শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

পৃথিবীর ছাতা ওজোন স্তরে ক্ষয়

আপডেট : ২৭ মে ২০২৩, ০৫:৩০

জলবায়ুর পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে দুই মিটারের কাছাকাছি। সেক্ষেত্রে এশীয় অঞ্চলের নিম্ন এলাকা অস্তিত্বসংকটে পড়বে

ওজোন গ্যাস সম্পর্কে সর্বসাধারণের খুব একটা ধারণা নেই। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এমন মানুষও বিষয়টি নিয়ে হযবরল পাকিয়ে ফেলেন। লাজলজ্জার কারণে বিষয়টি কারো কাছে জেনে নিতেও পারছেন না। এছাড়াও অধিকাংশ মানুষ বিষয়টির বিপরীত বোঝেন। যেমন, ‘ওজোন দিবস’ সামনে এলে মানুষের মনে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কোন ধরনের ওজোনকে  বোঝানো হচ্ছে? পরিমাপ নাকি অন্য কিছু! তাই ‘ওজোন’ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর প্রয়োজনবোধ করছি আমরা। তাতে কিছুটা হলেও স্বচ্ছ ধারণা পাবেন পাঠক। বিষয়টি সম্পর্কে আলোকপাতের আগে শব্দটার বাংলা বানানের পার্থক্য ও অর্থ জানানোর চেষ্টা করছি আমরা। যেমন—বাংলা শব্দ ‘ওজন’ হচ্ছে পরিমাপ, আর ইংরেজি শব্দ ‘ওজোন’ হচ্ছে একধরনের গ্যাসের নাম, যার অবস্থান বায়ুমণ্ডলের ১৫-৩০ কিলোমিটার (মতান্তরে ২৫-৫০ কিলোমিটার) উচ্চতায়। ওজোন স্তর তীব্র গন্ধযুক্ত হালকা নীল বর্ণের গ্যাসীয় পদার্থ। এটি ক্ষতিকর গ্যাস হলেও পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ফলে বলা যায়, এটি হচ্ছে প্রকৃতির পর্দা বা পৃথিবীর ছাদ। যে পর্দা বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে অথবা ভূপৃষ্ঠে বিকিরণ ঘটাতে বাধা সৃষ্টি করে। সোজা কথা, ওজোন স্তর হচ্ছে পৃথিবীর ফিল্টার। সূর্যের প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে ছেঁকে বিশুদ্ধ করে পৃথিবীর জন্য ১০-৪২ (কমবেশি হতে পারে) ডিগ্রি সেলসিয়াস পাঠায়, যা আমাদের কাছে সুষম তাপমাত্রা হিসেবে পরিচিত।

আমরা জানি, সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত অতিবেগুনি তেজস্ক্রিয় রশ্মি পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই রশ্মি ওজোন গ্যাসের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বা ওজোন গ্যাস তেজস্ক্রিয় রশ্মি শোষণ করে নেওয়ার ফলে ভূপৃষ্ঠের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় থাকে এবং ক্ষতিকর রোগ থেকে মানুষ মুক্তি পায়। বিশেষ করে, সূর্যের তেজস্ক্রিয় রশ্মি ওজোন গ্যাস শোষণ করে নেওয়ায় ত্বক ক্যানসার ও চোখের রোগ থেকে মুক্তি  মেলে। সেই প্রকৃতির রক্ষাকবচ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আজ। বিশেষ করে, ভূপৃষ্ঠে কার্বন নিঃসারণের মাত্রা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারের কারণে ওজোন স্তর ক্ষয়ে যাচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ‘সিএফসি’ (এ গ্যাস বিভিন্ন ধরনের স্প্রে, এয়ারকন্ডিশনের যন্ত্র এবং রেফ্রিজারেটরে বেশি থাকে) গ্যাসের বহুল ব্যবহারের কারণে ওজোন স্তর দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। এতে বড় ধরনের গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে ওজোন স্তরে। সেই গর্ত গলে তেজস্ক্রিয় রশ্মি ভূপৃষ্ঠে নেমে আসছে। বলে নেওয়া ভালো, ওজোন স্তরের পুরুত্ব খুব বেশি নয়। মৌসুমভেদে ও ভৌগোলিক কারণে এই পুরুত্বের পরিমাণ কমবেশি হয়।

ওজোন স্তরের পুরুত্ব পাতলা হয়ে দক্ষিণ মেরুতে অ্যান্টার্কটিকার ওপরে বিশাল গর্তের সৃষ্টি করেছে, যে গর্তের আয়তন প্রায় ৪০ লাখ বর্গকিলোমিটার। সুখবর হচ্ছে, সেই গর্ত ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছিল বিশ্ববাসীর সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে। অথবা বলা যায়, পরিবেশবিদদের আন্দোলনের ফলে বিশ্ববাসী সচেতন হয়েছেন। সেই সচেতনতার মধ্যেও চীন সিএফসি গ্যাস উত্পাদন বাড়িয়ে দিয়েছে। যার ফলে সংকুচিত হয়ে আসা ওজোন স্তরে ফাটল ধরাচ্ছে চীনের উৎপাদিত ক্লোরোফ্লোরো কার্বন বা সিএফসি গ্যাস।

১৯৮৬ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী ‘সুজান সলোমন’ গবেষণা করে নিশ্চিত হন, বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয়ে যাচ্ছে, যার জন্য দায়ী হচ্ছে সিএফসি গ্যাস। উল্লেখ্য, আশির দশকে এই গ্যাস প্রচুর নির্গত হয়েছিল বিশ্বে। পরিবেশবিদদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে বিশ্ববাসী এই গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে দিতে শুরু করলে ওজোন স্তর স্থিত অবস্থায় থাকে, যা সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে ২০৫০-৬০ সাল পর্যন্ত। কারণ বায়ুমণ্ডলে এখনো  প্রচুর পরিমাণে সিএফসি গ্যাস রয়ে গেছে, যা শোষণ করে নিঃশেষ করতে হলে আমাদের প্রচুর বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি অবশ্যই সিএফসি গ্যাস নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে কার্বনডাই অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের নির্গমন। অর্থাৎ কার্বন নিঃসারণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা, নির্বিচারে গাছপালা নিধন ও কালো ধোঁয়ার প্রকোপ বন্ধ করতে হবে। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে; পাচ্ছেও তাই। যার প্রমাণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘন ঘন বজ্র পাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ নানান দুর্যোগের শিকার হচ্ছেন বিশ্ববাসী। এরই মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বেশি শিকার হচ্ছে এশীয় অঞ্চলের দেশগুলো। তার মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। কারণ ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের নিচু এলাকাগুলোর একটি। ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ প্লাবিত হচ্ছে। তথ্যমতে, জানা যায়, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে এক মিটারের মতো, যার কারণে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ ভূমি প্লাবিত হবে। ওজোন স্তর রক্ষা করতে না পারলে কিংবা জলবায়ুর পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে দুই মিটারের কাছাকাছি। সেক্ষেত্রে এশীয় অঞ্চলের নিম্ন এলাকা অস্তিত্বসংকটে পড়বে। কাজেই আমরা এখনই সতর্ক হই, না হলে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি এ মহাদুর্যোগের শিকার হবে নিশ্চিত।  শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে তাই আমাদের আর্জি, এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে রক্ষা করতে কার্বন নিঃসারণের মাত্রা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে। পাশাপাশি বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের আবেদন বেশি বেশি বনায়ন সৃষ্টি করার। পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত আমাজান, সুন্দরবনসহ সমস্ত বনায়ন রক্ষা করার তাগিদ অনুভব করার। আর গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে বড় গাছ নির্বাচন করতে হবে। বনায়ন সৃষ্টির ক্ষেত্রে তালগাছকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ তালগাছ বজ্র নিরোধকের ভূমিকা রাখে। সুতরাং আমরা বনায়ন সৃষ্টি করে বজ পাত ঠেকাই এবং কার্বন নিঃসারণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর রক্ষা করি। পাশাপাশি শিল্পোন্নত দেশগুলোর শুভবুদ্ধি কামনা করছি, যাতে সিএফসি গ্যাসের উৎপাদন বন্ধ করে ওজোন স্তরকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এমএএম