সংলাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৩, ০২:৫৮

রাজনৈতিক বাঁকবদলের মৌসুম শুরু। বাগ্যুদ্ধের উপাদানও তৈরি হচ্ছে। সর্বশেষ এমনি একটি উপাদান—‘সংলাপ’, আমাদের সামনে হাজির। আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু বিএনপির সঙ্গে জাতিসংঘের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সংলাপ করার বিষয়ে বলার সঙ্গে সঙ্গে দলে ও দলের বাইরে আলোচনা জেঁকে বসেছে। আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা বিষয়টিকে নিছক কথার কথা বলেছেন, বিএনপির মহাসচিবও গুরুত্ব দেননি। এমনকি মন্তব্যও করতে রাজি হননি। এমতাবস্থায় বিষয়টি আলোচনার বাইরে থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। বাস্তবতা হচ্ছে রাজনৈতিক সমাধানে এর বিকল্প তেমন কিছু আছে কি? তাই পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা বন্ধ হয়নি।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, রাজনীতিতে এমন কিছু ঘটেনি যে, আমাদের সংলাপে বসতে হবে। আসলে এখানেই সংলাপের প্রয়োজনীয়তা কিংবা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আসতে পারে। আসলেই রাজনীতির মাঠ এখনো নিরামিষ অবস্থায় কি? বিএনপি আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে সংলাপে বসার মতো পরিস্থিতিতে ফেলতে পেরেছে? বলতে দ্বিধা নেই, আসলে বিএনপি তাদের আন্দোলনের ব্যারোমিটার ঊর্ধ্বমুখী করতে পারছে না। গরমে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ, বিদ্যুৎ নেই। ঘরে ঘরে বিদ্যুতের দাবি। কিন্তু বিএনপির দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেওয়া হোক। কুলমান রক্ষার জন্য হয়তো শেষ পর্যন্ত তারা বিদ্যুতের দাবিতে কর্মসূচি নিয়েছে। কিন্তু এমন সময় তারা বিদ্যুৎ অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি নিয়েছে, যখন আবহাওয়া বিভাগ বলছে, সারা দেশেই হালকা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। বাস্তবেও তা-ই ঘটে গেছে। বিএনপি কর্মীদের বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বিভিন্ন বিদ্যুৎ অফিসের সামনে অবস্থান করতে দেখা গেছে। তার মানে প্রকৃতি এসে তাদের আন্দোলনের উত্তাপ কমিয়ে দিয়েছে। জনগণ, যারা ইতিমধ্যে বিদ্যুতের সংকটের কারণে হাঁসফাঁস করছিল তাদের ধরে প্রাণ ফিরেছে প্রকৃতির সহযোগিতায়। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা কৌতুক হিসেবে নিয়েছে বিএনপির হারিকেন মিছিল। ছবিতে দেখা গেছে বিএনপি হারিকেন হাতে বিদ্যুতের দাবিতে মিছিল করছে, তাদের মাথার ওপরে বৈদ্যুতিক বাতিগুলো খিলখিল করে হাসছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বৈদ্যুতিক বাতির জ্বলা অবস্থায় বিদ্যুতের দাবিকে হাস্যকর হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এর মধ্যে একটা মেসেজও আছে, আন্দোলনের জন্য সাজগোছ করতে করতে সময় পেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি। যখন বিদ্যুতের জন্য হাহাকার চলছিল তখন তারা ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে ব্যস্ত। আর যখন বিদ্যুৎ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, তখন তারা নেমেছেন হারিকেন হাতে। সময়মতো উদ্যোগের অভাবে তাদের আন্দোলন যে হাসির খোরাক জোগায়, তারই প্রমাণ এটা। এসব কারণে আন্দোলনের গতি কিছুটা হলেও কমে গেছে।

দ্রব্যমূল্য নিয়ে বিএনপির আন্দোলনে তেমন একটা গুরুত্ব পায়নি। মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগাতে পারেনি কিংবা তারাও হয়তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকেই সাধারণ মানুষের চাহিদার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভেবে থাকতে পারে। এমতাবস্থায় সরকার যে সংলাপের মতো সমঝোতার চেষ্টার দিকে যাবে না, এটা স্বাভাবিক। এদিকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বাস্তবতা সম্পর্কে সরকারের সরল স্বীকারোক্তিও মানুষের সহানুভূতি সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বাংলাদেশে পড়েছে, এই সত্যটি প্রকাশে সরকারি দল সচেষ্ট হলেও সত্য বলতে গেলে, সরকার এই সত্যটিকে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তেমন একটা সফল হয়নি। অন্যদিকে সরকারি দলের ব্যর্থতাকে বিরোধী দল ঐভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। তাহলে সরকারি দল কোন কারণে সংলাপে বসার আহ্বান জানাবে কিংবা উদ্যোগ গ্রহণ করবে?

এদিকে বিএনপি সংলাপ বিষয়ে টুকটাক মন্তব্য করছে না, তাও নয়। তাদের সিনিয়র একাধিক নেতা এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, সরকারের পদত্যাগ এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানলেই সংলাপের প্রশ্ন আসে!

বিএনপি স্বাভাবিক কারণেই সংলাপের বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের সামনে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের উদাহরণ আছে। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ সংলাপে বসেছিল। আবার ২০১৮ সালে নিজেরাই সংলাপে বসেছিল। ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন গণভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, ‘সংলাপ ভালো হয়েছে’। কিন্তু পরদিনই বললেন ভিন্নকথা। একমাত্র তিন জোটের রূপরেখা তৈরির সময় এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি বিষয় ছাড়া রাজনৈতিক সমঝোতার বড় একটা উদাহরণ পাওয়া যায় না। আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া ও আব্দুল জলিলের মধ্যে ম্যারাথন সংলাপও ছিল ফলাফলশূন্য। কমনওয়েলথ মহাসচিব, জাতিসংঘের দূতের অংশগ্রহণে যেসব সংলাপ হয়েছিল, সেগুলোও ছিল তেমনি। তার পরও ইতিহাস বলে, সংলাপের প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে বিরোধী দলের পরিবেশ তৈরির ওপর। তারা কি সরকারকে এমন কোনো চাপ তৈরি করতে পেরেছে, যাতে সংলাপের জন্য সরকার তাদের আহ্বান জানাতে বাধ্য? ইতিহাস পাঠক জানেন, পাকিস্তানের লৌহমানবখ্যাত ইয়াহিয়া খানও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সংলাপে বসার জন্য পাকিস্তান থেকে উড়ে এসেছিলেন সংলাপের প্রয়োজন হওয়ায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই আবহ তৈরিটা হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। এক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান কিংবা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কথাও বলতে পারেন। তারা দুই জনই বঙ্গভবনে রাজনৈতিক দলগুলোকে ডেকেছিলেন সংলাপের জন্য। তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পরোক্ষ সহযোগিতা করতে বাধ্য হয়েছিল। এখন স্পষ্টত এমন কোনো অবস্থা নেই। অতীতের সংলাপের ফল হচ্ছে, বিরোধীরা সব সময়ই তাদের দাবিতে অনড় থাকে। সরকারি দল তাদের অবস্থানে দৃঢ় থাকে। কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। তার পরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হলে সংলাপে বসে। এমন কোনো পরিস্থিতি হলে হয়তো সংলাপ হতে পারে, এবার ফল যাহোক না কেন।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

ইত্তেফাক/এমএএম