মনোযোগের বাজারজাতকরণ

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৩, ০২:৫০

এরিক আর্থার ব্লেয়ার (১৯০৩-১৯৫০) কালোত্তীর্ণ সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক লেখক। ব্রিটিশ ভারতে জন্মগ্রহণকারী ‘এনিমেল ফার্ম’ খ্যাত এই ইংরেজ লেখক জর্জ অরওয়েল ছদ্মনামেই সমধিক পরিচিত। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। এই বিখ্যাত উপন্যাসটিতে যেসব সংকটের কথা কল্পনা করা হয়েছিল এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হচ্ছে তথ্যের স্বল্পতা। ভবিষ্যতের শাসকরা আরো বেশি করে তথ্য আটকে রাখবে, তথ্য পাওয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবে এমনটি ঘটেনি। তথ্যের স্বল্পতা ১৯৮৪ সালে প্রকট হয়নি। আর এখন তো সবচেয়ে সহজে যা পাওয়া যায়, সেটা হচ্ছে ‘তথ্য’। অন্যান্য পণ্যের মতো তথ্যও উত্পাদন এবং বাজারজাতকরণ করা যায়। পণ্য হচ্ছে, ‘anything that can be offered to a market for attention, acquisition, use or consumption that might satisfy want or need’ (Kotler, 2022)। পণ্যের সংজ্ঞায় দখল, ব্যবহার এবং ভোগের আগেই ‘মনোযোগ’ শব্দটি গুরুত্ব পেয়েছে। William James Zvui Principles of Psychology (1980) বইয়ে মনোযোগের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘attention is the taking possession by the mind, in clear and vivid form, of one out of what may seem several simultaneously possible objects of trains of thought...It implies withdrawal from something in order to deal effectively with others,’ মনোযোগ বলতে নির্দিষ্ট একটা বিষয়কে ফোকাস করাকে বোঝায় না, একই সঙ্গে এটা অসংখ্য প্রতিযোগী তথ্য এবং উদ্দীপককে অগ্রাহ্য করাকেও বোঝায়, যা এ মুহূর্তে প্রাসঙ্গিক নয়, সেটাকে এড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের প্রতি আকর্ষিত হওয়াই মনোযোগ (Kendra Cherry, 2022)। কোন পণ্যকে ভোক্তা কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটা অনেকাংশেই তার প্রত্যক্ষণের ওপর নির্ভর করে। মনোযোগ হচ্ছে প্রত্যক্ষণের একটি পূর্বশর্ত। কোনো নির্দিষ্ট উদ্দীপকের প্রতি ইন্দ্রিয় বা ইন্দ্রীয়সমূহকে নিবদ্ধ করার নামই হলো মনোযোগ। যে মানসিক ক্রিয়ার মাধ্যমে একাধিক বিষয় থেকে চেতনাকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিয়ে একটি বিশেষ বিষয়ে চেতনাকে কেন্দ্রীভূত করা হয় তাকে মনোযোগ বলে। ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণের খরচ গত দুই দশকের সাত থেকে নয় গুণ বেড়ে গেছে। ব্র্যান্ডের প্রতি ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণ করা মার্কেটিংয়ের কাজ। মার্কেটিংয়ের চুম্বকীয় বার্তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে সেটা ক্রেতার মনোযোগ দখল করতে পারে। এই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েও কোনো লাভ হবে না, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ‘মনোযোগ বারজাতকরণ’ শব্দবন্ধ প্রথম ব্যবহার করেন Steve Jerry, পরবর্তী সময়ে এটাকে জনপ্রিয় করে তোলেন Seth Godin.

 ২০০০ সালে একজন মানুষ একটানা গড়ে কোনো বিষয়ে ১২ সেকেন্ড মনঃসংযোগ করতে পারতেন, ২০১৫ সালে এটা ছিল আট সেকেন্ড। এর মানে হচ্ছে বাজারজাতকরণকারীকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে, অন্যথায় সে স্ক্রল করে অন্যদিকে চলে যাবে। মনোযোগ হলো কোনো বিশেষ তথ্যের ওপর কেন্দ্রীভূত মানসিক সংযোগ। তথ্য আমাদের চেতনায় আসে। আমরা বিশেষ কোনো তথ্যের প্রতি মনোযোগ দিই এবং এরপর সিদ্ধান্ত নিই কোনো পদক্ষেপ নেব কি, নেব না।

 একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। দানবীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় বিনা মূল্যে তথ্যসেবা দিচ্ছে। আর আমরা মনোযোগ দিয়ে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভবান করছি। কেউ কেউ গত দুই দশকের অর্থনীতিকে ‘তথ্য অর্থনীতি’ না বলে ‘মনোযোগের অর্থনীতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মনোযোগের অর্থনীতি কথাটি বহু পুরোনো। আজ থেকে প্রায় সিকি শতাব্দী আগে, ১৯৯৭ সালে মাইকেল গোল্ডহেবার ‘Wired’ সাময়িকীতে প্রকাশিত তার ‘Attention Shoppers’ নিবন্ধে প্রথম মনোযোগ অর্থনীতির বিষয়টির অবতারণা করেন।

 মানবেতিহাসের সিংহভাগ জুড়ে তথ্য ছিল দুষ্প্রাপ্য। কয়েক দশক আগেও বেশির ভাগ মানুষ লেখাপড়া জানত না। আধুনিক যুগে সবাই সবকিছু প্রায় বিনা মূল্যে পড়ছে। মানুষের সময় এবং তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষমতা একটুও বাড়েনি। মনোযোগ একটি সীমিত মানসিক সম্পদ। একটি বিষয়ে মনোযোগ দিলে অন্যটির প্রতি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। প্রচুর তথ্যসম্পদ মনোযোগের দারিদ্র্য তৈরি করে।

 বাজারজাতকরণকারীর সরবরাহকৃত তথ্য যাতে প্রতিযোগিতা করে অন্য কোম্পানির তথ্যের চেয়ে বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, সেজন্য তথ্যকে প্রাসঙ্গিক, আগ্রহজনক এবং ব্যক্তিবিশেষের আগ্রহ অনুযায়ী নির্বাচন ও উপস্থাপন করতে হবে। তথ্যের মাধ্যমে ক্রেতা আকর্ষণ করতে হলে তাকে একটা সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা প্রদান করতে হবে। বিক্রেতাকে অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ক্রেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা (engagement) বাড়াতে হবে।

 বাজারজাতকরণ যোগাযোগকারীর প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কোন উদ্দীপক মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারবে, সেটা ঠিক করা। গবেষণা থেকে দেখা গেছে মানুষ তার বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্দীপকটির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। যে যেই সমস্যায় থাকে, সে সেই সমস্যার সমাধানের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়। ভুক্তভোগীর প্রত্যেকটি সমস্যার এক-একটি সমাধানই হচ্ছে ‘পণ্য’। যোগাযোগকারী যা-ই বলুক না কেন বা দেখাক না কেন, ভোক্তা তার নিজের পূর্বস্থিরকৃত মনের অবস্থা দ্বারা উপসংহারে আসবে। ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, পোশাক, সংগীত, খাদ্য এসব প্রায় সব ব্যাপারেই মানুষের একটা মনোভাব থাকে। মনোভাব দ্বারা ব্যক্তির কোনো ধারণা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে দৃঢ় (consistent) মূল্যায়ন, অনুভূতি ও প্রবণতা নির্ধারিত হয়।

 মানুষ যা শেখে তার অনেক কিছুই ভুলে যায়, যা তাদের বিশ্বাস ও মনোভাবকে সমর্থন করে ঐসব তথ্য মনে রাখার প্রবণতা মানুষের মধ্যে বেশি থাকে। নির্বাচিত ধারণ (মনে রাখা) প্রবণতার কারণে ভোক্তা কোনো পণ্যের ভালো গুণগুলোই বেশি মনে রাখবে, প্রতিযোগী পণ্যের গুণাগুণ ভুলে যাবে। ক্রেতা তার পছন্দের পণ্যের ভালো পয়েন্টগুলো মনে রাখে এবং পণ্য পছন্দের সময় ঐ কথাগুলোই বারবার স্মরণ (rehearses) করে।

 মনোযোগ বাজারজাতকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রথম কাজ হচ্ছে যাদের কাছে তথ্য পৌঁছানো হবে, তাদের ব্যবহূত সুনির্দিষ্ট তথ্য প্ল্যাটফরমটি নির্বাচন করা। তার পরের কাজ হচ্ছে অতি সুস্পষ্ট একটি বার্তা তৈরি করা। ক্রেতারা যেসব বিষয়কে মূল্যবান (value) মনে করে কেবল সেই বিষয়গুলোকেই অন্তর্ভুক্ত করা। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ভ্যালু বিবৃতি তৈরি করতে হবে। বিবৃতি তৈরির সময় যে ফরমেটটি এক্ষেত্রে সুপারিশ করা হয়, সেটি হচ্ছে, ‘To...our...is...that’ ফরম্যাট। এক্ষেত্র ‘To’ হচ্ছে সুনির্দিষ্ট টার্গেট অডিয়েন্স। ‘our’ হচ্ছে ব্র্যান্ডের নাম, ‘is’ হচ্ছে জিনিসটি কী? আর ‘that’ হচ্ছে এই জাতীয় অন্যান্য অফারের সঙ্গে কোম্পানির অফারের পার্থক্য (POD)। বার্তা প্রেরণের জন্য একাধিক মাধ্যম ব্যবহার করলে এগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত বার্তায় একটি গল্প থাকতে হবে, যার মধ্যে বাজারজাতকরণের আবেগীয় আবেদনের উপাদান থাকতে হবে। কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে না এমন অন্য ব্র্যান্ডকেও ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণের কাজে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে (co-branding)। যেহেতু দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ লোক ইন্টারেক্টিভ অনলাইনে সংযুক্ত। অতএব মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য একটি আকর্ষণীয় ওয়েবসাইট থাকতেই হবে। মনোহারী যোগাযোগ এবং অন্যান্য উপায়ে ক্রেতার মনে অবস্থান (position) তৈরি করার বিষয়টি স্বীকার করেও বলা যায়, ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে স্থান (place) এবং প্যাকেজিংয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ালমার্টের একটি সুপারসেন্টারে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার আইটেম থাকে। ক্রেতারা পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি চারটির মধ্যে তিনটি সিদ্ধান্ত দোকানে গিয়ে গ্রহণ করে, এবং এ সময়ে তারা প্রতি মিনিটে ৩০০টি আইটেম অতিক্রম করে। অসংখ্য প্রতিযোগী পণ্যের মধ্যে দোকানি আপনার পণ্যটি কোন রেকে (shelf) এবং রেকের কোন অবস্থানে (রেকের নিচের দিকে, চোখের সমান উচ্চতায়, মাথার ওপরে) রেখেছে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বিক্রেতার জন্য ক্রেতার মনোযোগের আকর্ষণের সর্বশেষ হাতিয়ার হতে পারে পণ্যের প্যাকেট। আকর্ষণীয় প্যাকেট মনোযোগ ছাড়া ও পণ্যের সঙ্গে ক্রেতার অ্যানজেমেন্ট বা ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দেয়, যা অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব নয়।

লেখক: অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/এমএএম