শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

এখন দেওয়াল-লিখন কেহ পড়িতে পারেন না

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৩, ০৩:০০

উন্নয়নশীল বিশ্বে দেশগুলিতে একটি কাঠামো দাঁড় করাইবার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু যাহারা ক্ষমতায় থাকেন, তাহারা কী করেন? দিনে দিনে এমনই আবর্জনার স্তূপ তৈরি করিয়া ফেলা হয় যে, কাহাকে না কাহাকে সেই আবর্জনা পরিষ্কার করিতে আগাইয়া আসিতে হয়। তাই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করিতে নাই, যে কাউকে সকল প্রক্রিয়া উপেক্ষা করিয়া জঞ্জাল পরিষ্কার করিতে আগাইয়া আসিতে হয়। এই সকল দেশে যাহারা ক্ষমতায় থাকেন, তাহাদের মধ্যে বিরোধী দলগুলিকে খাটো করিয়া দেখিবার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ইহার ফলে ক্ষমতার একটি বলয় তৈরি হয়। এবং এই সকল দেশে যাহারা ক্ষমতায় থাকেন, তাহারা হয়তো জানেনই না যে, এই আচরণের মধ্য দিয়া তাহারা জনগণের জীবনকে কতটা দুর্বিষহ করিয়া তোলেন। আর এই দুর্বিষহ করিয়া তোলার সঙ্গে যোগ দিয়া থাকেন প্রশাসনের একধরনের সুবিধাভোগীরা, যাহাদের দেশ সম্পর্কে কোনো অনুভূতি, কোনো কমিটমেন্ট থাকে না।

উন্নয়নশীল দেশগুলি যাহারা পরিচালনা করেন, তাহাদের সবচাইতে বড় একটি দুর্বলতা হইল, তাহারা দেওয়াল লিখন পড়েন না। পূর্বে দেওয়াল লিখন হইতে মানুষের নানা মত পাওয়া যাইত। কিন্তু যিনি দেওয়াল লিখন পড়িতে বলিয়াছিলেন, তিনি এখন থাকিলে কী বলিতেন? এখন দেওয়ালের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত যাহা থাকে, তাহা হইতে জনগণের ভাষা বুঝিবার কোনো সুযোগ নাই। এই সম্পর্কে ফরাসি বিপ্লবের একটি উদাহরণ সকলের স্মরণে রাখা দরকার। ফরাসি বিপ্লবকালে জনগণ যখন জাগিয়া উঠিয়াছে, বাস্তিল দুর্গ পতনের মুখে, তখনো রাজদরবার দেওয়াল লিখন পড়িতে পারে নাই। এমনকি সাধারণ মানুষের মনোভাবের সঙ্গে তাহাদের কোনো পরিচয় ছিল না। কথিত আছে, বিপ্লবীরা যখন রাজদুয়ারের দ্বারপ্রান্তে চলিয়া আসিয়াছে, তখন রাজা ষোড়শ লুইয়ের স্ত্রী, অর্থাৎ রানি ম্যারি আঁতোয়নেতে শোরগোল শুনিতে পাইয়া রাজকর্মচারীদের নিকট জানিতে চাহেন, তাহারা শোরগোল করিতেছে কেন? কর্মচারীরা উত্তরে বলেন, মহারানি ইহারা রুটি খাইতে চাহে, কিন্তু তাহা পাইতেছে না। শুনিয়া রানি উত্তরে বলেন, উহাদেরকে কেক খাইতে বলো! ইহাও ইতিহাসে আছে যে, রানি এতটাই জাঁকজমকপূর্ণ ও বিলাসী জীবন যাপন করিতেন যে, রাজকোষ খালি হইয়া গিয়াছিল, যাহার কারণে তাহার টাইটেল হইয়াছিল ম্যাডাম ডেফিসিট।

আজও উন্নয়নশীল দেশে এই প্রবণতাই লক্ষ করা যায়। উন্নয়নশীল দেশের এই একতরফা বিষয় এবং অসহিষ্ণুতা উন্নত বিশ্বেও লক্ষ করা যাইতেছে। তাহা না হইলে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত গণতন্ত্রচর্চার দেশেও কেন নির্বাচন-পরবর্তীকালে ফলাফল না মানিয়া লইতে দেখা যায়? ১৭৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনকে তাহার সাবেক মিলিটারি সেক্রেটারি এবং কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জনাথন ট্রামবুল জুনিয়র চিঠি লিখিয়া অনুরোধ করেন তৃতীয় বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হইতে (১৯৫১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২২তম সংশোধনীর তৃতীয় দফা প্রেসিডেন্ট হওয়া রদ করা হয়)। কিন্তু ওয়াশিংটন উহাকে গোপন উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলিয়া অভিহিত করিয়া প্রত্যাখ্যান করেন। সুতরাং উন্নয়নশীল দেশ যাহারা পরিচালনা করেন, তাহাদের ইহা মনে রাখা অতি জরুরি যে, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করিতে নাই, যাহাতে সকলেই বলিবে—পরিবর্তন চাই। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতেও ইহা স্মরণে রাখা জরুরি। ইসলামে বারংবার যে কোনো বিষয়েই বাড়াবাড়ি করিতে নিষেধ করা হইয়াছে। পবিত্র কুরআন শরিফের সুরা নিসার ১৭১ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘হে আহলে কিতাব! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করিও না।’ সহি বুখারিতে উল্লেখ আছে, হজরত উমর (রা.) বলিয়াছেন, ‘তোমরা নেতৃত্ব লাভের পূর্বেই জ্ঞান হাসিল করিয়া লও।’ কিন্তু বর্তমান সময়ে ইহার অনুপস্থিতিও লক্ষ করা যায়।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন