আলোর পথযাত্রী

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৯, ২২:১১

নারী উন্নয়নে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্জন আমাদের সকলের জন্য বিশেষ গৌরবের বিষয়। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন, বৈষম্য বিলোপ, অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে নারীর অবদান এবং দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে নারীর অগ্রযাত্রা সমন্বিত কর্মপরিকল্পনারই ফসল। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে মেধা-মনন এবং দক্ষতায় নারীর অর্জন আজ চোখে পড়ার মতো। তৃণমূল পর্যায়ে থেকে জনপ্রতিনিধিত্বের প্রতিটি পর্যায়ে তাদের অবস্থান পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি সংহত। রাজনীতি, ব্যবসা, কৃষি, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা, চিকিত্সা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীতে নারীরা যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে প্রবেশ করেছে। এ সাফল্যে নারীর গৌরবময় অবদান সম্মানের সঙ্গে স্বীকৃত। বাংলাদেশের সংবিধান নারীদের শুধু সমান অধিকারই দেয়নি, বৈষম্য ঘোচানোর জন্য রাষ্ট্রকে সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার দিয়েছে। কল্যাণের চেয়ে নারীদের উন্নয়নের বিষয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে নারীর অবস্থান বিচারে ক্ষমতায়নের প্রশ্নটিই কেন্দ্রীয় বিচার্য বিষয়। সংবিধানে মেয়েদের অধিকার ও আইনি সুরক্ষার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারী বৈষম্যের অন্তর্নিহিত কারণগুলো অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। সমাজে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে নারীরা তাঁদের পূর্ণ ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে এবং বুঝতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় এবং সমাজ জীবনের সব কর্মকাণ্ডে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। নারী উন্নয়নের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত, অসহায় এবং নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নের  লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে তিনি গঠন করেন ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে জাতীয় পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায়ে গঠিত এ বোর্ডের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিত নারী ও শিশুর সঠিক তথ্য আহরণের জন্য জরিপ কাজ পরিচালনা করা, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্ব্বী করে গড়ে তোলা। ১৯৭৪ সালে এ বোর্ডের দায়িত্ব ও কর্মপরিধি বৃদ্ধি করে বৃহত্তর কলেবরে নারী পুনর্বাসন কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি এবং প্রজ্ঞায় এ ফাউন্ডেশনের আওতায় প্রথমেই তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের উন্নয়নের জন্য তত্কালীন সকল মহকুমা ও জেলায় ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীকে উত্পাদনমুখী কার্যক্রমে নিয়োজিত রেখে প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনের জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এ ফাউন্ডেশনের আওতায় যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের চিকিত্সা প্রদান এবং তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য বৃত্তি প্রদান কার্যক্রম চালু করা হয়। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নারীদের অর্থকরি কাজে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে আন্তঃখাত উদ্যোগ গৃহীত হয়। এর আওতায় ১৯৭৩ সালে সাভারে ৩৩ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘গ্রামীণ মহিলাদের জন্য কৃষিভিত্তিক কর্মসূচি’। পরবর্তীকালে প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র দূরীকরণ, দক্ষতা বৃদ্ধি, ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানে নারীদের বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়।

জনপ্রতিনিধিত্বের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে প্রণীত Local Govt (Union parishad) Amendment Act ১৯৯৭ এর আওতায় স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৩ জন নির্বাচিত নারী সদস্য রাখার বিধান করা হয়। পরবর্তীতে উপজেলা পর্যায়ে ১ জন নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করা হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমানে ১৩৭৫৫ জন নারী জনপ্রতিনিধি গ্রামীণ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সরকারের বিশেষ উদ্যোগে পিতার নামের পার্শ্বে মায়ের নাম সংযুক্ত করার বিধান কার্যকর করাসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস নির্ধারণ করা হয়েছে। নারী উন্নয়নে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংবিধানে স্বীকৃত নারীর মৌলিক অধিকার, আন্তর্জাতিক সনদ (সিডও, সিআরসি এবং বেইজিং ঘোষণা) এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আলোকে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ প্রণয়ন করা হয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি পদে কমপক্ষে ২৫% নারী প্রতিনিধির জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। Representation of the People order (RPO), ১৯৭২ এর তৃতীয় সংশোধনীতে রাজনৈতিক দলসমূহের কমিটি পদে কমপক্ষে ৩৩% নারী রাখার বিধান রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বাংলাদেশে ১৮.৬ মিলিয়ন (২০১৬-১৭) কর্মজীবী নারী রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক পূর্বেই ভর্তি এবং পাঠচক্র সমাপনের ক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীর সমতা অর্জিত হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গ্রস এনরোলমেন্ট ৯৮.৪%। স্নাতক পর্যায়ে পাবলিক বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পাঠদান কার্যক্রম ও উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ২.৭ মিলিয়ন মেয়েদের উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। ফলে, শিক্ষার্থী উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ড্রপ আউট উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

গার্মেন্টস সেক্টরে ৮৫ ভাগের অধিক নারী কর্মজীবী যার মোট সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি। এ সেক্টর থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার ৮০ ভাগেরও বেশি অর্জিত হয়। সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সম্প্রসারণের ফলে নারীদের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুস্থ নারীদের জন্য Vulnerable Group Feeding কার্যক্রমসহ গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের জন্য ১০০ দিনের কর্মসূচি দীর্ঘদিন যাবত্ চালু রয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় বিগত ১০ বত্সরে ৪৪,৭৭০টি ভূমিহীন পরিবারের ২,৬৮,৬২০ জনের আবাসন ব্যবস্থাসহ ‘জমি আছে ঘর নাই’ প্রকল্পের আওতায় ১,৩৩,৯৫৩টি পরিবারের ৮,০৩,৭১৮ জনকে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে সর্বপ্রথম শুরু হয় দুস্থ ও বিধবা নারীদের ভাতা প্রদান কার্যক্রম। বর্তমানে ২৫ লাখ বেনিফিশিয়ারি খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় প্রতি মাসে ৩০ কেজি পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল পেয়ে থাকেন। ৭ লাখ ল্যাকটেটিং মা প্রতি মাসে ৮০০ টাকা হারে ২ বছরের জন্য ভাতা পেয়ে থাকেন। ৮৮০০০ মা প্রতি মাসে ৫০০ টাকা হারে মাতৃত্ব ভাতা পেয়ে থাকেন। এছাড়া, বয়স্ক ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।

ক্ষুদ্র ঋণের চক্র থেকে বের হয়ে ক্ষুদ্র সময়ে গ্রামীণ নারীদের উত্সাহ প্রদানসহ দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষি, পশু পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং আয়বর্ধক বিভিন্ন কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণের ফলে ‘ আমার বাড়ী আমার খামার’ প্রকল্প এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিচিত একটি নাম। এ প্রকল্পের আওতায় ৯১,২৪৩টি সমবায় সমিতি গঠিত হয়েছে, যার প্রায় ৭৫ ভাগ নারী সদস্য রয়েছে। মূলত পরিবারের নারী সদস্যদের অংশগ্রহণে সারাদেশে ১১ লাখের অধিক কৃষিভিত্তিক পারিবারিক খামার তৈরি হয়েছে। এ পর্যন্ত ১,২১,৭৫৬ জন নারীকে এ প্রকল্পের আওতায় ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করার ফলে তাদের জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রণোদনাসহ ঋণ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের জন্য ১০% Small Enterprise Fund-সহ ১০% শিল্প প্লট সংরক্ষণ করা হচ্ছে। SME Foundation এর মাধ্যমে Single digit সুদে ঋণ প্রদানসহ ১৫% ক্ষেত্রে পুনঃঋণদান কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তারা কোনো প্রকার জামানত ছাড়াই ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণ করতে পারেন। সরকার ইতোমধ্যে ৪৯০টি উপজেলার গ্রামীণ এলাকায় ১০ মিলিয়ন নারীকে তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা দিয়েছে।

১৩০০০ কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে। প্রধানত গ্রামীণ নারী ও শিশুরা এ সেবার আওতায় সরকার প্রদত্ত ২৮ ধরনের ঔষধ বিনামূল্যে পাচ্ছে। এ যাবত্ কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতায় ২০০৯-২০১৯ পর্যন্ত ৮২.৮০ কোটি জন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেছে। প্রতি মাসে গড়ে ১ কোটি সেবা প্রার্থী  বিনামূল্যে এ সহায়তা গ্রহণ করছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দারিদ্র্য হ্রাস, মানসম্মত শিক্ষা অর্জন, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, গৃহায়ন এবং নারীর ক্ষমতায়ন। নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ, অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্জন, বাল্যবিবাহ ও যৌতুক নিরোধসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। নারী উন্নয়নে সরকারের বাজেট বরাদ্দ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। এ বছর এ খাতে মোট বাজেটের ২৯.৬৫% অর্থ বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে ৪০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ Gender Sensitive বাজেট প্রণয়ন করছে। বিগত দশ বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে সিভিল সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, ব্যবসা এবং কৃষি ক্ষেত্রে নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি সংস্থাও নারী ক্ষমতায়নে কাজ করছে। পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় নারীরা এখন অনেক প্রত্যয়ী এবং দেশের উন্নয়নে অধিকতর ভূমিকা রাখছে।

n লেখক :বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব এবং বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১