স্মরণকালের সবচেয়ে জটিল সংকটের মধ্যে নিপতিত সুদান। এপ্রিলের মাঝামাঝি শুরু হওয়া সেনাবাহিনী ও রেপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যকার সংঘর্ষ সুদানকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলেছে। আরএসএফের অভ্যুত্থান-চেষ্টার হাত ধরে বিদ্রোহের আগুন ক্রমাগতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে সুদান জুড়ে। চলমান সংকটে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা তো ঘটছেই, পাশাপাশি সুদানি জনগণের জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ ‘মানবিক দুর্ভোগ’। মানবিক সংকটের পাশাপাশি ‘নিরাপত্তা সংকট’ ঘিরে ধরছে সুদানকে! প্রধান দুই বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানের কারণে জনজীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। বিদেশি কূটনীতিক ও বহু নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এক কথায় বললে, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের সুদান।
উল্লেখ করা দরকার, এমন এক সময়ে সুদানের দুই বাহিনী সংঘাতে লিপ্ত হয়, যখন আরও বেশ কয়েকটি সংকটের মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, সংঘাত থামেনি। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল ও খারাপ হচ্ছে।
অনেকের জানা, ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর থেকে খুব একটা ভালো নেই সুদান। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়েছে দেশটির সরকার। অর্থাৎ, ২০১১ সাল থেকে সুদানের অর্থনীতিতে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, তার সরাসরি প্রভাব রয়েছে চলমান অস্থিরতার পেছনে। নজিরবিহীন রাজনৈতিক ভাঙন দেখা দিয়েছে দেশটিতে। অবস্থার উত্তরণে ২০২০ সালের অক্টোবরে ‘জুবা শান্তি চুক্তি’ কিছুটা আশা জাগিয়েছিল বটে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে সুদানের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ঠেলাঠেলিতে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখতে পারেনি।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, আন্তঃসাম্প্রদায়িক সহিংসতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে সুদানে! সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলোতে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, পালটাপালটি প্রতিক্রিয়ার জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা স্পষ্ট, সুদান বর্তমানে এমন একটি ‘চৌমাথা’য় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়েই ভাবতে হবে—চারটি রাস্তার মধ্যে কোনটি ধরে এগোলে ‘শান্তি ও স্থিতিশীল’ পরিবেশের দেখা পাওয়া যাবে?
১৯৫৬ সালে যুক্তরাজ্য ও মিশর থেকে স্বাধীনতা লাভ করে সুদান। এরপর বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী সুদানের জনগণ। যেভাবেই হোক মানুষের জীবন চলছিল একভাবে, তবে ২০১১ সালে সীমান্ত ভাগাভাগি হয়ে মধ্য দক্ষিণ সুদান এগিয়ে গেলেও বেশ খানিকটা পেছনে পড়ে যায় সুদান। এরপর থেকে সুদানের অবস্থা কেবল নিচের দিকেই নামছে। যদিও এখন অবধি ‘আশাহত’ নন সুদানিরা।
ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুদানের চেয়েও অনেক গভীর ও দগদগে ক্ষত সারিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে বহু দেশ। বর্ণবাদের পতন ঘটানোর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা কী পরিমাণ এগিয়ে যায়, তার জীবন্ত সাক্ষী আমরা। ব্যাপক গণহত্যার পরেও ঘুরে দাঁড়ানো যায়—এই দাবির জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত রুয়ান্ডা। সংকটকাল পার করে কীভাবে সাফল্যের ধারায় ফিরতে হয়—রুয়ান্ডাকে দেখে তা শিখতে পারে সুদান। বিভিন্ন ক্ষেত্রে রুয়ান্ডার আজকের যে অর্জন, তা সুদানের জন্য অনুপ্রেরণার হতে পারে। রুয়ান্ডাকে অনুসরণ করে আন্তঃসংযুক্ত সংকটের উত্তরণ ঘটিয়ে শান্তি, পুনর্মিলন, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে নিজেকে এগিয়ে নিতে পারে সুদান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুদান কি সেই পথে হাঁটবে? ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি এড়ানোর কথা মাথায় রেখে বন্দুকের গর্জন থামাতে রাজি হবেন দুই বাহিনীর শীর্ষ নেতারা? অবস্থাদৃষ্টে অবশ্য কখনো-কখনো এমনটাও মনে হচ্ছে, ‘সহিংসতার শেষ অধ্যায়ের কাউন্টডাউন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে!’
সুদানে আজ যা চলছে, তাই আগামী দিনের ‘ইতিহাস’। সেই ইতিহাসের একটি দাঁড়ি-কমাও পালটাতে পারব না আমরা। সংঘাতে ঝরে পড়া মূল্যবান রক্তের একটি ফোটাও ফিরিয়ে আনতে পারব না। সুতরাং, যে কোনো প্রকারেই হোক, বর্তমান সংকটের অবসান জরুরি। এই বাস্তবতা সব পক্ষকে বুঝতে হবে, আমলে নিতে হবে। অতীতের ভুল পদক্ষেপ ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে চলমান অচলাবস্থার নিরসন করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, ঘৃণামূলক বক্তব্য, পরষ্পর-বিরোধী প্রতিক্রিয়া—এগুলো ভবিষ্যতে আমাদের জন্যই ‘কাল’ হয়ে দাঁড়াবে! সুদানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই এসব বন্ধ করা দরকার। অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রের পথে মসৃণ উত্তরণের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। এই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে স্মার্ট অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা সুদানের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুদানের উচিত, হানাহানির রাস্তা থেকে সরে এসে টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা, সুদানের গুরুত্বকে ব্যবহার করা।
মনে রাখতে হবে, সুদানের সংঘর্ষ বন্ধ করা না গেলে সুদানে তো আরও ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবেই, একই সঙ্গে তা সুদানের সীমানা অতিক্রম করে আছড়ে পড়তে পারে আরও কয়েকটি অঞ্চলে! সুদানের সংঘাতের জের ধরে এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে ‘অশান্ত জনপদ’। সুদানের অস্থিতিশীলতা গ্রাস করবে দক্ষিণ সুদানকেও!
সুদানের স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং অবৈধ অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সুদানের সংঘাত বন্ধ হওয়াটা অনেক বেশি জরুরি। সুদানের বর্তমান সংকটের সমাধান ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুবিধার্থে এজন্য প্রয়োজন ‘একটি রোডম্যাপ’। সুদানের হাতে এখনো যা সম্পদ আছে, তা দিয়ে বেশ ভালোভাবে চলা সম্ভব। এমনকি সুযোগ-সুবিধার (অপোরচুনিটি) দিক থেকেও সুদান বেশ সমৃদ্ধ। আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখতে পারে—এমন যে কয়টি দেশের তালিকা করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), তার মধ্যে সুদান অন্যতম। সুদানে খাদ্যনিরাপত্তার উন্নতির জন্য প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। সহজ হিসাব হলো, সুদান প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পেলে তা পুরো দেশকে বদলে দিতে পারে। তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্ববাজারের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজসম্পদের জোগান আসতে পারে সুদান থেকে। নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে সৌরশক্তির জন্য প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে সুদানে। ‘শূন্য’ কার্বনের জন্য বিশ্বব্যাপী যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে সুদান।
আফ্রিকার বিভিন্ন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে যথেষ্ট সুযোগ প্রদান করে সুদানের ভৌগোলিক অবস্থান। সুদানে অনেকগুলো পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো থেকে রাজস্ব আয় করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু সুদান নয়, এর সুবিধা নিতে পারে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোও। অর্থাৎ, সুদানে উল্লিখিত খাতগুলোতে বিনিয়োগ শুধু দেশের অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করবে না, বরং তা বিনিয়োগকারীদেরকেও দিতে পারে ‘বেটার রিটার্ন (বিনিয়োগ মুনাফা)’। সব হিসাব এক জায়গায় করলে এটা স্পষ্ট হয়, সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন, জাতি গঠন ও টেকসই শান্তির প্রশ্নে সুদানে স্থিতিশীলতা অনেক বেশি জরুরি। এক্ষেত্রে সংঘাত থামিয়ে ‘একটি মার্শাল প্ল্যান’ নিয়ে ভাবা সময়ের দাবি।
মার্শাল প্ল্যানের প্রথম ও সর্বাগ্রে সুদানকে বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে রক্ষা করতে হবে। সুদানের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোনো ধরনের বাধার সৃষ্টি করলে, সেগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। বিনিয়োগে আগ্রহী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জন্য সুদানের সম্পদ ‘সুযোগ’ প্রদানের জন্য যথেষ্ট। বর্তমান পরিস্থিতি সত্ত্বেও সুদানকে অতল গহ্বরে আটকে পড়া থেকে টেনে তোলা সম্ভব। স্টেকহোল্ডাররাসহ বিশ্বের উচিত হবে, চলমান সংকট থেকে সুদানকে মুক্তি দিতে এগিয়ে আসা। একটি ‘নতুন সুদান’ গড়ে তোলার সুযোগে পরিণত করা। সত্যিই যদি বিশ্বসম্প্রদায় তেমনটি করার চিন্তা করে, তবে তা কেবল সুদানের জন্য নয়, বরং এই অঞ্চল এবং সর্বোপরি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য হবে একটি বিশাল বিজয়।
লেখক: অস্ট্রিয়ায় সুদানের রাষ্ট্রদূত
আলজাজিরা থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন
