সততা মানবচরিত্রের একটি বিশেষ ও শ্রেষ্ঠ গুণ। মানবজীবনে সততার প্রভাব ও প্রয়োজনীয়তা সীমাহীন। মানবসমাজের নিরাপত্তা, সুখশান্তি, উন্নতির ভিত্তি হলো সততা। যারা এই গুণ অর্জন করতে সক্ষম হন, মহান স্রষ্টা দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। সত্যিকার মুমিন সততাকে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকেও ঊর্ধ্বে মনে করেন। কেননা তারা জানেন, সততা ইমান ও ইসলামের পূর্ণতা দান করে। সততা ও বিশ্বস্ততার প্রতি আহ্বান জানিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।’ (সুরা আত তওবা-১১৯)।
মহান স্রষ্টা মানবসমাজকে যে সীমারেখায় চলতে নির্দেশ দিয়েছেন, এগুলোর মধ্যে সততা অন্যতম। শুধু মুসলমান নয়, প্রত্যেক মানুষের জীবনেই সততা প্রয়োজন—তা সে ইসলামের অনুসারী হোক কিংবা অন্য ধর্মের; অফিসার কিংবা কর্মী, শিক্ষক বা ছাত্র, ধনী হোক বা গরিব, পিতামাতা হোক বা সন্তান। মানবজীবনের প্রতিটা বিভাগের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো সততা। এই গুণ মানুষকে উন্নত, আদর্শ ও নৈতিকতায় ভূষিত করে এবং এর মাধ্যমেই মানবজীবনের পূর্ণতা অর্জিত হয়।
সততা ব্যক্তিচরিত্রের আরোপিত গুণ। গুণটি যখন কোনো ব্যক্তির চরিত্রের ওপর আরোপিত হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘সত্’। সততার অস্তিত্ব চিন্তায় ও মননে। সততার ব্যাবহারিক অভিব্যক্তি চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘If Money is lost nothing is lost, wealth is lost something is lost, but character is lost everything is lost’। একজন ব্যক্তির মানসিক বা নৈতিক চরিত্র ভালো হলে তিনি সচ্চরিত্রের অধিকারী হন। অন্যদিকে মানসিক বা নৈতিক চরিত্র খারাপ হলে সে দুশ্চরিত্রের অধিকারী হন।
আল্লাহ পাক কোরআনুল কারিমের বহু স্থানে সততা ও স্বচ্ছতা অবলম্বনকারী নারী-পুরুষের ফজিলত, আখেরাতে তাদের পুরস্কার, তাদের মর্যাদার ব্যাপারে বলেছেন। সততা কেবল সত্য কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সত্য কথা বলার সঙ্গে কাজকর্ম, আকিদা-বিশ্বাস সবগুলোতে সততা অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর কেউ আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য করলে সে নবি, সিদ্দিক (সত্যনিষ্ঠ), শহিদ ও সত্কর্মপরায়ণ—যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন—তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী’। (সুরা নিসা আয়াত-৬৯)।
কিয়ামতের দিন সততার কারণে জান্নাত মিলবে সত্যবাদীদের। এ ব্যাপারে আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ বলবেন, এ সেদিন, যেদিন সত্যবাদীগণ তাদের সত্যের জন্য উপকৃত হবেন, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবেন; আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তার প্রতি সন্তুষ্ট; এটা মহাসাফল্য।’ (সুরা মায়িদা আয়াত-১১৯)
অনেক সত্ গুণের সমষ্টি হলো সততা। অসংখ্য হাদিসে ও সততার গভীরতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। এক হাদিসে রসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়তের বিশুদ্ধতা ও সততার সঙ্গে আল্লাহর পথে শহিদ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জনের প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে শহিদের মর্যাদায় পৌঁছাবে, যদিও সে বিছানায় মৃত্যুবরণ করে।’ (সহিহ মুসলিম)। অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সততা আন্তরিকতার সঙ্গে শাহাদত লাভ করতে চান, শহিদ না হলেও শহিদের মর্যাদা ও সওয়াব দেওয়া হবে।’ (সহিহ মুসলিম)।
রসুলুল্লাহ (স.) আরো বলেন, ‘তোমাদের উচিত সততা ও সত্যতা অবলম্বন করা। কেননা সততা ও সত্যতা মানুষকে পুণ্যের পথে পরিচালিত করে আর পুণ্য জান্নাতের দিকে পরিচালিত করে। অন্যদিকে মিথ্যা নিঃসন্দেহে পাপের দিকে চালিত করে।’
ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যাবতীয় লেনদেনে সততার পরিচয় দিলে তাতে বরকত হয়। নবিজি (স.) ইরশাদ করেন, ‘যদি ক্রেতা-বিক্রেতা সত্য বলে এবং ভালোমন্দ প্রকাশ করে দেয়, তাহলে তাদের লেনদেন বরকতময় হবে। আর যদি উভয়ে মিথ্যা বলে এবং দোষত্রুটি গোপন করে, তাহলে এ লেনদেন থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হবে, (মুসলিম, হাদিস :১৫৩২)।
সততা অবলম্বনকারীদের জন্য মহানবি (স.) সুপারিশ করবেন। সততার প্রশংসা করে মহানবি (স.) বলেন, ‘আমার সুপারিশ তার জন্য, যে সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। এমন নিষ্ঠার সঙ্গে যে তার অন্তর তার মুখকে সত্যায়ন করবে এবং মুখ অন্তরকে সত্যায়ন করবে, (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৮০৭০)।
মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সত্ ও সত্যবাদী হবে এবং কখনোই মিথ্যাবাদী হবে না, এমন নয়। সততা চর্চার বিষয়। সততার বিপরীত হলো ‘মিথ্যা’, যা পাপ, অন্যায় ও অপরাধের মূল উত্স। একটি দেশের সব শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে-রাজনীতিবিদ, বিচারক, আইনজীবী, চিকিত্সক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, সামরিক-বেসামরিক কর্মকতা, ব্যবসায়ী, কৃষিজীবী, পেশাজীবী, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী সবার জন্য সত্ হওয়া অপরিহার্য। নীতির সঙ্গে নৈতিকতা সম্পর্কিত। নীতির কাজ মূল্যবোধ নির্ধারণ করা, আদর্শের মানদণ্ড নির্ণয় করা। আর নৈতিকতা হলো নীতির বাহ্যিক রূপ। নৈতিকতা নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করে। নীতির স্থান কেবল ব্যক্তির চিন্তাচেতনায়, বিবেক, মগজে। আর নৈতিকতা শোভা পায় ব্যক্তির আচার-আচরণে, কাজকর্মে। তাহলে এ কথা বলা যায় যে, আমরা যা বলি, যে কাজ করি, যে ভাবাদর্শ মানি, তা আমাদের ভেতরকার লালনকৃত নীতি-নৈতিকতারই প্রতিচ্ছবি।
তাই, প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য জীবনে সততা ও বিশ্বস্ততার ফসল আহরণে যত্নবান হওয়া। কেননা, সততা ও সত্যবাদিতা আখলাকে হাসানের অন্যরকম বৈশিষ্ট্য। যার মধ্যে এ গুণের সমাহার থাকবে সমাজের সব ধরনের লোক তাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করবে। সর্বোপরি আখেরাতে আল্লাহর কাছে এর বিনিময় লাভ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে।
লেখক: পুলিশ সুপার, চুয়াডাঙ্গা
