উচ্চমাত্রায় এফডিআই আহরণ এখন সময়ের দাবি

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৯, ২১:৩১

স্থানীয়ভাবে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কার্যক্রমে কিছুটা মন্থরগতি পরিলক্ষিত হলেও গত বছর (২০১৮) বাংলাদেশ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আহরণের ক্ষেত্রে চমকপ্রদ সাফল্য প্রদর্শন করেছে। বিশ্বের ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সবচেয়ে বেশি এফডিআই আহরণ করতে সমর্থ হয়েছে। মিয়ানমার বাংলাদেশের সমপরিমাণ এফডিআই আহরণ করলেও তাদের এফডিআই-এর পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ১৮ দশমিক এক শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এফডিআই আগের বছরের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এফডিআই আহরণের ক্ষেত্রে আর কখনোই এমন সাফল্য প্রদর্শন করতে পারেনি। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড)-এর ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট, ২০১৯তে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। রিপোর্টে আরো বলা হয়, ২০১৮ সালে সার্বিকভাবে বিশ্ব এফডিআই এর পরিমাণ ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দেড় লাখ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। তবে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫ শতাংশ বেড়েছে। তাদের আহরিত মোট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার প্রত্যেকেই ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার করে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আহরণ করতে সমর্থ হয়েছে। সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আহরিত এফডিআই বেড়েছে চার শতাংশ। মোট পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত এবং শ্রীলঙ্কার এফডিআই বৃদ্ধি পেলেও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ২৫ শতাংশ কমেছে। বিশ্বের ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশে ১০০ কোটি মানুষ বাস করলেও তারা বৈশ্বিক পুঁজির মাত্র তিন শতাংশ পাচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ যতটা আহরণ করতে পারছে তার চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছে রেমিটেন্স।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আহরিত হয়েছে এর মূল কারণ হচ্ছে, বিদ্যুত্ এবং তৈরি পোশাক সেক্টরে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ পেয়েছে। এছাড়া জাপান টোব্যাকো কোম্পানি বাংলাদেশের ইউনাইটেড টোব্যাকো কোম্পানি ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারে অধিগ্রহণ করেছে। ফলে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের এফডিআই-এর পরিমাণ বেড়েছে। চীন, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং আরো কোনো কোনো দক্ষিণ এশীয় দেশে শ্রমিকের মজুরি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবার কারণে ঐসব দেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের অনেকেই তাদের শিল্প-কারখানা বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দেশে স্থানান্তরের চিন্তা-ভাবনা করছেন। এটা করা হলে আগামীতে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আহরণে সমর্থ হবে। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগ আহরণে কিছুটা মন্থরগতি পরিলক্ষিত হলেও বিদেশি বিনিয়োগকারীগণ বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এটি অবশ্যই একটি ভালো লক্ষণ। নিকট অতীতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই স্থিতিশীল থাকার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীগণ বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এছাড়া সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজির পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে বিদেশি বিনিয়োগকারীগণ বরাবরই আগ্রহী। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জমির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে তারা বাংলাদেশে আসতে সাহসী হচ্ছেন না। কয়েক বছর আগে জাপানি দুটি বৃহত্ শিল্পগোষ্ঠী বাংলাদেশে বড় আকারের পুঁজি বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছিল। তারা বাংলাদেশে সার্ভে করতে এসেছিলেন। কিন্তু শিল্প স্থাপনের মতো উপযুক্ত জমি না পাবার কারণে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হন। এটা নিশ্চিতভাবেই আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপিত হলে শিল্প স্থাপনের মতো উপযুক্ত জমির অভাব অনেকটাই পূরণ হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের অবহেলিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি হবে। এসব জেলায় শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে।

প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া স্বাভাবিক যে, বিশ্বের এত দেশ থাকতে বিদেশি উদ্বৃত্ত পুঁজির মালিকরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আসবে কেন? অনেকেই বলতে চাইবেন, সস্তায় পর্যাপ্ত শ্রমিকের নিশ্চিত যোগান থাকার কারণেই মূলত বিদেশি উদ্যোক্তারা বাংলাদেশকে তাদের পুঁজির চারণ ক্ষেত্র বানাতে চাইছেন। কিন্তু এই ধারণা মোটেও ঠিক নয়। কারণ বাংলাদেশে প্রচুর শ্রমিক পাওয়া যায় ঠিকই কিন্তু সেই শ্রমিক অদক্ষ এবং অপ্রশিক্ষিত। অদক্ষ এবং অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক একটি দেশের জন্য কোনোক্রমেই সম্পদ নয়। বরং তারা যে কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ‘দায়’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। শিল্প-কারখানার জন্য চাই উন্নত প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন প্রশিক্ষিত জনশক্তি। বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে এক হাজার পাঁচশ কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স আহরণ করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি টেকনিশিয়ানরা বছরে গড়ে ছয়শ কোটি মার্কিন ডলার নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি উন্নত কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি যোগান দিতে পারতো তাহলে এই ছয়শ কোটি মার্কিন ডলার দেশেই থাকতে পারতো। জাপান এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব রয়েছে। কিন্তু আমরা সেই অভাব পূরণের কোনো ব্যবস্থাই করতে পারছি না। তাই আমাদের কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নত বিশ্বের উদ্বৃত্ত পুঁজির মালিকরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছে তার পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গেটওয়ে হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের মাধ্যমে চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশে পণ্য ও সেবা রপ্তানি করা যায়। বাংলাদেশে রয়েছে ১৭ কোটি মানুষের এক বিশাল বাজার। উন্নত বিশ্বে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে তিনটি/চারটি দেশ মিলেও ১৭ কোটি মানুষ নেই। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি অর্জন করে চলেছে। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের ভোগ ব্যয় এবং ভোগ করার জন্য অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্য উভয়ই বেড়েছে। এই সামর্থ্য বা ভোগ চাহিদা পূরণের জন্য উন্নত দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে তাদের ব্যবসায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের পারচেজিং পাওয়ার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে থাকে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে পণ্য ও সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা প্রদান করে থাকে। এই সুবিধার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৬টি দেশে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শুল্ক দিতে হয় না। কানাডার একজন উদ্যোক্তা যদি তার দেশে পণ্য উত্পাদন করে তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো দেশে সেই পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা পাবে না। কিন্তু সেই একই কোম্পানি যদি বাংলাদেশে পণ্য উত্পাদন করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো দেশে রপ্তানি করে তাহলে তাকে কোনো শুল্ক প্রদান করতে হবে না। বিশ্বে এমন অনেক দেশ আছে যারা এখন অভ্যন্তরীণ অথবা দ্বিপাক্ষিক সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে। সেইসব দেশে কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী যাবে না। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে চমত্কার এক ব্যতিক্রম। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণভাবে কোনো জাতিগত সংঘাত নেই। বাংলাদেশ তার কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেও বিবাদে লিপ্ত নেই। মিয়ানমার গতবছর বাংলাদেশের সমপরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণ করেছে ঠিকই কিন্তু তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। মিয়ানমার জাতিগত সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে বলে বিশ্বের অনেক দেশই এখন আর সে দেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছে না। বাংলাদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে একজন বিদেশি উদ্যোক্তা নানাভাবে উপকৃত হতে পারছেন। বাংলাদেশে আগত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মতোই সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তারা চাইলে স্থানীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারছেন। তারা অর্জিত মুনাফা তাদের দেশে প্রত্যর্পণ করতে পারছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নানাভাবে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে নিজস্ব মালিকানাধীনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমতি প্রদান করা হচ্ছে। সরকার নানাভাবে শিল্প-কারখানা স্থাপনের উপযোগী অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করে দিচ্ছে। মালয়েশিয়ার অনুকরণে বিনিয়োগ আহরণের জন্য বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) গঠন করা হয়েছে। বিডা বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ কার্যকর হলে বিনিয়োগকারীরা একই ছাদের নিচে অন্তত ১৬টি প্রতিষ্ঠানের সেবা পেতে পারবেন। আশা করা হচ্ছে আগামীতে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যাবে।

n লেখক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক