বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপি গত পহেলা মার্চ একটি অনুষ্ঠানে বলিয়াছিলেন যে, শ্রেণি-পেশানির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে সরকার কাজ করিতেছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সুষম উন্নয়ন আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম মূল ভাবনা। কারণ, বাংলাদেশ স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক উন্নয়নকাজ। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানকে বিবিধ বৈষ্যমে তিমিরাচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল; কিন্তু দুঃখের বিষয় হইল, স্বাধীনতার অর্ধশতক পরেও সুষম উন্নয়নে আমরা এখনো যথেষ্ট পিছাইয়া রহিয়াছি।
সম্প্রতি ‘ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)’-এর একটি গবেষণায় উঠিয়া আসিয়াছে যে, বাংলাদেশের এডিপি প্রকল্পে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত সাতটি জেলাই মোট বরাদ্দের ৫০ শতাংশ বরাদ্দ পাইতেছে, অথচ স্বল্প বরাদ্দপ্রাপ্ত ২৫টি জেলা পাইতেছে মাত্র ১৩ শতাংশ। বৈষম্য পরিমাপক ‘পালমা রেশিও’ অনুযায়ী ইহার মান ৩ দশমিক ৭২, যাহা এখনো দেশের মধ্যে উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের উচ্চ বৈষম্যকেই নির্দেশ করে। বরাদ্দপ্রাপ্তির দিক হইতে সবচাইতে কম পাইতেছে মেহেরপুর জেলা (শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ) ও পঞ্চগড় (শূন্য দশমিক ৩৯ শতাংশ)। ইহার পরে রহিয়াছে চুয়াডাঙ্গা (শতকরা শূন্য দশমিক ৪১), ঠাকুরগাঁও (শূন্য দশমিক ৪৩), ঝালকাঠি (শূন্য দশমিক ৪৫), ঝিনাইদহ (শূন্য দশমিক ৪৮), বরগুনা (শূন্য দশমিক ৪৮) ও জয়পুরহাট (শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ)।
ইহা ঠিক যে, দেশের পদ্মা সেতু চালু হইবার পাশাপাশি বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন উদ্যোগের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়নবৈষম্য হ্রাসের সুযোগ তৈরি হইয়াছে; কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দের এখনো এত অধিক আঞ্চলিক বৈষম্য কোনোভাবেই কাম্য নহে। কারণ ইহা বাংলাদেশের সুষম উন্নয়নে সবচাইতে বড় অন্তরায়। ইহাতে এই সকল অঞ্চল দারিদ্র্য বিমোচন ও টিকসই উন্নয়নে পিছাইয়া পড়িতেছে। ইহা ছাড়াও বাংলাদেশের সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করিতে বিশেষায়িত এলাকা তথা পাহাড়ি অঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল, হাওর এলাকা ও চরাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ দুঃখের সহিত বলিতে হয়, কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর এলাকার দারিদ্র্যের হার স্বাধীনতার অর্ধশতক বত্সর পরেও ৭৯ শতাংশ। কেন তাহা হইবে?
ইতিপূর্বে নগরায়ণের একটি গবেষণাপত্রেও আমরা দেখিয়াছি, পরিকল্পিত নগরায়ণেও ব্যাপক বৈষম্য রহিয়াছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বাংলাদেশের নগরায়ণে ঢাকাকেন্দ্রিকতা প্রতিনিয়ত বাড়িতেছে। অন্যদিকে অন্যান্য বিভাগীয় শহরসহ জেলা, উপজেলা ও পৌর এলাকার নগরায়ণ হইতেছে অগোছালো ও অপরিকল্পিতভাবে। স্বাভাবিকভাবেই ইহা আমাদের সুষম, পরিকল্পিত ও টিকসই উন্নয়ন সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করিতেছে। আমরা জানি, কর্মসংস্থান, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা—মূলত এই তিন কারণে মানুষ গ্রাম হইতে শহরে আসিতে চাহে। তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা হইল, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ এখন দেশের পাঁচটি নগরে বসবাস করিতেছে। এমন অবস্থায় বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নাই। সমগ্র দেশে সুষম বিনিয়োগের মাধ্যমেই কেবল বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব। আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি যে, শহরের সুবিধা গ্রামে ছড়াইয়া দেওয়ার জন্য সরকার একটি উদ্যোগ লইয়াছে। গ্রামে বিশেষ কিছু সুবিধা রহিয়াছে—যাহার মধ্যে আছে খেলার মাঠ, মুক্ত আলো-বাতাস, সবুজ মাঠ। গ্রামের এই সকল সুবিধাও শহরে ছড়াইয়া দিতে হইবে। শহরের সুবিধা যখন গ্রামে যাইবে এবং গ্রামের সুবিধা যখন শহরে পাওয়া যাইবে তখনই ভারসাম্যপূর্ণ ও সুষম উন্নয়ন হইবে।
আমরা আশা করি, সুষম এই উন্নয়নের ধারা হইবে পরিকল্পিত ও ভারসাম্যপূর্ণ। প্রতিটি পিছিয়ে পড়া জেলা তাত্পর্যপূর্ণ উন্নয়ন পরিকাঠামোর মধ্যে আসিলে তাহা দেশেরও সার্বিক স্থিতিশীলতা ও উন্নতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মূল ভাবনা দেশের ‘সুষম উন্নয়ন’ বাংলাদেশের প্রতিটি কোনায় ছড়াইয়া দিতে হইবে। সুষম উন্নয়ন ব্যতীত আমাদের স্বাধীনতা সার্থক হইবে না।
