আমের নাম শোনেনি, এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। একটিও আমগাছ নেই, সেসব দেশের বাজারেও আম কিনতে পাওয়া যায়। কারণ বিশ্বব্যাপী সুস্বাদু আমের চাহিদা রয়েছে এবং এজন্য আমকে ফলের রাজা বলা হয়। মৌসুমি ফল আম গ্রীষ্মপ্রধান দেশে জন্মে। সাধারণত শীত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমের মুকুল বের হয় এবং তারপর তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আম পেকে যায়। তবে আজকাল কৃষিতে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে সারা বছর আম উৎপাদন শুরু হয়েছে। তবে সেসব আমের গুণমান ও স্বাদ মৌসুমি আমের মতো হয় না।
আমাদের দেশে কাঁঠাল জাতীয় ফল হলেও আম প্রধান ফল। প্রতি বছর আমের মৌসুমকে ঘিরে আমচাষী ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে সরকারকে নানা নীতি-পরিকল্পনা নিতে দেখা যায়। আমের ভোক্তাদের জন্য সেসব নীতি গণমাধ্যমে আগেভাগে বেশ জোরেশোরে প্রচার করা হয়। এর মধ্যে আমের উৎপাদন বাড়ানো, যত্নসহকারে বাগানের পরিচর্যা, গাছে সময়মতো স্প্রে করা, হার্ভেস্টিং, ফল সংরক্ষণ, ভেজালমুক্তভাবে বাজারজাতকরণ, বিদেশে রপ্তানিকরণ ইত্যাদি। আমচাষ লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষক শস্যদানা আবাদ বাদ দিয়ে ফসলি জমিতে মৌসুমি ও বারোমাসি আম চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
অপুষ্ট আম আগেভাগে পেড়ে ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে পাকিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে বাজারজাতকরণ চলে। এসব প্রতারণা ও ক্ষতি ঠেকাতে সরকারিভাবে নির্দিষ্ট সময়ে আম পাড়ার জন্য ক্যালেন্ডার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। একক জাতের আমের জন্য এককটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথম মে ৪ তারিখে গুটি আম ও সর্বশেষ আগস্টের ২০ তারিখে ইলামতি আম পাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির আচরণে অনেক বৈসাদৃশ্য শুরু হয়ে যাওয়ায় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আম পরিপক্ব হচ্ছে না। আম পাড়ার জন্য তৈরি ক্যালেন্ডারে এ বছর প্রথমেই গরমিল লক্ষ করা গেছে। যেমন, গুটি আম পাড়ার জন্য মে মাসের ৪ তারিখ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজশাহী এলাকার গুটি আমে পরিপক্বতা আসেনি বিধায় আমচাষিরা কেউ গুটি আম পাড়েননি। অভিজাত আমের রাজধানী বলে খ্যাত চাঁপাই নবাবগঞ্জের আমচাষিরা বলেছেন, আমাদের এলাকায় গাছে আম পাকা শুরু হলে তারপর আম নামানো হবে। অন্যদিকে বর্তমান রংপুর, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও পার্বত্য চট্টগ্রামে এলাকায় হাঁড়িভাঙা, আম্রপালি ও সূর্যপুরী আম সুস্বাদু আমের বাজারে বিশাল জায়গা করে নিয়েছে। এগুলোর উৎপাদন, বিপণন ও ভোক্তা দিনদিন বাড়ছে। কিন্তু আম পাড়ার ক্যালেন্ডারে ক্রমবর্ধিষ্ণু এসব আমের উল্লেখ নেই বলে তারা কিছুটা হতাশ।
আমের মৌসুম শুরু হলেই কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসা সরব হয়ে ওঠে। অনেকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে অভিজাত আম পাঠায়। কেউ কেউ নেতা-মন্ত্রী বা চাকরিস্থলের বড় বসকে খুশি করার জন্য কুরিয়ারে আম পাঠানোর আবদার মেটাতে গিয়ে হিমশিম খায়। কারণ, তাদের ভালো জাতের আম ও পরিমাণে বেশি করে পাঠাতে হয়। এটা ঠিকমতো মেটাতে না পারলে অনেক সরকারি চাকুরের প্রমোশন ও ভালো জায়গায় বদলি হয় না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। আমের জেলাগুলোতে মানুষের আনাগোনা বাড়ে, বহু শ্রমিকদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়, বাজারে গতি বাড়ে ও স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। রাজশাহী এলাকায় প্রতি বছর ‘ম্যাংগো ট্যুর’ গতিপ্রাপ্ত হয়। করোনার সময় থেকে অনলাইনে আম কেনাবেচার প্রবণতা শুরু হলেও বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমে আম কেনাবেচার ব্যবস্থা ব্যবসা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ভিডিও কলের মাধ্যমে সরাসরি আমের বাগান থেকে পছন্দনীয় জাত ও গাছের আম পাড়া, ওজন দেওয়া, প্যাকেটজাত ও প্রেরণ করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এজন্য বাগানে আমের মুকুল আসার পর থেকে ভিডিও দেখিয়ে ক্রেতা আকর্ষণ করে তার ফলোআপ করার মাধ্যমে অগ্রিম বিক্রির চুক্তিও করেছে কিছু অনলাইন প্রতিষ্ঠান।
শুধু রসালো তাজা আম বা মিষ্টি ফলই নয়, ফলের জুস, আচার, আমসত্ত্ব, লজেন্স, ম্যাংগোবার ইত্যাদির উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কারখানা তৈরিতে সরকারি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বেকার যুবকদের জন্য সহযোগিতা বাড়ানোর চিন্তা করা প্রয়োজন। এটা আরও বিস্তৃত হলে আমের বাজারে ভোক্তা প্রতারণার প্রবণতা কমে যাবে, অসৎ ফড়িয়াদের অনৈতিক দৌরাত্ম্য দূর হবে এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কিছুটা হলেও তৈরি হবে। এছাড়া আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, তরমুজ প্রভৃতি রসালো ফলের প্রক্রিয়াজাত কারখানা খুব কম থাকায় প্রতি বছর আমাদের বিদেশি ফলের জুস আমদানি করতে হয়। নিজেদের মাটিতে এত পুষ্টিকর ফল উৎপাদন হলেও শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সঠিক সংরক্ষণের অভাবে আমাদের থাইল্যান্ডের আম, লিচু ও পেয়ারার জুস বাজার থেকে কিনে খেতে হয়। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে দাবি করার পর এসব বিষয় আমাদের জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক।
অধুনা বারোমাসি আম বলে ফরমালিনযুক্ত আম সারা বছর বাজারে পাওয়া যায়। প্রতিবেশী দেশের অপরিপক্ব আম আমাদের বাজারে অবৈধভাবে ঢুকে বারোমাসি আম বলে রাজধানীর অনেক অভিজাত মার্কেটে অসময়ে বিক্রি হতে দেখা যায়। এই অসাধু প্রবণতা রোধ করার জন্য সরকারি কর্তৃপক্ষকে সজাগ হতে হবে। এসব অপুষ্ট মৌসুমি ফলের অবৈধ ব্যবসা ঠেকানো জরুরি। তা না হলে আমাদের দেশি আমের বাজার ক্ষতির সম্মুখীন হবে এবং যেটা আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট হুমকিস্বরূপ। এছাড়া দিনক্ষণ বেঁধে দিয়ে আম পাড়ার ক্যালেন্ডার তৈরি করা হলেও প্রকৃতির নিয়ম আলাদা হতে পারে। প্রতি বছর কোনো জেলার বা ভৌগোলিক এলাকার জলবায়ু, পরিবর্তিত পরিবেশ এবং স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করে ফল পাড়ার ক্যালেন্ডার সাজাতে হবে। তাই এ ব্যাপারে প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গাছ থেকে পরিপুষ্ট ফল পেড়ে বাজারজাতকরণ ও সেটা ভোক্তার হাতে সহজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে সরকারি নীতি-নির্দেশনাকে বেশি নমনীয় হতে হবে।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

