গভীর সমুদ্রবন্দরের আগমনী বার্তা

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৩, ০৬:৩০

সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা কিংবা ভারতের মতো গভীর সমুদ্রবন্দর নেই বাংলাদেশে— স্বাধীনতার পর এমন দীর্ঘ আক্ষেপ ছিল আমাদের। এই দীর্ঘ সময়ে কম চেষ্টা হয়নি। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে হবে করেও যেন ধরা দিচ্ছিল না। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর এই দীর্ঘ আক্ষেপ কিংবা অপেক্ষা যেন ঘুচতে চলেছে। মাতারবাড়ীতে চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন সমুদ্রবন্দরের টার্মিনালের আড়ালে কার্যত গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে তা অনেকেরই জানা। বন্দরের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দৃশ্যমান হবে এই টার্মিনাল। তবে তার আগে মঙ্গলবার মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে বিশালাকার জাহাজ ভেড়ানোর মাধ্যমে সেই সমুদ্রবন্দরের আগমনী বার্তা জানান দিল।

গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো গভীর চ্যানেল ও ব্রেকওয়াটার নির্মাণ। মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আনার জন্য প্রায় ১৪ কিলোমিটার লম্বা কৃত্রিম চ্যানেল তৈরি করা হয়েছে অনেক আগেই। চ্যানেলে যাতে ঢেউ না থাকে, সে জন্য ব্রেকওয়াটার নির্মাণও হয়ে গেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জাম আনার জন্য ২০২০ সাল থেকে ছোট ছোট জাহাজ ভেড়ানো হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে। এসব জাহাজ ভেড়ানোর মাধ্যমে কার্যত চ্যানেলে প্রতিবন্ধকতা দূর করা হয়েছে। অপেক্ষা ছিল, কখন বড় জাহাজ ভেড়ানো হবে।  মঙ্গলবার কয়লা নিয়ে আসা যে বড় জাহাজটি ভেড়ানো হয়েছে, তা লম্বায় ২২৯ মিটার। আবার জাহাজের ড্রাফট সাড়ে ১২ মিটার। ৮০ হাজার টন পণ্য পরিবহনক্ষমতার জাহাজটিতে ছিল ৬৩ হাজার টন কয়লা। এত বড় জাহাজ বাংলাদেশের আর কোনো বন্দর বা জেটিতে ভেড়ানোর সক্ষমতা নেই। এই চ্যানেল ব্যবহার করে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানো হবে।

এত দিন এত বড় জাহাজের পণ্য খালাস করতে হতো সাগরে নোঙর করে। প্রথমে লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হতো। এরপর লাইটার জাহাজ গন্তব্যে নিয়ে পণ্য খালাস করতে হতো। এখন প্রথম পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পণ্য আনা হলেও বন্দরের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পর বাণিজ্যিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হবে। যে কারো এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে বাধা থাকবে না। 

আবার কনটেইনার জাহাজ এখন শুধু চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে বার্থিংয়ের সুবিধা রয়েছে। পায়রা বন্দরেও কনটেইনার টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে। তবে সব কটি বন্দরের ফিডার জাহাজ বা ছোট আকারের কনটেইনারবাহী জাহাজ বার্থিং করা যায়। এখন মূলত সর্বোচ্চ ২ হাজার টিইইউএস কনটেইনার নিয়ে জাহাজ আসছে দেশে।

মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের দুয়ার খুলে যায় মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণকে ঘিরে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আনা-নেওয়ার জন্য বন্দরসুবিধা তৈরি অপরিহার্য। কারণ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন ১০ হাজার টন কয়লা পোড়াতে হবে। ছোট আকারের জাহাজ দিয়ে কয়লা এনে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে যায়। সেজন্যই গভীর চ্যানেল তৈরির দরকার হয়। শুরুতে একটি বাণিজ্যিক বন্দর নির্মাণের কথাও আলোচনায় আসে। ভূরাজনৈতিক কারণে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ না হওয়ায় বাণিজ্যিক বন্দরটিকে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়। তার আগেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জাহাজ ভেড়ানোর জন্য গভীর চ্যানেল তৈরি করা হয়। বন্দরের মাতারবাড়ী পোর্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে হাতে নেওয়া হয় দুটি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ। এই দুই টার্মিনালে একসঙ্গে একটি সাধারণ পণ্যবাহী ও একটি কনটেইনার টার্মিনালে বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) ভিড়তে পারবে। প্রথম ধাপে বন্দর ও পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক নির্মাণসহ খরচ ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। প্রথম ধাপের কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ২০২৬ সাল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব কাজ দ্রুত এগোচ্ছে।

মাতারবাড়ীতে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। জাপানের  উন্নয়ন সংস্থা জাইকা দিচ্ছে ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। বাকি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুমিতমো করপোরেশন, তোশিবা করপোরেশন ও আইএসআইয়ের নেতৃত্বে হচ্ছে এই নির্মাণযজ্ঞ। সেখানে তাপবিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এ দুটি প্রকল্প মিলে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে।

মাতারবাড়ীর বিদ্যুত যাবে সারা দেশে। আবার মাতারবাড়ীতে টার্মিনাল নির্মাণ হলে সেখানে ৮ হাজার টিইইউএস কনটেইনার নিয়ে জাহাজ ভিড়তে পারবে। সারা দেশের ব্যবসায়ীরা এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে পারবেন। মাতারবাড়ীতে একটি জেটির যে সক্ষমতা রয়েছে, তা চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি জেটির সমান। বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা হলো, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা কিংবা মালয়েশিয়ার বন্দরের ওপর আগের মতো শতভাগ নির্ভর হতে হবে না। সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকায় সাপ্তাহিক সূচি অনুযায়ী জাহাজ চলাচল করবে। আমাদের রপ্তানি পণ্য সরাসরি মাতারবাড়ী থেকে পৌঁছে যাবে ইউরোপ-আমেরিকার কোনো বন্দরে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের খরচ কমে যাবে।

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বাড়ছে। দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন নতুন কারখানা হচ্ছে। সরকার ২০২৬ সাল নাগাদ ১০০ বিলিয়ন এবং ২০২৪ সাল নাগাদ ৮০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য তথা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে দরকার গভীর সমুদ্রবন্দর। প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে গভীর সমুদ্রবন্দর অপরিহার্য। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আবার আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য গতিশীল করতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বে টার্মিনাল নির্মাণেরও কাজ চলছে। দক্ষিণাঞ্চলে পায়রা ও মোংলা বন্দর, চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরের সম্প্রসারিত টার্মিনাল মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর টার্মিনাল ও বে টার্মিনাল হলে আগামী ৫০ বছর নতুন করে কোনো বন্দর নির্মাণ করতে হবে না।

ভবিষ্যতে মাতারবাড়ীতে ভিড়বে কনটেইনারবাহী বড় জাহাজ। সেখান থেকে দেশের অন্যান্য বন্দরে ফিডার জাহাজে আনা-নেওয়া হবে আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার। প্রতিবেশী দেশের পণ্য পরিবহনের সুযোগও বিস্তৃত হবে। আঞ্চলিক বন্দরে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে মাতারবাড়ীতে। 

সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর না হওয়ার যে আক্ষেপ ছিল, তা এখন বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে মাতারবাড়ীতে। বন্দরের টার্মিনাল নির্মাণ শুরুর পর হয়তো আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হবে গভীর সমুদ্রবন্দরের টার্মিনালের। তবে তার আগে বিশালাকার জাহাজ ভেড়ানোর মাধ্যমে নৌপথের সক্ষমতার প্রমাণ মিলল। এবার আর কোনো স্বপ্ন নয়, বাস্তবেই যেন ধরা দিচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর।

লেখক: পরিচালক, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন

 

ইত্তেফাক/এমএএম