দেশের প্রথম রাজস্ব সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি অন্য মাত্রায় নিয়েছে। যদিও এন বি আর ও বি ও আই ভবন উদ্বোধন করা ছিল আরো একটা মাইলফলক। উনার বক্তৃতার মূল কথা ছিল উৎসাহসহ ব্যবসায়ীদের ভ্যাট প্রদান করার পদ্ধতি বের করা। সরকার ও সরকারি সংস্থা গুলো রাজস্ব আদায়ের কথা বলেন। জনগণের চিন্তা করেন বলে উনি ব্যতিক্রম। ব্যাবসায়ীদের পক্ষে প্রদানের কথা বলেছেন।
উৎসাহসহ ভ্যাট প্রদান করানোর জন্য সহজ ও প্রদানের পরিমাণ লাভজনক মনে করবেন। সেটার জন্য দরকার প্রতিটা জেলার ব্যাবসায়ীর ধরন অনুসারে ভ্যাট আইন সহজ করা ও ধরন অনুসারে লাভজনক উপায় বের করে দেওয়া। যাতে ধারণা তৈরি হয় বর্তমান ভ্যাট ভীতি ও হয়রানির চেয়ে ঐ পরিমাণ ভ্যাট প্রদান সম্মানজনক। এই সিস্টেম তৈরিতে সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনকে মূল ভূমিকায় থাকতে হবে। শুরু করতে হবে খুব দ্রুত, না হলে বড় ধরনের ব্যাবসায়িক দায় তৈরি হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যা কাম্য হতে পারে না।
বর্তমান ভ্যাট আইন ও ব্যাবসায়ীর অবস্থা নিয়ে একটা গল্প মনে হলো, ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ বিচারক এর আদালতে বাঙালি আসামি ঘটনার বর্ণনা ‘হয়েন দ্যা সূর্য ডুবু ডুবু, সলিমুদ্দিন টেক এ মোটা লাঠি বারি অন ম্যাই হেড। জাম্প দ্যা বাঁশের বেরা, ফল ইনটু পটলের খ্যাত।’ বিচারক জানতে চাইলেন হোয়াট ইজ বাঁশের বেরা? আসামির উত্তর ইট ইজ ব্বাম্বু বেরে খাড়া খাড়া উইথ তারকাঁটা। বিচারক বললেন হোয়াট ইজ তারকাঁটা? আসামি বলল, ইট ইজ মেড অব আয়রন অ্যান্ড মাথার উপর থাক কাটা। গল্পের ন্যায় আমাদের মূল সমস্যা বোঝা ও বোঝানোর। সে জায়গা থেকে বের হতে না পারলে প্রতিদিন কোর্ট মুলতবি করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
গল্পের অবস্থা থেকে বের হতে হলে ভ্যাট আইনের ভাষা সেভাবে হতে হবে, যেভাবে সব শ্রেণির ব্যবসায়ীরা বুঝবেন। প্রশ্ন হলো, আইনের ভাষা কি সবার বোঝার দরকার আছে? উত্তর: অন্য আইন হলে দরকার ছিল না ভ্যাট আইনে দরকার আছে। এদেশের ব্যবসায়ীরা একক মেধা ও পরিশ্রম করে বর্তমান অবস্থায় এসেছেন। উনারা সকল অবস্থায় কিছু ভুল করলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক ছিল বলে অন্যের বলা কথা মানতে রাজি নয়। উনারা ধারণা পোষণ করেন যে সাথে মানুষগুলো সঠিক ভাবে কাজ করতে পারবেন না তাই সব নিজে আগে বুঝতে চাইবেন। আর সেটা করতেই ভ্যাট আইনের ভাষা ও প্রদানের সিস্টেম উনার বোঝার মতো করে করতে হবে। সেটা করতে না পারলে উৎসাহসহ ভ্যাট প্রদানের বিষয়টা উনাদের কাছে জুলুম করে আদায় করা হচ্ছে সেটাতে থেকে যাবে।
সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি, ভ্যাট আইনের সেক্টর অনুসারে প্রয়োজনীয় সকল কিছু আলাদা করে গাইড লাইন আকারে বই প্রকাশ করেছি। রপ্তানি বাণিজ্যে এর ভ্যাট গাইড ফর এক্সপোর্ট বিজনেস, কেস ষ্টাডি নিয়ে রাজস্ব আইন ও ডাক্তার কদম আলী ডিগ্রি নাই। জুলাই ২০২৩ আরো তিনটা সেক্টর ধরে বই বাজারে আসবে ইনশাল্লাহ। সেগুলো আসার পরও আরো গভীরে যাওয়ার পরিকল্পনা হল জেলা ভিত্তিক ব্যাবসায়ের ধরন অনুসারে লাভজনক ভ্যাট প্রদানে গাইড লাইন তৈরি করা। সেটা করতে দরকার সরকার ও এফবিসিসিআই এর সহযোগিতা।
যেহেতু আজের লেখা বহুদিন পর গল্প দিয়ে শুরু করেছি তাই শেষ করছি আর একটা গল্প দিয়ে। এক রাজ্যের রাজার পরিষদ বর্গ রাজাকে বোঝাতেন এমন সিস্টেম বের করতে হবে যাতে প্রজারা নিজের ভালো বুঝতে না পারে। একদিন রাজা স্বপ্ন দেখলেন যে উনার পুকুরে যে গোসল করবে সে পাগল হয়ে যাবে। পরিষদ বর্গের আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত হলো সব প্রজাদের দাওয়াত দিয়ে পুকুরে গোসল করার পর খাবার দেওয়া হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। দিন তারিখ ঠিক করে সব প্রজাদের আসতে বলা হলো এবং নিয়ম অনুসারে সেই পুকুরে গোসলের পর সবাইকে দুপুরের খাবার খাওয়ানো হলো। শুধু বাকি রইলো রাজা ও পরিষদ বর্গ। যথা নিয়মে দাওয়াত খেয়ে সবাই চলে গেলেন। এর প্রতিফলন শুরু হলো পরের দিন থেকে। রাজার লোকজন যেখানে গিয়ে যে কার্যক্রম করতে চান প্রজারা বলা শুরু করলেন রাজার লোকজন পাগল হয়ে গেছে। প্রজারা সবাই পাগল হওয়ার ফলে ওরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে সকলে সব বুঝতে পারলেও, রাজার কর্মকর্তা তো পাগল নয়। তিনি একা সঠিক বলেও বাকিরা তো উল্টো বুঝলেও একভাবে বুঝছে। এ ভাবে তৈরি হলো বিশাল প্রশাসনিক জটিলতা এবং সেটা থেকে বের হতে রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন উনিসহ বাকি সবাই ওই পুকুরে গোসল করে ফেলবেন। এরপর সবাই এক হয়ে যাওয়ায় সমস্যা থাকলো না।
গল্পের মত মূসক আইন ব্যবহার উপযোগী ও উৎসাহ নিয়ে ভ্যাট প্রদানে আসতে হলে ব্যবসায়ীদের আপনার বোঝার জায়গায় আনতে হবে, না হয় আপনাকে উনার অবস্থানে নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহ নিয়ে ভ্যাট প্রদান বলা কথা বাস্তবায়নে প্রকল্প তৈরি করে অবুঝদের বোঝানোর ভাষা। যেটার তাগাদা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মানুষের কাছাকাছি যেতে না পারলে জটিলতা দূর হবে না। বাস্তবায়ন হবে না উৎসাহসহ ভ্যাট প্রদান পদ্ধতি। উন্নয়নে বাংলাদেশ ও রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে ভ্যাট প্রদানের ব্যাবহারিক দিক তৈরি করতে সহযোগিতা দরকার সরকার ও সকল স্তরের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর।
লেখকঃ ভ্যাট বিশেষজ্ঞ
