই শীত থাকা দরকার ছিল। তাহলে সেই মৌজ করে চা বিক্রি করতে পারতাম। মাত্র মাস তিনেক শীত থাকে। তাতেই চা বিক্রি করে বাম্পার অবস্থা।’ উপস্থিত কাস্টমারদের উপেক্ষা করে তোতা চাকলাদার তার মনের কথা খুলে বলল।
‘হুমম।’ চা খেতে খেতে হিরু বলল।
‘মাঝেমধ্যে মনে হয়—কোনো শীতপ্রধান দেশে চলে যাই। বারো মাস খালি চা-ই বেচব।’
‘হুমম।’ হিরু এবারও কিছু না বলে চা খেতে লাগল। চাকলাদার অবাক। হিরু কথা বলছে না যে? তবে কি ঠাণ্ডা লেগে তার গলায় টনসিল হয়েছে? ‘আরেক কাপ চা দেবো হিরু ভাই?’ চাকলাদার জানতে চাইল।
একটু পর খালি চায়ের কাপটা রাখতে রাখত হিরু মুখ খুলল, ‘শীতে চা খুব তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তারমাঝে যদি তোমার সাথে খাজুরে আলাপ করতে গিয়ে চায়ের অর্ধেকটাই ঠাণ্ডা বানিয়ে ফেলি, তাহলে আর কীভাবে চলে! কী যেন বলছিলে তুমি? বিদেশ গিয়ে চা বিক্রি করবে? হাহা, যাও না। দিনে দশ কাপ চাও বিক্রি করতে পারবে কি না সন্দেহ!’
‘কেন?’ চাকলাদারের মুখ শুকিয়ে আমসি।
‘ওরা বেশিরভাগই নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ করে। নিজেরা চা বানিয়ে খায়। চায়ের থেকেও বেশি খায় কফি। আসলে ওরা তো এশিয়া মহাদেশ থেকেই সিংহভাগ চা আমদানি করে। ওদেশে দিয়ে তুমি যুত করতে পাবে না। তারচে যদি নির্বাচনটা এই অসময়ে না হতো, তাহলে তোমার জন্য লাভের হতো।’
‘কীভাবে?’ হিরুর চ্যালারাও চেপে ধরল ওকে। ‘ডিসেম্বরে স্কুল-কলেজ বন্ধ। তা ছাড়া এখন শীতকাল। সময়টাও মিটিং-মিছিলের জন্য পারফেক্ট। অসময় বলছ কেন?’
‘অসময় আমাদের জন্য নয়। অসময় চাকলাদার ভাইসাবের চা বিক্রির ক্ষেত্রে। এমনিতেই তো শীতকালে তার চা বিক্রির ধুম পড়ে। অন্যদিকে, নির্বাচনের মৌসুমেও একই কেস। আর দুইটা বিষয়ই এখন একই সাথে ঘটছে। ফলে এক আর এক মিলে দুই হচ্ছে না, এক-ই থেকে যাচ্ছে!’
‘তা বটে।’ অন্যরা সায় দিলো।
‘তবে, আমাদের জন্য লাভ হয়েছে। শীতকালে এমনিতেই কয়েককাপ করে চা খেতে হয়। এখন যদি বিলগুলো এই প্রার্থী ওই প্রার্থীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় তো আর কী চাই!’
‘এ কারণেই কি তুমি এবার প্রার্থী হওনি, হিরু ভাই? অন্যরা তোমার ঘাড়ে চায়ের বিল চাপাবে বলে!’
‘প্রার্থী হলে একটা চায়ের দোকানও খুলে বসতাম রে!’ কথাটা শুনে চাকলাদারের মুখখানা হলো দেখার মতো! একেবারে পাতিলের তলা। হিরু বলে চলল, ‘আসলে আমার তো এখনো বয়সই হয়নি!’
‘১৮ বছর হয়নি তোমার? ভোটার তো সেই কবেই হলে।’
‘ভোটার হবার বয়সের কথা কে বলছে!’
‘তাহলে? নির্বাচনে প্রার্থী হতে যে ন্যূনতম ২৫ বছর লাগে, তুমি বলতে চাইছ—সেই বয়স হয়নি তোমার? কিন্তু সেদিনই না বললে, সরকারি চাকরির বয়স খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে রে...’
‘আমি প্রার্থী হবার বয়সের কথাও বলিনি...’
‘তাহলে?’
‘তোরা কি জানিস না—এদেশে রাষ্ট্রপতি হতে ন্যূনতম কত বছর লাগে? ৩৫ বছর। আমার তা হয়েছে নাকি?’
‘তুমি রাষ্ট্রপতি হতে চাও?’ সবাই অবাক।
‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। স্বপ্নটাকে বড় করেই দেখা উচিত।’ দার্শনিক বাক্য ছাড়ল হিরু।
‘হুমম।’ উপস্থিত সবাই বাকরুদ্ধ। বিস্ময়ে কারোর মুখেই কোনো রা নেই। একেবারে পীনপতন নীরবতা। তখনই কয়েকটি কাক ‘কা-কা’ আওয়াজ করে উঠল।
‘ইদানীং কাকগুলো যা পাজি হয়েছে না!’ অনেকক্ষণবাদে তোতা চাকলাদার মুখ খুলল। ‘আগে তো মানুষ দেখলে দূরে দূরে থাকত। ঢিল ছোঁড়ার ডামি করলে দৌড়ে থুড়ি উড়ে পালাত। এখন একেবারে মানুষের নাকের ডগায় বসতে চাইছে।’
‘মানুষ এখন অন্যের ব্যাপারে এত বেশি নাক গলাচ্ছে যে তাদের নাক গলে গলে আকারে ইয়া বড় হয়ে যাচ্ছে। আর কাকেরাও ভাবছে, গছের মগডালে তো রোজই বসি। দু-এক বেলা নাহয় ‘নাকডালে’ই বসলাম!’
হিরুর কথা শুনে উপস্থিত সবাই-ই হেসে উঠল।
‘তবে যাই বলো না কেন হিরু ভাই, কাকদের এই নির্লজ্জ বেহায়াপনা মেনে নেওয়া যায় না।’ হিরু আসামাত্রই যারা ওর পোশাক-আশাক পরীক্ষা করে দেখছিল, তাদের একজন বলল।
হিরু বলল, ‘আর ক’দিন পরে কাকেরা কিন্তু আমাদের জাতীয় পাখি হবার দাবি তুলবে। আসলে অনেককাল তো ওরা দূরে দূরেই থেকেছে, এখন গৃহপালিত প্রাণী হতে চাইছে!’
‘মশকরা করো না তো হিরু ভাই। এই যে ওরা পাল্লা দিয়ে মানুষের গায়ে হাগু করে, এর একটা বিহীত করা দরকার। তোমার গায়ে যদি কখনো পড়ত, তাহলে বুঝতে কেমনটা লাগে...’
হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘প্রত্যেকটা প্রাণীর সাথেই মিশতে হয়। তাদের মনের ভাব জানতে হয়। তাহলেই তাদের সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া সম্ভব।’
‘তুমি কাকদের সাথেও মিশেছ নাকি?’
‘হুমম। বলতে পারিস, ওদের সাথে এখন আমার হেভভি খাতির।’
‘তা কী পেলে তোমার এই কাক গবেষণায়?’
‘গবেষণা বলছিস কেন রে...। আমি ওদের নিয়ে গবেষণা করিনি কখনো। গবেষণা করে তো এই দেশের রম্য লেখকেরা!’
‘কীভাবে?’
‘তারা বলে—এই দেশে কবি আর পাগলের সংখ্যা নাকি কাকের চেয়ে বেশি!’
‘হতেই পারে। কবি আর পাগলের কি অভাব আছে দেশে? কাক আর কয়টা? যা আছে তার সবই থাকে বোধহয় তোমাদের বাসার সামনের ওই রাস্তাটাতেই, আমরা যেটার নাম দিয়েছি—ক্রো রোড!’
‘ক্রো রোড! হাহা! নাম একখান দিয়েছিস বটে!’ হিরু একটু হেসে বলল, ‘শুধু রাস্তা না, পারলে ওদের জন্য গ্রাম, শহর, এমনকি বিভাগেরও নামকরণ কর! দেশে নতুন নতুন কত বিভাগই না হচ্ছে এখন!’
‘কী যে বলো না তুমি...’
‘তোরা ভাবছিস আমি বুঝি তোদের সাথে ঠাট্টা করছি?’ হিরু সিরিয়াস ঢঙে প্রশ্নটা করল।
‘ঠাট্টাই তো করছ!’ অন্যরা মনে মনে এই কথা বললেও কেউ মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলল না। চুপ করে রইল।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
