মহামতি আলফ্রেড আমাদের কী শিখাইয়াছেন?

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৩, ০৬:৩৩

যুক্তরাজ্যের লেখক ও রাজনীতিক টনি রবিনসনের ‘কিংস অ্যান্ড কুইন্স’ শিরোনামে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রহিয়াছে, যেইখানে দেখানো হইয়াছে কী করিয়া আজকের ইংল্যান্ড ‘আইনকানুনের মধ্য দিয়া’ একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া উঠিল। সেইখানে তিনি লিখিয়াছেন, অষ্টম শতাব্দীতে ইংল্যান্ড ৯-১০টি ভাগে বিভক্ত ছিল, সেই সকল ভাগে শাসন করিতেন বিভিন্ন উপজাতির শীর্ষনেতারা। আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ তথা সুইডেন-নরওয়ে হইতে ভাইকিং জলদস্যুরা নর্থ সি পাড়ি দিয়া প্রায়শই বহুধাবিভক্ত ইংল্যান্ডে আক্রমণ চালাইত। এইভাবে চলিতে থাকিল ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ অবধি। অতঃপর ইংল্যান্ডের প্রথম সর্বজনস্বীকৃত রাজা আলফ্রেড দ্য গ্রেট (শাসনকাল ৮৭১-৮৯৯ খ্রি.) ইংল্যান্ডকে একটি বিশেষ আইনের মধ্যে আনিলেন। তিনি একটি সেইখানে যেই ‘কিংডম’ তৈরি করিলেন সেই রাজ্যে সকলের জন্য ‘সমান আইন’-এর বিধান আনিলেন। সেই আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হইতে শুরু করিল মার্সিয়ান (ইংল্যান্ডের সাবেক কেন্দ্রীয় রাজ্য), নর্থামব্রিয়ান (তৎকালীন উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডবাসী), সাক্সন, এমনকি ভাইকিংদের ক্ষেত্রেও। বলা হইয়া থাকে, মহামতি আলফ্রেড ‘সকলের জন্য সমান আইন’-এর মাধ্যমে তৎকালীন ইংল্যান্ডের জন্য একটি মহত ‘আইডিয়া’ আবিষ্কার করিলেন। অতঃপর, আইনের শাসন কাহাকে বলে, ক্রমশ তাহার ইতিহাস তৈরি হইতে থাকিল।

ইহা দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, আধুনিক সভ্যতায় আইন হইল সকলকে একসূত্রে গাঁথিবার সবচাইতে বড় শক্তি। আরও স্পষ্ট করিয়া বলিলে বলিতে হইবে যে, সকলের জন্য সমান আইনই বিভক্তির মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী ‘ঐক্য’ তৈরি করিতে পারে। অন্যদিকে ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে বিনষ্ট হয় ঐক্য, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের সুনীতি। মনে রাখিতে হইবে, সভ্যতা টিকিয়া আছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের খুঁটির ওপর ভর করিয়া। তবে সমস্যা হইল, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে এখনো আধাসামন্তবাদী মানসিকতা দূর হয় নাই। এই সকল বিষয় লইয়া যাহারা গবেষণা করেন, তাহারা মনে করেন, বহু যুগ ধরিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের সমাজ গড়িয়া উঠিয়াছে একধরনের নৈরাজ্যের ভিতর দিয়া। এই জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে একটি জাতির নিয়মতান্ত্রিক সুষ্ঠু বিকাশধারার জন্য তৈরিকৃত প্রতিষ্ঠানের জন্য যতই বলা হউক—‘উহা নিয়মের মধ্যে চলিবে’—তাহা আসলে বাস্তবে দেখা যায় না। দিনের শেষে এইখানে নিজের ‘খেয়ালখুশিমতো’ সকল কিছু পরিচালনা করিবার প্রবণতাই প্রকট আকারে দেখা যায়। আরেকটি সমস্যা হইল—উন্নয়নশীল বিশ্বে শিক্ষাদীক্ষা হইতে শুরু করিয়া সকল কিছুই সীমিত। ফলে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষেরাও মনে করেন, ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা করিতে পারেন না—এমন কোনো কাজ নাই। তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশে দেখা যায়, যেই সকল ব্যক্তি দায়িত্বশীল পদে রহিয়াছেন, তাহাদের অনেকেই তাহার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন না। নবিজি (স.) বলিয়াছেন যে, আল্লাহ তাহার কোনো বান্দাকে যদি মানুষের জন্য দায়িত্বশীল হিসাবে নিযুক্ত করেন, অতঃপর সেই ব্যক্তি যদি তাহার উপর অর্পিত দায়িত্বের খেয়ানত করিয়া মৃত্যুবরণ করেন, তাহা হইলে তাহার জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করিয়া দেন।

বলিবার অপেক্ষা রাখে না, কোথাও যদি আইন বা নিয়মকানুনকে যখন-তখন পাশ কাটানো হয়, অথবা উহার অপব্যবহার করা হয়, তাহা হইলে উহা হইয়া উঠিতে পারে একটি রাষ্ট্রের কল্যাণকর ও আধুনিক হইবার পথের সবচাইতে বড় বাধা। যাহারা এখন যথাযথ নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইতেছেন, তাহাদের স্পষ্টতই মনে রাখিতে হইবে—এই দিন দিন না, আরও দিন আছে। মহাভারতে বলা আছে—‘যদি কোনো ঘটনায় মানুষ ভয়প্রাপ্ত  হয়, তাহা হইলে তাহার পরাজয়ই হয়।...নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে কখনো সন্দেহ প্রকাশ করা সঠিক নহে।’ সুতরাং জানিতে হইবে নিজেকে, জানিতে হইবে নিজের সীমাবদ্ধতাকেও। যথাযথ আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে বারো শত বছর পূর্বে মহামতি আলফ্রেড আমাদের কী শিখাইছেন—তাহা ভুলিলে চলিবে না।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন