শুক্রবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৪ আশ্বিন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

রেডলাইনে রহিয়াছে বাংলাদেশ!

আপডেট : ০৬ মে ২০২৩, ০৫:০৭

গতকাল ভোরে রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূকম্পনের মৃদু ঝাঁকুনি খায় ঢাকার অধিবাসীরা। ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যাহার পূর্বাভাস দেওয়ার উপযুক্ত প্রযুক্তি এখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয় নাই। বিশ্বের কোথাও ভয়াবহ ভূমিকম্প হইলে তাহার ভিডিও-সংবাদ আধুনিক ডিজিটাল এই যুগে সকলের মুঠির মধ্যে চলিয়া আসে। কিছুদিন পূর্বে আমরা সিরিয়া ও তুরস্কের ভয়াবহ চিত্র দেখিয়াছি। তুরস্কের মতো আধুনিক বিশ্বের একটি দেশের ঘরবাড়ি ভাঙিয়া পড়িতেছিল তাসের ঘরের মতো! গতকাল রাজধানীর ভূমিকম্পের উৎস ছিল ঢাকার নিকটবর্তী দোহার হইতে ১৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা বিবেচনায় দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশের অপরিকল্পিত ও ঘনবসতিপূর্ণ নগরাঞ্চল লইয়া আলোচনা কম হয় নাই! বিশেষ করিয়া এই জনপদে বড় ধরনের ভূমিকম্প সংঘটিত হইলে ঢাকা মহানগর মাটির সঙ্গে মিশিয়া যাইবে বলিয়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হইয়াছে বারংবার। নিকট অতীতে দেশে যেই সকল ভূকম্পন অনুভূত হয়, উহাদের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার বেশ দূরবর্তী অঞ্চলে। কিন্তু এইবার ঢাকার অতি সন্নিকটে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হওয়াই ইহা ১৮৮৫ সালে মানিকগঞ্জে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের কথা স্মরণ করিয়া দিতেছে। দুশ্চিন্তার কারণ, ঢাকার অদূরে এতটা অগভীরে (শ্যালো) ভূকম্পনের ঘটনা ইহাই প্রথম। উদ্বেগের বড় কারণ হইল, ঢাকার অদূরে টাঙ্গাইলের মধুপুরে যেই বৃহত ফল্ট (চ্যুতি) রহিয়াছে, তাহা কম্পনের সৃষ্টি করিলে কী অবস্থা হইবে ঢাকার! আশঙ্কা করা হয়, এই অঞ্চলে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হইলেই রাজধানীর প্রায় অর্ধেক তথা ১০ লক্ষের মতো ভবন ধসিয়া পড়িতে পারে।

ভূমিকম্পে কী ধরনের মানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইতে পারে—সর্বশেষ তুরস্কের ক্ষেত্রে তাহা দেখিয়াছে সমগ্র বিশ্বের মানুষ। ধ্বংসস্তূপ হইতে প্রতি ১০ মিনিট অন্তর একটি করিয়া লাশ উদ্ধার হইবার দৃশ্য বাক্রুদ্ধ করিয়াছে সকলকে। তুরস্কের মতো যেই সকল দেশে সাধারণত খুব বেশি ভূমিকম্প হয় না, সেই সকল দেশের কোনো ভয়াবহ ভূমিকম্প হইলে তাহা হইতে আমরা কি আদৌ কোনো শিক্ষা গ্রহণ করিতেছি? বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করিতেছেন, ঢাকার ১০০-২০০ কিলোমিটারের মধ্যে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হইলেই ঢাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হইয়া চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিবে—এই সতর্কবার্তা লইয়া আমরা কি খুব বেশি চিন্তিত হইয়াছি কখনো? ঢাকার অত্যন্ত সরু-সংকীর্ণ রাস্তাঘাট দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমকে কীভাবে কঠিন ও দুষ্কর করিয়া তুলিবে—তাহা লইয়া ভাবিবারও কি ফুরসত আছে আমাদের? আমরা কি কখনো ভাবিতেছি যে, উদ্ধার কার্যক্রমে আমাদের রেসপন্ডিং ক্যাপাসিটি তথা সক্ষমতা কতটুকু? তুরস্কে ভূমিকম্প-আক্রান্ত প্রতিটি মানুষকে উদ্ধারে ২ কোটি টাকা ব্যয় করিতে হইয়াছে—আমাদের কি এই সক্ষমতা থাকিবে?

স্মরণে থাকার কথা, ঢাকা হইতে ২৫০ কিলোমিটার দূরে ভারতের আসামে ১৮৯৭ সালে আঘাত হানা ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের সময় ঢাকায় মাত্র শত খানেক পাকা দালান ছিল, অধিবাসী ছিল ৯০ হাজারের মতো। ঐ ভূমিকম্পে আহসান মঞ্জিলসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১০টি ভবন। এই দৃষ্টান্ত কি আমাদের জন্য আমলযোগ্য নহে? সুতরাং, আমাদের সত্বর ব্যবস্থা গ্রহণে মনোনিবেশ করিতে হইবে। ভূমিকম্পের অমানিশা হইতে বাঁচিতে সতর্ক হইতে হবে সর্বস্তরের জনগণকে। ব্যবস্থা করিতে হইবে যথাযথ প্রশিক্ষণের। স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড অনুসরণ তো করিতে হইবেই, পাশাপাশি পুরাতন ইমারতগুলিকে কীভাবে কার্যকর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যায়, তাহা ভাবিতে হইবে। ভূমিকম্পের রিটার্ন পিরিয়ডের হিসাব অনুযায়ী, রেডলাইনে রহিয়াছে বাংলাদেশ! যেই হেতু ভূকম্পনের পূর্বানুমান সম্ভব নহে, তাই প্রলয়ংকরী এই দুর্যোগের বিপর্যয় এড়াইতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং সচেতনতা ব্যতীত বিকল্প কোনো পথ খোলা নাই।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন