শ্রমজীবী শিশুদের স্বপ্ন থেকে যায় অধরাই

আপডেট : ২১ জুন ২০১৯, ২২:০৪

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

তিনবেলা পেট পুরে খেয়ে বেঁচে থাকা আর ছোট ছোট কিছু স্বপ্ন নিয়ে শ্রমজীবী শিশুদের জীবন। তবে কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কম মজুরিতে পিষ্ট হয় ওদের জীবনের স্বপ্নগুলো। তাদের স্বপ্ন কখনো পূরণ হয়, আবার কখনো বা থেকে যায় অধরাই। কথা হয় শ্রমজীবী শিশু রুকসানা, জয়নাল ও রাসেলের সঙ্গে।  

 ‘আফা বেলী ফুলের মালা নেবেন? পাঁচটা ২০ টাকা আফা। লন আফা, দুগা ভাত খামু।’ মানিকমিয়া এভিনিউ-এর সিগন্যালে গাড়ি দাঁড়াতেই এভাবেই হাক দিতে থাকে ১২ বছরের রুকসানা। কেউ তাকে তাড়িয়ে দেয়, কেউবা মায়া করে ১০টা টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, যাও মালা লাগবে না। অনেকে আবার বলেন, আমাদের বাসায় যাবি, কাজ করবি? তিনবেলা খাবার পাবি। রোকসানার স্বপ্ন তার মালাগুলো যেন সব বিক্রি হয়ে যায়।

জয়নাল সড়কে পানি বিক্রির কাজ করে। সারাদিন পানির বোতল কখনো মাথায় কখনো ঘাড়ে করে বিক্রি করে। এতে তার বেশ কষ্ট হয়। তপ্ত রোদে তাকে হকারি করতে হয়। কেননা, রোদের তেজ বাড়লেই কেবল পথচারী কিংবা যাত্রীদের কাছে পানির চাহিদা বাড়ে। সড়কে সারাদিন হকারি করে খুব খিদে পায় ছোট্ট জয়নালের। দশ বছর বয়সি জয়নালের বাড়ি ময়মনসিংহে। তবে সে তার গ্রামের নাম বলতে পারে না। অনেক ছোটবেলায় সে ঢাকা চলে এসেছে। তখন থেকে খালার সঙ্গে থাকে। ভালো বেচা-বিক্রি না হলে খালা তাকে ভালো খেতে দেয় না। জয়নালের স্বপ্ন জানতে চাইলে সে বলে, ‘মাংস দিয়া পেট ভরে তিনবেলা ভাত খাইতে চাই।’

এই প্রেক্ষাপটে ৩৮টি কাজকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকা তৈরি করে। সরকারের নতুন সংশোধিত শ্রম আইন-২০১৮ তে বলা হয়েছে, ১৪-১৮ বছর বয়সি কোনো শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন। তবে শিশুদের কল্যাণে সরকার ইতোমধ্যে ভালো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মাত্র ৬ শতাংশ শিশুশ্রমিক কাজ করছে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে। মোট ৪৭ ধরনের কাজ করে শিশুশ্রমিক। যে কাজের অধিকাংশই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুছ শহিদ মাহমুদ বলেন, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন এবং ২০২৫ সালের মধ্যে সকল ধরনের শিশুশ্রম মুক্ত হবে বাংলাদেশ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের এই ঘোষণা থাকলেও, তা অর্জন করতে হলে অনতিবিলম্বে আমাদের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা হালনাগাদ করতে হবে। নইলে শিশুশ্রম নিরসন করা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তিনি বলেন, সরকারি হিসেবে বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত ১২ লাখ শিশু। এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশে শিশু শ্রমিকের ৯৪ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। যার বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আছে। আর শ্রমজীবী শিশুদের কেবল শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনলেই হবে না। তাদের পুনর্বাসনে ২৮৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রকল্পের অগ্রগতি আমরা জানি না।