এ দেশে বর্তমানে এমন রাজনীতিক আছেন, যারা সারা জীবন রাজনীতি করে এসেছেন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। তাদের নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নাই। নিঃস্বার্থ রাজনীতি করেছেন। তাদের একটাই চাওয়া—দেশের কল্যাণ, দেশের মানুষের কল্যাণ। অন্যদিকে অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, এ দেশে এমনও মানুষ আছেন, যারা মুখে দেশের কথা বলেন, দেশের মানুষের কথা বলেন। কিন্তু রাজনীতি থেকে তাদের চাওয়া-পাওয়ার আছে। কথাটি এভাবে বললে ভালো হয়, তারা রাজনীতি করেন জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য। তারা কেবল নিজেদের অর্থের জোরে জনপ্রতিনিধি হওয়ার দৌড়ে নামেন।
উপরোক্ত দুই শ্রেণির কোন শ্রেণি উত্তম? পাঠক নিশ্চয়ই এক বাক্যে বলবেন, এই লেখার শুরুতে যে শ্রেণির কথা বলা হয়েছে, সেই শ্রেণিই উত্তম। অর্থাৎ, যারা নিজের চাওয়া-পাওয়ার রাজনীতি করেন না। মূলত সত্যিকারের রাজনীতিক তারাই, যারা রাজনীতি করেন রাজনীতি থেকে কিছু পাওয়ার আশা না করে। কিন্তু যাদের রাজনীতি থেকে চাওয়া-পাওয়ার থাকে, তাদের সম্পর্কে বললে বলতে হয়, এরা সত্যিকারের রাজনীতিক কি না। এ প্রসঙ্গে ছোট একটা ঘটনা বলার আছে। এক লোক ছিল বিশাল ইটভাটার মালিক। সেই লোক মারা গেলে তার ছেলে সেটার মালিক হয়। সেই ছেলে রাজনীতিতে এলো। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দাঁড়াল। কোটি টাকা খরচ করে হলেও তাকে চেয়ারম্যান হতে হবে। এটাই তার ইচ্ছা।
যদিও শেষে তার চেয়ারম্যান হওয়ার রেজাল্ট কী, তা না হয় আমরা না-ই জানলাম। তবে আমাদের যেটা জানার বিষয়, তার মানসিকতাটা কী? তাকে চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য কেন কোটি টাকা খরচ করতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে যে কথা বলতে হয় তা হলো, এ দেশে এখন নিঃস্বার্থ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দৌরাত্ম্য দেখা যাচ্ছে যাদের, তাদের রাজনীতি হলো জনপ্রতিনিধি হওয়ার ইচ্ছা। আর এই বাসনা মেটাতে তারা অর্থের জোরকে প্রধান জোর বলে মনে করেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হওয়ার যে প্রধান ও একমাত্র জোর জনগণ, এই চিন্তায় তারা থাকেন না। বরং তারা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ান। তাদের এই টাকার খবর জনগণ আবার জানতেও পারে। দেখে-শুনে মনে হয়, টাকার এই ঝনঝনানি দেখে জনগণ তাদের ভোট দিয়ে দেবে। কিন্তু এই কি রাজনীতি! এই রাজনীতি যে বা যারাই করেন বা করতে আসেন, তারা কী করে নিজেদের সত্যিকারের রাজনীতিক বলে দাবি করবেন? একটু আগে যে ঘটনার কথা বলা হলো, এটা আমাদের চারপাশেরই ঘটনা। নির্বাচন এলে প্রায়ই শোনা যায়—অমুকে নেমেছেন ১ কোটি টাকা নিয়ে, ২ কোটি টাকা নিয়ে ইত্যাদি।
সত্যি কথা বলতে, এ ধরনের চর্চা আমাদের গোটা রাজনীতির জন্যই অশুভ! অত্যুক্তি হয় না বললে, এই রাজনীতি করে বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু হননি। বঙ্গবন্ধু যে রাজনীতি করে বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন, সেই রাজনীতি ছিল মানুষের জন্য রাজনীতি। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর রাজনীতি। তাই তো তাকে দেখে কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন—আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি।’
সেই হিমালয়সম হৃদয়ের মানুষটির নীতি-আদর্শ আজকের রাজনীতিকদের প্রেরণা হোক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের পুরোটা জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়, মানুষের জন্য তার ছিল অগাধ ভালোবাসা। তিনি সেই ভালোবাসা থেকে আমৃত্যু মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। আসলে মানুষকে ভালোবেসে মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা যাদের আছে, রাজনীতি তাদের জন্য।
পরিশেষে বললে, এ দেশে নতুন তারকা রাজনীতিক উঠে আসবেন। আমাদের রাজনীতিতে নিঃস্বার্থ রাজনীতির এক নবযুগের সূচনা হবে। থাকবে না স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির চর্চা। এই কামনা বাংলার প্রত্যেক জনগণের।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণবিশ্ববিদ্যালয়
