মা দিবস ও অনাগত মা

আপডেট : ১৪ মে ২০২৩, ১৪:২০

‘মা’একটি অক্ষর, একটি শব্দ, কিন্তু ব্যাপকতা প্রচুর। এই শব্দটি সকলের সবচেয়ে পছন্দের শব্দ এবং এই শব্দ থেকেই সৃষ্টি একটি ব্যক্তিত্ব। এটা এমন একটা ব্যক্তিত্ব, যেটা সব পরিবেশে, সবসময় সবার কাছে সবচেয়ে আপন। এই আপন শব্দ মা’কে নিয়ে উদযাপন করার জন্য আলাদা একটি দিন তা ভাবতেই খুব ভালো লাগে। অবশ্য মাতৃভক্তরা তো বলেই থাকেন প্রতিদিনই তাদের কাছে মায়ের জন্য মা দিবস, সেটাই হওয়ার কথা। কিন্তু সবার মা যদি সবার কাছে প্রতিদিন মা দিবস নিয়ে মনের কৌটরে সত্যি সত্যি আসীন থাকতো, তবে এত বৃদ্ধাশ্রমে মায়েদের দেখা যেত না। যাই হোক মাকে নিয়ে আলাদা একটি দিন, উদযাপনের দিন, ভালোলাগার দিন, মায়েদের পরিতৃপ্তির দিন।

সাধারণত মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে বিশ্ব মা দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। বিশ্বের সব মায়েরা সন্তানের কাছে শ্রেষ্ঠ আসনে আসীন থাকুক, এটাই প্রত্যাশা। সাধারণত এর ব্যত্যয় হয় তখনিই যখন সন্তান ঠিকঠাক মানুষ হয়ে উঠে না, বা যে কোনো কারনে মানুষ হয় না। জ্ঞানীরা বলেন, ‘কুসন্তান অনেক হয়, কিন্তু কুমাতা কদাচ নয়’- এই লাইনটিতে মা শব্দের যথার্থ মর্মকথা নিহিত আছে। মা হতে হলে অনেক বৈশিষ্ট্য আয়ত্ব করতে হয়। মা দিবস কে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে, মেয়েদেরকে মা হয়ে উঠার দিকে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। মা হওয়া কী মুখের কথা! না, মা হওয়া সহজ ব্যাপার না। সন্তানের জন্ম দিলেই মা হওয়া হয় না।

‘’মা ‘’শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো যিনি মেপে দেন, কাকে মেপে দেন? এর উত্তরে হবে সন্তানকে, কী মেপে দেন? এর উত্তর হলো, সন্তানের জীবনধারা। যিনি সন্তানের জীবনধারাকে গুণগত ও পরিমাণগত ভাবে মেপে দেন তিনিই মা। আমাদের বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবস্থায় সামাজিক রীতিনীতি মেনেই মা হতে হয়, এর অন্যথা হলেই মা তার পবিত্রতা হারান, যথার্থতা হারায়। মা হওয়ার পূর্বশর্ত হলো বিবাহ নামক সংস্কারে আবদ্ধ হওয়া। বিয়ের মাধ্যমে নারী পুরুষ  উভয়ে পরস্পরের ভার বহন করা,অর্থাৎ পরস্পরের দায়িত্ব গ্রহণ করার শর্ত নিয়ে সামাজিক স্বীকৃতিসহ এক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। বিবাহ আয়োজনের পূর্ণতার সাথে সাথে হয় সংস্কারের সৃষ্টি। সংস্কারে থাকে কিছু নীতির সৃষ্টি, কিছু আদর্শের সৃষ্টি, কিছু দায়িত্বের, কিছু ত্যাগের, কিছু সামাজিকতার, কিছু বোঝাপড়া এবং সর্বোপরি প্রজননের। মা তখনি সার্থক যখন এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে জন্ম নেওয়া  সন্তান সঠিক নির্দেশনায় লালিত হবে।

মায়েরাই পারে সন্তানকে তিল তিল করে গড়তে, মায়েদের এই তিল তিল প্রচেষ্টায় একদিকে থাকে ত্যাগ, ধৈর্য্য, প্রজ্ঞা, মেধা, বুদ্ধি, বোধ, বিবেচনা, সংযম, পরিশ্রম অন্যদিকে গঠিত হয় সন্তানের জীবনধারার গতি, যেই মা যতবেশি সুচারুরূপে এই কাজগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে পারে, তার সন্তান ততবেশি সফল, এবং সেই মা তত বেশি সার্থক।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে মায়েদের আরোও বেশি সচেতন হওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমাদের মা বাবারা আমাদেরকে যেভাবে বড় করেছেন, সেভাবে চলতে গেলে পদে পদে হোঁচট খেতে হচ্ছে। চারিদিকে অরাজকতা খুন খারাপি, আড্ডা, নেশাগ্রহণ, সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার এত ব্যাপক যে সন্তানদেরকে নজরদারি তথা সতর্ক খেয়ালে না রাখলে চোখের পলকে যে কোনো অনাকাঙ্খিত মুহূর্ত উপস্থিত হতে পারে। বিশ্বায়নের এই ডিজিটাল যুগে সমাজ যেমন অনেক খানি এগিয়েছে, তেমনি আমাদের সন্তানদের বোধ বিবেচনা, ক্ষিপ্রতা, চাতুর্যতা, দুষ্টুমিও অনেকগুণ বেড়ে গেছে। সন্তানদের চাতুর্যপূর্ণ বুদ্ধি, জ্ঞান সম্পন্ন আচার-আচরণগুলোকে খেয়াল রাখতে হবে অনুসন্ধিৎসু নিরীক্ষণের মাধ্যমে। সারাক্ষণ বন্ধুসুলভ ব্যবহার দিয়ে চাতুর্যপূর্ণ আচরণগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে। মায়েদের সামান্যতম অবহেলা সন্তানের জীবনের বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। সব সন্তান অবশ্য সমান নয়, এ কথা যেমন ঠিক, আবার বেশির ভাগ সন্তান এখন মিথ্যা বলায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে, একথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। সন্তানরা মা, বাবা, টিচারদেরকে ফাঁকি দেওয়া বা মিথ্যা বলাতে আনন্দ উপভোগ করে। এগুলোর দিকে মা-বাবাকে কৌশলি হয়ে সন্তানকে পরিচালিত করতে হবে, নয়তো সন্তান ও মা-বাবা উভয়ের জন্যই  ক্ষতিকর তথা ক্ষতিকর সমাজের, সর্বোপরি রাষ্ট্রের।

সার্থক মায়েরা, সার্থক সন্তানেরা জাতিকে গৌরবান্বিত করে। মা দিবস, বিশ্ব মা দিবসে সকল মায়েদেরকে জানাই পরম শ্রদ্ধা। সাধারণ মা যারা নিরন্তর চেষ্টা ও সাধনার  মাধ্যমে সন্তান লালন-পালন করেছেন, সেসব নিস্বার্থ মায়েদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। পরম প্রতিকুলতায় যেসব নারী মাতৃত্বকে করেছেন সফল, সেসব মা  ও নমস্য। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব মা তাদের স্বামী, সন্তান, সম্ভ্রম হারিয়েছেন, তাদেরকে জানাই অনাবিল, আন্তরিক, শ্রদ্ধাভরা, বিজয়ী অভিনন্দন। বিশ্ব মা দিবস সমগ্র মাতৃজাতির জন্য বয়ে আনুক প্রশান্তি ও সম্মান। মা’ই তো সবার ভরষার জায়গা, আপনজন, উপযুক্ত একমাত্র স্বার্থহীন অবলম্বন।

লেখক: শিক্ষাবিদ

ইত্তেফাক/এসসি