ইনফরমেশন বা তথ্য মানুষকে পরিবর্তন করতে সহায়তা করে। যতো বেশি তথ্য বা জ্ঞান মাথায় ধারণ করা যাবে, মানুষ ততো বেশি সমৃদ্ধ হয়ে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হবে, অবশ্য সব তথ্যই কিন্তু জ্ঞান নয়। জ্ঞান হচ্ছে সেসব তথ্যের সমষ্টি, যা মনকে সমৃদ্ধ করে। বাংলাদেশকে প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্যজনিত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করার জন্য কর্মক্ষম জনগোষ্টিকে নতুন উদ্দীপনায় ডিজিটাল জ্ঞানভিত্তিক তথ্যে সমৃদ্ধ হতেই হবে। আজকের বাংলাদেশের সফলতা কম নয়। এই সফলতায় উদ্বেলিত না হয়ে, বরং সীমাবদ্ধতায় মনোযোগ দেওয়ায় প্রয়োজন। এভাবে এগিয়ে নিতে হবে নিজেকে, সমাজকে, সর্বোপরি দেশকে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সামাজিক, রাজনৈতিক, আর্থিক ও রাষ্ট্রিয় উন্নয়নের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে সর্বপ্রথম গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের ধারনার মতো যার যার স্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের মধ্যে এই বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরির ঘোষণা করেছেন। তিনি আরো বলেছেন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার মূল চাবিকাঠি হবে ডিজিটাল সংযোগ । বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মুল্যবোধ সম্পন্ন তরুণ জনগোষ্টি। কারণ তারাই স্মার্ট বাংলাদেশের কর্মক্ষম স্মার্ট নাগরিক হবে । এই স্মার্ট নাগরিক এর আওতায় প্রাইমারি, মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সব ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির প্রয়োজন। এদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতর মূল্যবোধ সম্পন্ন মনমানসিকতা তৈরির লক্ষ্য রেখেই এগোনো প্রয়োজন। আজকাল বেশিরভাগ জনগনের মধ্যে মূল্যবোধের মাত্রা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে যা ভবিষ্যতের উন্নত সমৃদ্ধ দেশ বিনির্মাণে হুমকি স্বরুপ। যাদের বয়স ৪২ বছর অতিক্রম করেছে তারা কর্ম ক্ষমতার আওতায় থাকছেন না, যেহেতু তাদের বয়স ২০৪১ সালে ৬০বছর পূর্ণ হবে। সুতরাং ৪২ বছর এর নিচের বয়সের তরুণ জনগোষ্টিই এই উন্নত সমৃদ্ধদেশ তথা স্মার্ট বাংলাদেশের নাগরিকের মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার মুখ্য জনগোষ্টী, কেননা প্রবীনদের চেয়ে তারাই উন্নততর সুবিধা ভোগ করার সুযোগ পাবে।
প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে, স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরিতে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। সেগুলো হলো স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, স্মার্ট সোসাইটি। স্মার্ট সিটিজেন মানে সাধারন জনগণ, যারা এখন ডিজিটাল সিটিজেন হিসেবে দক্ষতা অর্জন করেছে তারাই ২০৪১ সালে স্মার্ট সিটিজেন এ পরিণত হবে সবার আগে। স্মার্ট ইকোনমি ও স্মার্ট গভর্ণমেণ্ট এই দুই বিষয় তৈরিতে বেশিরভাগ দায় সরকার ও সরকারি সংস্থার। আর স্মার্ট সোসাইটি তৈরিতে অবশ্যই তিনটি বিষয় থাকলে আপনা আপনি স্মার্ট সোসাইটি তৈরি হয়ে যাবে এই তিন ক্ষেত্রের সমন্বয়ের মাধ্যমে। সাধারণ জনগণ সরকারি উদ্যোগ এর পাশাপাশি ব্যাক্তিগত ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশপ্রেম চেতনায় এগিয়ে স্ব স্ব দক্ষতার ক্ষমতা অর্জনই স্মার্ট সিটিজেন এ পরিণত হওয়ার উপায় বলে মনে হয়।
সাধারন জনগণ এর জীবন উন্নত সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে বর্তমানে আন্তরিকতা, নৈতিকতা, জনগনের আত্মনিয়ন্ত্রণ, সাম্যতা, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ইত্যাদি মূল্যবোধের দিকে রেখে আমাদের অন্তত প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, সরকার ইতিমধ্যে নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্য ও মেধাকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তনের বাস্তবায়ন এই বছর থেকেই পরীক্ষামূলক ভাবে শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। নতুন শিক্ষাক্রম ১ জানুয়ারি ২০২৩ থেকে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে ২০২৪ সাল থেকে বাকি শ্রেণিগুলোতে চালু করা হয়েছে বলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড(এনসিটিবি) এর রুপরেখায় ঠিক করা হয়েছে। এখন এই নতুন পরিবর্তিত শিখন ও মূল্যায়ন সমন্বিত শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদেরকে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও উচ্চতর মুল্যবোধ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
মূলত এই পরিবর্তনের মাধ্যমে যারা নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে সক্ষম হবে তারাই হবে স্মার্ট বাংলাদেশের তরুণ। এই স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানে কবি নজরুলের চিন্তা চেতনা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি তাঁর প্রবন্ধের বর্ণিত লাইনে বলেছেন, ‘এমনও নবীন আছেন যাদের উর্দির তলে পোড় খাওয়া কঙ্কালসার অস্তিত্ব , আবার এমনও প্রবীণ আছেন যাদের বার্ধ্যকের জীর্ণাবরনের তলে মেঘলুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন। বয়সে তরুণ হলেও যারা পুরাতনকে, মিথ্যাকে, অশুভ শক্তিকে, কায়েম হয়ে থাকা স্থিত অবস্থাকে আঁকড়ে ধরে ধর্ম ও সংস্কৃতির দোহাই দেয়, পরিবর্তনকে স্বাগত জানান না, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেন না, তারাই প্রবীণ, তারাই বৃদ্ধ। যারা সৃষ্টিশীল তারা সমাজের অভিনব যাত্রার চলার ছন্দে ছন্দ মিলিয়ে চলতে পারেন, নতুন সূর্যের উদয় দেখে যারা নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বার বন্ধ করে আছে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, অতিজ্ঞানের অগ্নিমান্দ্যে অহংকার বশত;গম্ভীর হয়ে থাকা মানুষদেরকে ঘা মেরে ঝাঁকুনি দেন, সমাজকে সরল পথে চালিত করে তারাই নবীন ও আসল তরুণ। কবি সুকান্তের কথার মতো, নবীন মানে তরুণ, আর তারুণ্য মানে সাহস, সেই সাহসের প্রেরণা যোগানোই তরুণের কাজ। সব রকমের যুগপোযোগী পরিবর্তনের ইচ্ছা এবং শক্তি যাদের হাতে থাকে তারাই নবীন। আজকের উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সেইসব নবীনদেরকেই প্রয়োজন। সঠিক সময়ে সঠিক কাজ শিখে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া তরুণদেরকেই আজকের বাংলাদেশ এর পতাকাতলে বেশি প্রয়োজন।
একথা ঠিক স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরিতে তরুণদেরকে অগ্রগন্য করে হিসেব করলেও সেই তরুণদেরকে যারা পরিপালন, পরিতোষন ও প্রস্তুতকরনের জন্য মা, বাবা, পরিবেশ অনুযায়ী অভিভাবক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সকলের সহযোগী মনোভাব এর মিথস্ক্রিয়াই তৈরি হবে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা তথা প্রধানমন্ত্রীর উন্নত সমৃদ্ধ দেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, হুলাইন ছালেহ-নূর ডিগ্রি কলেজ
