আরেকটি গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সুদান। রাজধানী খার্তুমসহ সুদানের বিভিন্ন অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সেনাবাহিনীর ‘নিয়মিত সেনা’ ও ‘আধা-সামরিক বাহিনী’ র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের সদস্যদের মধ্যকার চলমান সংঘর্ষ ক্রমশ দানা বাঁধছে। বিভিন্ন স্থান কবজায় নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে উভয় পক্ষই। সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের প্রশ্নে যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত, তার বিষফলে পুড়ছে গোটা সুদান!
সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছেন শীর্ষ দুই জেনারেল—জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো। জেনারেল আল-বুরহান সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান এবং সে কারণে তিনিই দেশটির প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে দেশটির উপনেতা জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো কুখ্যাত আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফের কমান্ডার। হেমেডটি নামেই বেশি পরিচিত তিনি। যাহোক, মূলত কাউন্সিলের এই শীর্ষ দুই সামরিক নেতাকে ঘিরেই বিরোধের জন্ম। যদিও উভয় পক্ষ সংঘর্ষ সৃষ্টির জন্য পরস্পরকে দায়ী করে আসছে।
জেনে রাখা দরকার, সুদানে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশ পরিচালনা করছে জেনারেলদের একটি কাউন্সিল। বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে জেনারেলদের মধ্যে কালক্রমে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হতে থাকে। সর্বশেষ বিশেষ করে আধা-সামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে একীভূতকরণের বিষয় নিয়ে মতপার্থক্যের সূত্র ধরে বর্তমান সংঘাতের অবতরণিকতা, যার চূড়ান্ত রূপ ‘ঘনীভূত অস্থিরতা’।
সুদানের ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ ও অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষক দুই জেনারেলের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দায়ী করে আসছেন। তবে এই সংঘাতকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার যুক্তি রয়েছে আমার কাছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে ‘হর্ন অব আফ্রিকার রাজনৈতিক অর্থনীতি (পলিটিক্যাল ইকোনমি)’ নিয়ে জানাশোনা, গবেষণা আছে আমার। আমার ধারণা, সুদানের প্রতিদ্বন্দ্বী অভিজাতদের মধ্যকার তিন দশকের বিতর্কিত জ্বালানি রাজনীতি (এনার্জি পলিটিক্স) এমন এক পটভূমি তৈরি করে দেয়, যার পথ ধরেই মূলত আজকের সংঘর্ষ। দীর্ঘ মন্দাবস্থার পর বর্তমানে দেশটিতে যে বৃহত সংঘাত শুরু হয়েছে, তাতে করে সুদানি নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানই শুধু নিম্নমুখী হয়নি, এর ফলে দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে দেশটি।
এখন প্রশ্ন হলো, ‘জ্বালানি’ কীভাবে সুদানের সহিংসতার কারণ হয়ে উঠল? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে তাকাতে হবে বেশ খানিকটা পেছনে। অনেকের মনে থাকার কথা, একসময় জ্বালানি তেলের ছড়াছড়ি ছিল সুদানে! আফ্রিকার অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী হিসেবে বেশ দাপট ছিল দেশটির। জ্বালানি তেলের বলে সুদান ভালোই চলছিল ২০০৮ সাল পর্যন্ত। উক্ত সময়কালে দৈনিক প্রায় ৫ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করা হতো। তবে সেদিন আর নেই সুদানে! অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে দৈনিক তেল উত্তোলনের পরিমাণ অত্যন্ত কম। যেমন—গত বছর গড় দৈনিক উৎপাদন ছিল ৭০ হাজার ব্যারেলের মতো।
আমরা দেখেছি, গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসেন ওমর আল-বশির। সামরিক-ইসলামবাদী শাসক ওমরের ধারণা ছিল, জ্বালানির ওপর ভর করে সুদানে ‘একটি নতুন অর্থনীতি’ গড়ে তোলা যাবে। এমন ধারণা থেকে ক্ষমতা গ্রহণের পর চীন, ভারত ও মালয়েশিয়ার জাতীয় তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব স্থাপন করে ওমরের প্রশাসন। চলছিল বেশ ভালোই। দীর্ঘকাল ধরে ক্রমবর্ধমান এশিয়ান চাহিদার বিশাল অংশ পূরণ হতো সুদানের তেলে। এই তেল বিক্রির অর্থ ব্যয় করা হতে থাকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দেশীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার কাজে। ফলে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার বাজেট বাড়ানো হয়। প্রাতিষ্ঠানিক-অবকাঠামোগত খাতেও খরচ করা হয় কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ। নীল নদ ও এর উপনদীতে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ ও সম্প্রসারণের জন্য ঢালা হয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর সুফলও মেলে বটে। মোটা অঙ্কের বিনিয়োগের ফলে লাখ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা সম্ভবপর হয়। খাদ্যশস্য ও পশুখাদ্য উৎপাদন করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের আমদানিকারকদের জন্য। শহর-নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ আলোকিত করা হয় বৈদ্যুতিক বাতিতে। লক্ষণীয় বিষয়, সরকার শুধু জলবিদ্যুৎ বাঁধ কর্মসূচিতেই ব্যয় করে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। এর পেছনে কারণ, সরকারের বিশ্বাস ছিল—এসব বাঁধ সুদানের আধুনিক রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে একসময়। মোটকথা, সবমিলিয়ে ভালোই কাটছিল দিন। কিন্তু ছেদ পড়ে চলার গতিতে!
২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান আলাদা হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টান পড়ে সুদানের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। মজুত তেলের তিন-চতুর্থাংশ হারায় সুদান তথা তেলের বড় অংশ চলে যায় দক্ষিণ সুদানের ঘরে। এর ফলে স্বভাবতই ক্রমাগত ভেস্তে যেতে শুরু করে সুদানের বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রযাত্রা। সেচ-কৃষি রূপান্তরের যে স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের যাত্রা শুরু করেছিল ওমরের সরকার, তা একের পর এক মুখ থুবড়ে পড়া শুরু করে। সরকারের রাজস্ব আয় কমতে থাকে ব্যাপকভাবে। আন্তর্জাতিক ব্যয় সক্ষমতা (ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট ক্যাপাসিটি) নিচের দিকে নামতে থাকে ক্রমবর্ধমানভাবে। অর্থনীতি সংকুচিত হয় ১০ শতাংশের মতো। জলবিদ্যুৎ বাঁধগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তা থেকে আশানুরূপ বিদ্যুৎ উৎপাদিত না হওয়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সুদান। অর্থাৎ, সুদানে নেমে আসতে শুরু করে ‘ঘোর অন্ধকার’!
অর্থনৈতিক সংকটের গভীরে নিমজ্জিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাসনব্যবস্থা নড়বড়ে হতে থাকে। স্বভাবতই এর আঁচ গিয়ে লাগে দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর গায়ে। স্ব স্ব অবস্থান ধরে রাখার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাণিজ্যিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তারা। মাংস প্রক্রিয়াকরণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সোনা চোরাচালানসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের নাটাই চলে যায় জেনারেলদের হাতে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে গণবিক্ষোভ, গণবিদ্রোহ।
জ্বালানি, খাদ্য ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তথা অর্থনৈতিক সংকটকে সামনে দাঁড় করিয়ে গণবিদ্রোহকে উসকে দেওয়া হয়। পতন ঘটে সরকারের। উৎখাত করা হয় ওমর আল-বশিরকে। ২০১৮-২০১৯ বিপ্লবের পর সুদানের ক্ষমতা ভাগাভাগি ব্যবস্থার তদারকির দায়িত্ব নেয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। দেশটির সব পক্ষকে নিয়ে বসা হয়। সশস্ত্র বাহিনী, দ্রুত সহায়তা বাহিনী ও বেসামরিক মন্ত্রিসভাকে এক জায়গায় জড়ো করা হয় অচলাবস্থা থেকে বের হয়ে আসার উদ্দেশ্যে। অর্থনৈতিক দুরবস্থার উত্তরণে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো কিছুতেই অবস্থার পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না!
খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে মুদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফন ঘটে সুদানে। এর ফলে ক্রমবর্ধমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে ‘আঞ্চলিক কালোবাজারি’। জ্বালানি, গম, তিলসহ আরও অনেক কিছু অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার হতে থাকে। একই সঙ্গে দেশ জুড়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেবল বাড়তেই থাকে ‘বিভাজন’। বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কিংবা রাজপথে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বিভাজন ছড়িয়ে পড়ে।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে ‘সংকট’ চলছে, তা সুদানের সংকটকে আরও গভীর করে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সাপ্লাই চেইন ভেঙে গিয়ে বিশ্বব্যাপী পণ্যসামগ্রীর সরবরাহে যে ধাক্কা লাগে, তার অভিঘাতও আছড়ে পড়ে সুদান জুড়ে। দেশটিতে সারের দাম ৪০০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে—ভাবা যায়!
ডিজেল, সারের মতো কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণে সরকার ভর্তুকি উঠিয়ে নিলে সুদানের জনগণ ফুঁসতে থাকে। কৃষকদের অবস্থা হয়ে পড়ে অত্যন্ত শোচনীয়। এতে করে খাদ্য উৎপাদন কমে যায় স্বাভাবিকভাবেই। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
উপরিউক্ত ত্রিশঙ্কু সংকটের মুখে সুদান। জ্বালানি, খাদ্য ও রাজনৈতিক সংকট। রাজনৈতিক ও অর্থনীতির সুবিধা নিজের করায়ত্তে নিতে দুই বাহিনীর শীর্ষ জেনারেল নেমে পড়েছেন সংঘর্ষের ময়দানে! উভয় জেনারেলেরই বিশ্বাস, দেশের চলমান পরিস্থিতিতে নিজ নিজ বাহিনীর টিকে থাকা অতি জরুরি। অর্থাৎ, টিকে থাকার জন্য সর্বাত্মক লড়াইয়ের মানসিকতা নিয়ে সংঘাতের রাস্তায় নেমেছে তারা! তবে, এভাবে কতদিন, কতদূর? এ ধরনের দ্বন্দ্ব ও জটিলতার ঘেরাটোপে পড়ে সুদানের সংকট বাড়বে বই কমবে না। অর্থাৎ, সুদানের চলমান সংকট উত্তরণের সহজ রাস্তা কারো জানা নেই আপাতত! আলাপ-আলোচনা, সমঝোতার পথে না হাঁটলে সুদানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে কেবল কঠিন থেকে কঠিনতরই হতে থাকবে।
লেখক: কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের শিক্ষক, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি চায়না-আফ্রিকা নেটওয়ার্কের (ওকান) আহ্বায়ক এবং গ্লোবাল এনার্জি পলিসি সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ স্কলার
দ্য কনভারসেশন থেকে ভাষান্তর: সুমৃত খান সুজন
