হাওরের ধানে চিটা, খোরাকি নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় কৃষক  

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:২৫

বৈশাখ শুরু হতে আর মাত্র কিছুদিন বাকি। হাওরের মানুষের আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ বৈশাখ মাসকে ঘিরেই। এ অঞ্চলে বৈশাখ মানেই বোরো ধান গোলায় তোলার স্বপ্ন। ফসলটি এই অঞ্চলের মানুষের সারা বছরের খোরাকি। ধান ঘরে উঠলে কৃষকের ইদ আনন্দ আর না উঠলে শুরু হয় কষ্টের দিন। 

দেখার হাওরে ব্রি-২৮ ধানে চিটা দেখাচ্ছেন কৃষক। ছবি: ইত্তেফাক

প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা শঙ্কা অতিক্রম করে এবার বৈশাখে ধান কাটার আনন্দ ও ইদ আনন্দ একসঙ্গে হবে। এমন বুকভরা আশায় বৃহত্তর সিলেটের কৃষকরা অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে। এরই মধ্যে সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। আগামী সপ্তাকে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে।  

কৃষি কর্মকর্তরা জানান, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। আবহওয়া ঠিক থাকলে বাম্পার ফলন হবে। চলতি মৌসুমে সিলেট বিভাগের ৪ জেলায় ৪ লাখ ৯০ হাজার ৫৭৭ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এতে ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

এভাবে হাওরের ধানের শিষে চিটা দেখা যাচ্ছে। ছবি: ইত্তেফাক

এদিকে সিলেটের হাওর অঞ্চলের বেশ কিছু জমিতে এবার ব্রি-২৮ চাষ করে বিপাকে চাষিরা। আগাম ফলনের আশায় চাষ করে এখন লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। অধিকাংশই ধানের জমিতে চিটা, ফলে বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে ‘খোরাকি’ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন। এবার সিলেট অঞ্চলের ৪ জেলায় ৮৫ হাজার ৮৮ হেক্টর জমিতে ব্রি-২৮ রোপন করা হয়। কিন্তু এটি চাষ করে কৃষকরা এখন দুশ্চিন্তায়। 
 
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের কৃষক মো. কাউসার ভূইয়া বলেন, ৩০ শতাংশ জমি ২৫ হাজার টাকায় বর্গা নিয়ে ব্রি-২৮ ধান করেছেন। বীজ বপন, রোপন, সার ও শ্রমিক বাবদ খরচসহ এ পর্যন্ত মোট ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন জমিতে ধান সব চিটা। এতে বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে ‘খোরাকি’ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন। 

দেখার হাওরে নিজের ক্ষেতের চিটা দেখাচ্ছেন কৃষক। ছবি: ইত্তেফাক

জানিগাঁওয়ের কৃষক মো. শামছুদ্দিন বলেন, ৫ কেয়ার জমি আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ব্রি-২৮ ধান অর্ধেক। এতো কষ্টের আবাদ ব্রি-২৮ ধান জলে গেছে। কেউ বলে নি এই ধান আবাদ না করতে। 

হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, গত বছরও ব্রি- ২৮ ধানে চিটা হয়েছে। এই ধান আবাদ না করতে প্রচার-প্রচারণা করার কথা থাকলেও কৃষি অফিস তেমন কোনো কিছু করেনি। ফলে কৃষকরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

দেখার হাওরে ব্রি-২৮ ধানে চিটা দেখাচ্ছেন কৃষক। ছবি: ইত্তেফাক

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. শওকত ওসমান মজুমদার বলেন, ব্রি-২৮সহ  কিছু ধানের মধ্যে চিটা দেখা গেছে। এটি নিরসনে মৌসুমের প্রথম থেকেই কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। বালাইনাশক প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করেছি। ব্রি-২৮ ও ব্রি- ২৯ চাষাবাদ না করতে কৃষকদের বিভিন্ন উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভায় নিরুৎসাহিত করা হয়।  ব্রি- ২৮ ধানের পরিবর্তে ব্রি-৮৮, ব্রি-৯৬, ব্রি-১০০ ও ব্রি-২৯ ধানের পরিবর্তে ব্রি- ৮৯, ব্রি-৯২, বিনা-২৪, বিনা-২৫ সহ উচ্চ ফলনশীল ধান আবাদ করতে কৃষকদের বলা হয়েছে। 

সুনামগঞ্জ বিএডিসি অফিসের বীজ বিপণন শাখার উপ-সহকারী পরিচালক মো. আমিনুর রহমান বলেন, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ খুবই জনপ্রিয় জাতের ধান। হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। এই পরিবর্তনের জন্য সময় লাগবে।

দেখার হাওরে নিজের ক্ষেতের চিটা দেখাচ্ছেন কৃষক। ছবি: ইত্তেফাক

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মোশারফ হোসেন বলেন, এই জাতটি এখনো আবহওয়া উপযোগী নয়। তাই এটি চাষ না করতে বলা হচ্ছে। তাছাড়া মৌসুমের শুরুতে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না পাওয়ায় জাতটির উৎপাদনে সমস্যার সৃষ্টি হবে। তবে ব্রি- ৮৮, ব্রি-৯৬, ব্রি-১০০ ও ব্রি- ৮৯, ব্রি-৯২, বিনা-২৪, বিনা-২৫ সহ উচ্চ ফলনশীল ধানের ফলন ভালো হয়েছে। 

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বিজ্ঞানীরা ১৯৯৪ সালে উদ্ভাবন হয় বোরো মৌসুমে চাষ উপযোগী ব্রি-ধান ২৮ জাতের ধান। এর ফলে বোরো ধান উৎপাদনে আমূল পরিবর্তন আসে। এই ধানের জীবনকাল ১৩৫-১৪০ দিন, উচ্চতা ৮৫-৯০ সেন্টিমিটার এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন।

ইত্তেফাক/এবি/পিও