‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের মতো প্রেমিকযুগলের অস্তিত্ব কেবল রবীন্দ্রনাথের মনোজগতেই আছে। বাস্তবে নেই। লোকে বলে এই চরিত্রগুলো রক্তমাংসের নয়। রক্তমাংসের বলতে তারা কী বোঝায় জানি না, হয়তো নিজেদের সঙ্গে মেলাতে পারে না, তাই বলে রক্তমাংসের নয়। যাহোক, শেষের কবিতার প্রেমিকযুগল ঘরসংসার করার জন্য ভালোবাসেনি। যেটুকু বুঝেছি, তাদের উচ্চস্তরীয় প্রেমকে অমরত্ব দিতেই বিয়ের পথ থেকে সরে এসেছে। যেমন রবীন্দ্রনাথের বাঁশরী। তার প্রেমিক ক্ষীতিশের সঙ্গে সুষমার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তার বান্ধবী লীলা বলেছিল, সুষমার ওপর তোর রাগ নেই? বাঁশরী বলেছিল, কেন থাকবে? সে কি আমার চেয়েও জিতেছে?
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এখানে বার্ট্রান্ড রাসেলের অদ্ভুত মিল দেখতে পাই। বার্ট্রান্ড রাসেল মনে করতেন, যেহেতু দাম্পত্য প্রেম ও রোমান্টিক প্রেম এই উভয় ধরনের প্রেমেরই প্রয়োজন রয়েছে মানবজীবনে, তাই এ দুটোই একসঙ্গে নিজের ভেতর লালন করা যেতে পারে। শেষের কবিতায় আমরা বরং রবীন্দ্রনাথের লাবণ্যকে সাধুবাদ দিতে পারি এ কারণে যে, যখন সে অনুভব করেছে যে অমিতকে বিয়ে করার অর্থ হলো আসলে তাকে হারানো; তখন সে দূরে সরে গেছে...চিরতরে। বলে গেছে, ‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান, গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়; হে বন্ধু বিদায়।’ সাদামাটা একটি দাম্পত্য জীবনসঙ্গী (শোভনলালাকে) সে বেছে নিয়েছে নিজের ইচ্ছেটুকুকে জলাঞ্জলি দিয়ে।
নাহ্, অমিত কিন্তু তা করেনি; অন্তত মনে মনে। লাবণ্য হয়েছে তার দিঘি, যেখানে তার মন সাঁতার দেবে ; আর কেতকী তার ঘড়ায় তোলা জল; যা দিয়ে সে নিত্য কর্মসম্পাদন করবে। পুরুষ ও নারীর মনের চিন্তার ভিন্ন ভিন্ন ধারাটা এখানে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
এবার মানব-মানবীর বিয়ে প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করি। যদি প্রশ্ন করি বিয়ে করার উদ্দেশ্য কী? কাউকে জিগ্যেস করলেই সে কি বলতে পারবে? পুরুষেরা হয়তো অনেক ভেবেচিন্তে বলবে, বউ তো দরকার, সংসার করা তো দরকার। কেন বাপু? কেন দরকার? কীসের দরকার? জবাব পাওয়া যাবে না। বড়জোর বলবে আমার বাপ করেছে, ঠাকুরদা করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
মেয়েরা বলবে, বিয়ে করার তো দরকার। বাবা-মা কি সারা জীবন বেঁচে থাকবে? কে দেখবে? ইত্যাদি ইত্যাদি।
অর্থাৎ স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই নিজ নিজ স্বার্থে বিয়ের পিঁড়িতে বসে। দুটি স্বার্থপর প্রাণী যদি নিজ নিজ স্বার্থের কথা ভেবে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়, তা হলে বিবাহের পর সংগত কারণেই সেই স্বার্থের দ্বন্দ্বই তাদের পরস্পরের কাছে আসার অন্তরায় হয়ে ওঠে। বিবাহ করার কারণ হওয়া উচিত তো প্রেম, একমাত্র প্রেম। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজে প্রেম বড় দুর্লভ। প্রেম কোথায়? কারোর প্রতি কারোর ভালোবাসা নেই, মানুষের প্রতি নেই, পশুর প্রতি নেই, প্রকৃতির প্রতি নেই। কেউ কারোর সুখে হাসে না, দুঃখে কাঁদে না। কেউ কারোর বিপদে সাহায্য করা তো দূরের কথা, বরং মজা দেখে। তাই অধিকাংশ বিবাহ-সম্পর্কই দেখা যায় প্রেমহীনতা দিয়েই শুরু হয়। প্রথম থেকেই শুরু হয় দুই পরিবারের মধ্যে দেনা পাওনা নিয়ে টানাপড়েন। একপক্ষ যথাসম্ভব ঝেড়ে নিতে চায় অন্যপক্ষ যথাসম্ভব তার থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। এই টানাপড়েনের মধ্য দিয়েই দুটি পরস্পরের অচেনা নারীপুরুষ আসে এক বিছানায় রাত্রি যাপন করতে। সনাতন ধর্ম বলে বিবাহ জিনিসটা জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক। জন্মজন্মান্তরের না হোক, যদি এক জন্মেরও হয়, সেটাও কম নয়। কিন্তু আসলেই কি তা-ই হয়? কিছুদিন পর বিবাহের নতুনত্ব কেটে গেলেই স্বার্থের সংঘাত দাঁত নখসহ প্রকাশ পায়। যখন জীবনসঙ্গীর সান্নিধ্যের যন্ত্রণা সহনসীমা ছাড়িয়ে যায়। শুরু হয় জীবনের টানাপড়েন। এই ক্ষেত্রে একেক জনের অভিজ্ঞতাটা একেক রকম হয়। ভালোবাসি বলা বড় সহজ হলেও ভালোবাসা যার তার কাজ নয়।
অনেকে বিচ্ছেদের দিকে এগোয়। বিচ্ছেদ তো নয়, আসলে এটা মুক্তি। লোকে বিবাহবিচ্ছেদ কেন বলে? বলা উচিত বিবাহমুক্তি, বিবাহ সম্পর্ক থেকে মুক্তি। বিচ্ছেদ হতে গেলে তো আগে মিলন হতে হবে। মিলনটা কবে হলো যে বিচ্ছেদ হবে? আবার অনেকে পরস্পরের প্রতি ঘৃণা নিয়ে প্রেমহীন বিবাহ-সম্পর্ককে ধরে রাখে আজীবন, ধরে রাখে ভালোবাসাহীন ঘর, তাসের ঘর! আর শয্যা হয় কণ্টক শয্যা।
রবীন্দ্রনাথ, ‘মানসী’তে বলেছিলেন, ‘মিলনে প্রেম ম্লান হয়।’ হয়তো তিনি প্রেমকে ম্লান করতে চাননি বলেই অমিত ও লাবণ্যের প্রেমকে বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে অম্লান করে রেখেছেন। শেষের কবিতা উপন্যাসের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তার
যৌবনকালের ব্যক্তিমানসের চিন্তাভাবনা, ধ্যানধারণা, দর্শন ও তার রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সমস্ত উপন্যাস জুড়েই নানা আদলে জীবন্ত রবীন্দ্রনাথই যেন আমাদের কাছে ধরা দেন। রবীন্দ্রনাথ হৃদয় নিংড়ে দিয়েছেন শেষের কবিতায়। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ পুনরায় রবীন্দ্রযুগ প্রতিষ্ঠা করেছেন; তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি চির আধুনিক; চির প্রাসঙ্গিক।
লেখক : নিবন্ধকার, গবেষক
