ট্রাফিক বিভাগের কিছু পুলিশ প্রফেশনালভাবে নিয়মিত ব্লগ ভিডিও বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেন। তাঁদের কিছু ভিডিওতে দেখা যায়—তাঁরা সড়কে আইন ভঙ্গ করে গাড়ি চালনার অপরাধে চালককে আটক করেন। অথবা দেখা যায় গাড়ি আটকিয়ে কাগজপত্র চেক করছেন—গাড়ির কাগজ অথবা চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কি নেই। পুলিশ অফিসার চালককে প্রশ্ন করেন—তাঁর অপরাধের জন্য কী করবেন? তিনি অপরাধ করেছেন কি না? কেউই মামলা নিতে চান না। তাই সব চালকই বলেন, ‘স্যার এইবারের মতো ছেড়ে দেন। আর করব না।’ আবার সড়কের উৎসুক জনতার মতামতও নেন সেই পুলিশ অফিসার—‘এই চালককে কি কি ছেড়ে দেওয়া যায়?’ উৎসুক মানুষেরাও অনুরোধ করেন, ‘স্যার এবারের জন্য ছেড়ে দেন।’ পরে দেখা যায়—পুলিশ চালককে ছেড়ে দেন। বলেন, ‘যান এবারের জন্য সবার অনুরোধে ছেড়ে দিলাম। আর করবেন না।’
পুরো ঘটনা ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তেই লাইক, কমেন্ট, শেয়ার...। লাখ লাখ ভিউ হয়। একদিকে ভিউয়ের ওপর ফেসবুক থেকে টাকা আয় হয়, অন্যদিকে ভিডিওতে নিজেকে ‘মানবিক পুলিশ অফিসার’ হিসেবে উপস্থাপন করে বাহবাও কুড়ানো যায়। কিন্তু ভিডিওতে নিজেদের যেভাবে মানবিক হিসেবে উপস্থাপন করেন, বাস্তবেও কি তাঁরা চালকদের সঙ্গে এমন মানবিক আচরণ করেন! মামলা না দিয়ে ছেড়ে দেন! ভিডিওতে মানবিক হওয়ার অভিনয় অনুষ্ঠিত হয়। বাস্তবে কখনো কখনো চালক অন্যায় না থাকলেও চালককে মামলার স্লিপ ধরিয়ে দিতে দ্বিধা করা হয় না।
এই তো সেদিন একজন ব্লগার পুলিশের ফেসবুক থেকে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখলাম—একজন লোক সড়কের উলটো পথে মোটরসাইকেল চালিয়ে না নিয়ে হেঁটে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ব্লগার পুলিশ দূর থেকে দেখে সেই লোককে মোটরসাইকেল নিয়ে তার কাছে আসতে বললেন। তিনি ধারণা করেছিলেন লোকটি মামলা থেকে বাঁচতে উলটোপথে ঠেলে মোটরসাইকেল নিয়ে একটা কৌশল অবলম্বন করেছেন। কথায় কথায় লোকটিও সহজ স্বীকারোক্তি দেন যে তিনি মামলা থেকে বাঁচতেই এই চালাকি করেছিলেন। ব্লগার পুলিশ তাঁর পাশেই সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করেন, ‘স্যার তাকে কী করব বলেন তো?’ তিনি মুখ গম্ভীর করে উত্তর দেন, ‘মামলা দিয়ে ছেড়ে দেন, তাইলে আর করবো না।’ উত্তর দিতে দিতেই তাড়াহুড়ো করে সেখান থেকে সরে যান। পরে ব্লগার পুলিশ মোটরসাইকেল চালককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘দেখেন স্যার তো কয় মামলা দিতে। যদিও কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি মামলা না দিয়ে সতর্ক করে যেতে দেন। কিন্তু তাঁর স্যার মুখ গম্ভীর করে যেভাবে মামলা করার পরামর্শ দেন তাতে পুলিশের বাস্তব ব্যবহার ঐ ভিডিওতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। যা অনেকের দৃষ্টিতেই অসংগতি মনে হবে।
সে যাই হোক, সড়কে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে ট্রাফিক পুলিশের কাজ মামলা দেওয়া—তাঁরা মামলা দেবেন। আইন তো আর আবেগ দিয়ে চলে না। আইন প্রয়োগ করতে কঠোর হতে হয়। তবে তারা প্রমাণের জন্য ভিডিও করতে পারেন। কিন্তু সেই ভিডিও এভাবে পাবলিক প্লেসে ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। মানবিকতা প্রকাশ করতে গিয়ে মামলা না দিয়ে ছেড়ে দিলেও সচেতনতার নামে এধরনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে সামাজিকভাবে ঐ ব্যক্তির সম্মানহানি করা হচ্ছে বলে মনে করি। আপনি মানবিক হলে সবাই এমনিতেই চিনবে। ভিডিও প্রকাশ করে চেনাতে হবে না। এমন করে আপনি বাহবা পেলেও এতে ঐ ব্যক্তির পরিবার ব্যথিত হয়, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীর কাছে লজ্জিত হয়।
ঢাকা

