রাজশাহী
মেহেদী হাসান গালিব
রেশম, নির্মল বায়ু, পরিচ্ছন্ন নগরী আর পদ্মাপাড়ের শহরখ্যাত রাজশাহী যেন ইতিহাস-ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতিতে অনন্য ও সমৃদ্ধ এক বিভাগীয় শহর। এই শহরের যেমন রয়েছে সুপ্রচীন ইতিহাস তেমনি রয়েছে ইতিহাস ও নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে সময়ের সঙ্গে প্রবহমান বর্তমান। আর এই স্বকীয়তার কথা বললে রাজশাহীর যে জিনিসটির নাম সবার প্রথমেই মনে পড়ে, তা হলো আম। আমের সময় এলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব যোগাযোগ করতে শুরু করেন রাজশাহীবাসীর সঙ্গে। চাওয়া শুধু একটাই—রাজশাহীর বিখ্যাত আম। অতিথিপরায়ণ রাজশাহীবাসীও বিরক্ত না হয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি আম পাঠাতে থাকেন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাসায়। তাই তো আমের সময় রাজশাহীর প্রতিটি জমজমাট আম বিক্রয় কেন্দ্রের পাশে দেখা মেলে বিভিন্ন অস্থায়ী কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের।
এই সময় বাস টার্মিনাল, সাহেব বাজার, সোনাদিঘী মোড়ের বাজারসহ শহরের নানা স্থান যেন ভরে ওঠে আমে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু আম আর আম। চোখ বুজে বাতাসের ঘ্রাণ নিলেও নাকে এসে লাগে আমের মিষ্টি কড়া গন্ধ। তবে আমের এই বেচাকেনা যেন রীতিমতো উত্সবে পরিণত হয় বানেশ্বরের আম বাজারে। বলছিলাম, রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের বাজার বানেশ্বর আম বাজারের কথা।
নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কের ঠিক পাশেই অবস্থিত বানেশ্বরের এই বাজারে দেখা মেলে রাজশাহীর বিভিন্ন প্রান্তের আম। আম চাষিরা ভ্যান বোঝাই করে বাগান থেকে আম নিয়ে আসেন বাজারে। সেই ভ্যানে করেই চলে বিক্রির কাজ। কোনো কোনো আম চাষি আবার তাঁদের আমগুলো এখান থেকে বস্তায় করে পাঠিয়ে দেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
দেখতেই দেখতেই পড়াশোনার উদ্দেশ্যে আসা এই শহরটায় কেটে গেল ১ বছরেরও বেশি সময়। এর আগের বার বানেশ্বরে আম বাজার দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও নানা ব্যস্ততার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। তবে এবার আর ব্যস্ততার অজুহাত নয়, আমের মুকুল গাছে থাকতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবার গিয়ে ঘুরে আসবো রাজশাহীর সবচেয়ে বড় এই আমের বাজার থেকে। তাই বেছে নিলাম গত শুক্রবারের সকালকে। ৪ বন্ধু তালাইমারি থেকে লেগুনায় করে রওনা দিলাম বানেশ্বরের উদ্দেশ্যে। বানেশ্বর পৌঁছাতে আমাদের সময় লাগলো প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিটের মতো। বানেশ্বরের একটি হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে আমরা ঢুকে পড়লাম আম বাজারে।
ঘড়ির কাঁটা তখন ৯টার ঘরে। বাজার তখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি। তবে যাঁরা এরইমধ্যে আম নিয়ে চলে এসেছেন তাঁরাও বসে নেই। বাজারজুড়ে যেন চলছে আমকে কেন্দ্র করে এক উত্সব। কোথাও আম বিক্রি হচ্ছে, কোথাও বা ক্রেতা দোকানির সঙ্গে দামাদামি করছেন, দামাদামির এক পর্যায়ে ক্রেতার মন নরম করতে দোকানি একটু কৌশল করে একটা মিষ্টি আম কেটে খাইয়ে দিচ্ছেন ক্রেতাকে, কোথাও বা আবার আম প্যাকেটিংয়ে ব্যস্ত আম চাষিরা এই আমগুলো পাড়ি দেবে কয়েশ’ কিলোমিটার পথ। তবে সময় যত গড়াতে লাগলো, বাজার যেন ততই জমজমাট হতে লাগলো। রাজশাহীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্যানে করে আসতে লাগলো বিভিন্ন মুখরোচক আম। সেই ভ্যানে চেপেই বিক্রেতারা ক্রেতাদের ডাকছেন, আম বিক্রি করছেন। এরপর সব আম বিক্রি হয়ে গেলে আবার সেই ভ্যানে করেই ফিরে যাচ্ছেন হাসিমুখে।
বাজার ঘুরে দেখার পাশাপাশি কথা হলো কয়েকজন আম চাষির সঙ্গে। বরাবরের মতো এবারো জনপ্রিয়তার শীর্ষে ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ক্ষিরশেপাতি। আম্রপালি ও ক্ষিরশেপাতি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে। তবে সময় ও পরিমাণের ভিন্নতায় কমবেশি হচ্ছে দাম। এ বছর ঝড়ের কারণে ফলন নষ্ট হওয়ায় প্রভাব পড়েছে আমের দামেও। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু কিছু আমের দাম বেড়ে গেছে গতবারের চেয়ে দ্বিগুণ। তবে দাম বাড়ার পরও থেমে নেই মানুষের আম খাওয়া, বরং আগেরবারের তুলনায় বেচা-বিক্রি এবার বেশিই বলে জানালেন তাঁরা।
সূর্য্য তখনো পুরোপুরি মাথার ওপরে আসেনি। কিন্তু ততক্ষণে সরগরম হয়ে গেছে পুরো বাজার। বেচা-বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে আম চাষিরাও আমের খোসা ছাড়িয়ে কামড় বসাচ্ছেন রসালো আমে। আর চোখে চোখ পড়তেই দূর থেকে হাত উঁচিয়ে বলছেন, ‘খালি আমের ছবি তুললেই হবে, বাজান? আমাদেরও ছবি তোলেন।’
