তুরস্কের আশপাশে দুই ধরনের দেশ রয়েছে। এর মধ্যে একধরনের কিছু দেশে নির্বাচনের আগেই ভোটের ফলাফল বলে দেওয়া যায়। অন্যদিকে দ্বিতীয় ধরনের কিছু দেশ রয়েছে, যেখানে নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে আগেভাগে নিশ্চিত করে কিঝু বলাটা প্রায় অসম্ভব। এদিক থেকে তুরস্কের অবস্থান বরাবরই দ্বিতীয় সারিতে। তুর্কিরা সর্বদাই ব্যালট বাক্সে বিশ্বাসী। দশকের পর দশক ধরে ব্যালটের ওপরই আস্থা রেখে চলেছে তুরস্কের জনগণ। এই সংস্কৃতির জন্য তারা গর্বিত বটে। সম্ভবত ‘ভোটিং বুথ’ তুরস্কের নাগরিকদের কাছে একমাত্র জায়গা, যেখানে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ ‘স্বাধীন’ বলে মনে করে। নির্বাচন এ দেশের রাজনীতিবিদ ও নাগরিকদের মধ্যে প্রাথমিক ও সরাসরি যোগসূত্রের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত।
সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে তুরস্কে ভোটগ্রহণ সবে শেষ হয়েছে। ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলেই নির্ধারিত হবে, কে বসতে চলেছেন তুরস্কের মসনদে। উল্লেখ করা দরকার, তুরস্কের শত বছরের ইতিহাসে এবারের নির্বাচনকে ‘অন্যতম তাত্পর্যপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জন্য এই নির্বাচন ‘অ্যাসিড টেস্ট’—ভোটের বহু আগে থেকেই এমন কথা বলে আসছেন অনেকে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কি না এবং আধুনিক তুরস্কের জনগণ বাস্তবিক অর্থে তাকে কতটা মূল্যায়নের চোখে দেখে, তার চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে যাবে এই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর।
বিভিন্ন জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল কিলিচদারোগলু কিছুটা এগিয়ে আছেন। বিরোধী ছয়টি দলের জোটকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিলিচদারোগলু। বেশ কিছু কারণে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা এরদোয়ানকে নির্বাচনে জিততে ‘কঠিন চ্যালেঞ্জ’ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলই তুরস্কের জনগণের পাওয়া-না পাওয়ার হিসাবের সমীকরণের বাস্তবতা তুলে ধরবে!
যেমনটা বলছিলাম, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচনে কে জিতবে, আগেভাগেই তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আজকের দিনে এটা একটা ‘ভালো চর্চা’ও বটে। তুরস্কের নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, ভোটের দিন রাত ৯টা পর্যন্ত ফলাফল নিয়ে কোনো ধরনের সংবাদ প্রকাশ নিষিদ্ধ।
নির্বাচন সামনে রেখে বাতাসে গুঞ্জন ছিল, ‘ক্ষমতার পালাবদল’ ঘটলেও ঘটতে পারে! এক্ষেত্রে সত্যিই যদি প্রেসিডেন্ট পদে ‘পরিবর্তন’ ঘটে, তবে ধরে নিতে হবে, এর পেছনে অনেকগুলো ‘ফ্যাক্টর’ কাজ করেছে। যেসব ‘ইস্যু’ ক্ষমতার পালাবদলে প্রভাব রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, সেগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে—
প্রথমত, তুরস্ক বর্তমানে নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০০১ সালের আর্থিক বিপর্যয়ের কথা স্মরণ করে বলা যায়, ভালো নেই দেশের ব্যাংক ও আর্থিক কোম্পানিগুলো। বর্তমানে সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ২৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে! তাছাড়া সম্প্রতি সংঘটিত ভূমিকম্পের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে প্রচুর ব্যয় হওয়ার কারণে টান পড়ছে রাজস্বেও।
দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি ব্যাপক হারে বেড়েছে তুরস্কে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন ঘটেছে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই মূল্যস্ফীতি শতকের ঘর অতিক্রম করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। এই বিষয়টি এরদোয়ানের ঘাড়ে ‘বাড়তি চিন্তা’ হিসেবে চেপে বসে নির্বাচনের আগে। জীবনযাত্রার ব্যয় এতটাই বেড়ে গেছে যে, জনগণকে প্রতিনিয়ত পড়তে হচ্ছে হিমশিম অবস্থায়। বিশেষ করে বড় মেট্রোপলিটন এলাকাগুলো ‘মূল্যস্ফীতির ঝড়ে’ রীতিমত কাঁপছে! পাবলিক সেক্টরের কর্মচারী, যেমন—ডাক্তার, নার্স, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত দৈনন্দিন ব্যয় কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। রিয়েল এস্টেট সেক্টরের অবস্থা আরো করুণ! প্রতি বর্গমিটারে খরচ এতটাই বেড়ে গেছে যে, ছোট আয়তনের বাসার বন্দোবস্ত করতেই গলদঘর্ম হচ্ছে জনগণ। এই চিত্র শুধু ইস্তাম্বুলে নয়, বোড্রাম কিংবা আন্তালিয়ার মতো এলাকাগুলোতেও জীবন হয়ে উঠেছে ‘বেশ কঠিন’! তুরস্কের ইকোনমিক পলিসি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ইস্তাম্বুলে বসবাসের খরচ ‘জাতীয় গড়’ ব্যয়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। প্রকৃত ব্যয়ের হার সম্ভবত আরো অনেক বেশি হবে! এর কারণ, তুর্কি পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের (তুর্কস্ট্যাট) ডেটার ভিত্তিতে করা এই হিসাবা সব মহলের কাছে গ্রহণীয় নয়!
তৃতীয়ত, দারিদ্র্য! অনেকের জানা, তুরস্কে দারিদ্র্যের হার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। দৈনিক ৫ দশমিক ৫ ডলার আয় করতেই নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। অর্থাৎ, উপার্জনক্ষম মানুষের আয় কমে গেছে বেশ খানিকটা। ২০০৩ সালে যখন এরদোয়ান প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন তুরস্কে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৭ শতাংশের মতো। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি’ নীতি গ্রহণের ফলে ২০১৮ সালে এই হার ৮ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু পরের দুই বছরে আবারও তা বেড়ে ১২ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। এর জন্য অবশ্য দায়ী কোভিড-১৯ মহামারি।
২০২০ সালের পর তুর্কস্ট্যাট ‘পারিবারিক জরিপ’ চালানো বন্ধ করে দেয়। এতে করে দারিদ্র্যহারের প্রকৃত চিত্রের ‘গণনা’ অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের অনুমান, তুরস্কে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৫ শতাংশ। তুরস্কের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বহু নির্বাচনের ‘প্রবীণ খেলোয়াড়’ প্রয়াত সুলেমান ডেমিরেল বলতেন, ‘এমন কোনো সরকার নেই, যার পক্ষে ভগ্ন অর্থনৈতিক পরিবেশে ভালো কিছু উপহার দেওয়া সম্ভব।’ ডেমিরেলের কথার সূত্র ধরে বলা যায়, আগামী দিনে তুরস্কে যে সরকারই ক্ষমতায় বসুক না কেন, রুগ্ণ অর্থনীতির দরুন দেশ চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
তুরস্কের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল। ২০১৮ সালে যখন তুরস্ক সুপার প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের সূচনা করে, তথা ‘এরদোগ্যানমিকস’ থিওরির কৌশল অবলম্বন করা হয়, তারপর থেকেই ভালো নেই অর্থনৈতিক অঙ্গন। এই সিস্টেমের সঙ্গে যে বাস্তবতার কোনো মিল নেই, তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত।
যদি বলা হয়, এরদোয়ান দেশ পরিচালনার নীতি প্রণয়নের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন, তবে বাড়িয়ে বলা হবে না। শুধু অর্থনৈতিক খাতে নয়; শিক্ষা, পররাষ্ট্রসহ কোনো খাতের অবস্থাই ভালো নয়। এই অবস্থার মুখে দাঁড়িয়ে সবাই ভাবছে, নির্বাচনের পর কী হবে? এই অবস্থার কি পরিবর্তন ঘটবে?
অনেক তুর্কির বিশ্বাস, এরদোয়ান বিজয়ী হলে তুরস্কের চেহারায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। তিনি তুরস্ককে দ্রুততার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দিকে নিয়ে যেতে পারবেন কি না—এ ব্যাপারে বহু তুর্কি সন্দিহান। অন্যদিকে, ছয় দলের সম্মিলিত বিরোধী জোটের নেতা কামাল কিলিকদারোগলুর ওপর ‘আস্থা’ রাখতে চান উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তুর্কি। তাদের ধারণা, এই জোটে এমন কিছু ‘অত্যন্ত চৌকশ ও অভিজ্ঞ’ ব্যক্তি রয়েছেন, যারা তুরস্ককে আবারও ঊর্ধ্বে তুলে ধরার সামর্থ্য রাখেন। এই জোট ক্ষমতায় এলে দেশ দ্রুততম সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ফিরবে। নির্বাচন ও ভোটের মাঠে এ ধরনের পালটাপালটি কথাবার্তা শোনা যায় বটে। তবে ক্ষমতার চেয়ারে বসে দেশের সার্বিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে পারাটাই আসল কথা। ২ হাজার ৩০০ ‘নীতি স্মারক’ সংবলিত ২৪০ পৃষ্ঠার দীর্ঘ নির্বাচনি ইশতেহার নিয়ে ভোটে অবতীর্ণ হয়েছে জোট। কিলিচদারোগলুর নেতৃত্বাধীন শিক্ষাবিদ ও সাবেক আমলাদের ছয় দলীয় জোট ‘পিপলস অ্যালায়েন্স’ অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে বছরব্যাপী কাজ করে আসছে। নির্বাচনে জিতেলে এই জোট অর্থনীতিকে কতটা সুস্থধারায় ফেরাতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।
এর পরও প্রশ্ন থেকেই যায়! আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হস্তক্ষেপ ছাড়া কি স্থিতিশীলতা অর্জনের পথে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তুরস্ক? নবগঠিত সরকার কি পরিস্থিতি সহজে সামাল দিতে পারবে? এরদোয়ান জিতলে তো নতুন কোনো চমকের আশায় প্রহর গুনবে না তুর্কিরা। কিন্তু কিলিকদারোগলুুর বিজয়ে নতুন কিছুর প্রত্যাশা করতেই পারে তুরস্কের জনগণ। কেননা, নতুন ব্ল্যাকবোর্ডে নতুন পেনসিল দিয়ে অঙ্ক মেলানোর কথা চিন্তা করবেন তিনি। যা হোক, আগামীর তুরস্কের ভালো থাকাই মূল কথা।
লেখক: তুরস্কের ইকোনমিক পলিসি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের এরিয়া স্টাডিজ প্রোগ্রামের পরিচালক, ক্যাপিটাল মার্কেটস বোর্ডের জ্যেষ্ঠ গবেষক, আংকারা ইউনিভার্সিটির পাবলিক ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষক ও সেন্ট্রাল ব্যাংক অব দ্য মনিটরি পলিসি কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
‘মিডল ইস্ট আই’ থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন
