সংগ্রামী দৃঢ়চেতা সুফিয়া কামাল

আপডেট : ২০ জুন ২০২৩, ১৪:৩৮

'যে জননী ধরেছিল জঠরে আমার মৃত্তিকা ধাত্রীর কোলে দিল উপহার
আমার শৈশব, বাল্য,কৈশোরের বেলা,
মৃত্তিকা মাতার বুকে করেছি যে খেলা’।
বেগম সুফিয়া কামাল এর কবিতার ছন্দেই তাঁকে স্মরণ করি। নিজেই তিনি লিখে গেছেন, ‌‘জন্ম আমার যায়নি বৃথা’। হ্যাঁ, এই মহিয়সী নারীর জন্মবার্ষিকী আজ। নারীমুক্তি, গণতন্ত্র, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মান্ধতা ও অসম্প্রদায়িকতার এক শাশ্বত নিদর্শন এই অকুতোভয় যোদ্ধার  জন্ম হয়েছে ২০ জুন ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের বরিশাল জেলায়।
জন্মের পর বছর না পেরোতেই তাঁর পিতা নিরুদ্দেশ হন, এরপর মায়ের সাথে মামাবাড়িতেই তাঁর বেড়ে ওঠা।।
বরিশালের শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারে অবরোধবাসিনী হিসাবেই ছিল তাঁর জীবন। পরিবারের স্বদেশী আন্দোলনের চেতনায় তিনি বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এই স্বদেশী আন্দোলনের চেতনাকে আঁকড়ে কবি বেগম সুফিয়া কামাল এর শৈশব আবর্তিত ছিলো বলে কবির  দেশপ্রেম এতো গভীর ছিল।
কবির যখন ছয়/সাত বছর বয়স তখন তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সম্পাদিত মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলাম এর ধারাবাহিক ‘হেনা’ উপন্যাস মায়ের সহযোগিতায় বানান করে করে পড়ে ফেলেছিলেন। উপন্যাসের কাহিনী না বুঝলেও এ রকম বহু বই, গল্প, কবিতা পড়ার কথা তিনি নিজের বয়ানে বলেছেন।
আট-নয় বছর বয়সে পর্দানশীন থাকা অবস্থায় লুকিয়ে মামার লাইব্রেরিতে গিয়ে বিনা অনুমতিতে বই পড়তেন।
তাঁর স্মৃতিচারনায় এবং বহুলেখায় জানা যায়, বাড়ির পরিবেশে একদিকে ছিল নবাবী জীবনযাপনের চালচলন, অন্যদিকে ছিল জমিদার বাড়ির পাইক পেয়াদাদের কাছ থেকে বেহালা, পুঁথি শোনার সংস্কৃতিচর্চা। দশ-বারো বছর বয়সেই তিনি বর্ষা বিষয়ে কবিতা লিখেছেন। ছোটোবেলায় তিনি ভাইদের সাথে জুবলী স্কুলে প্যারীলাল মাস্টারমশাই এর কাছে বাল্যশিক্ষা পড়েছেন। মসজিদে গিয়ে ভাইদের সাথে সুর করে ‘কায়েদা বোগদাদি’ পড়েছেন।
মাত্র বারো বছর বয়সেই মামাতো ভাই নেহাল হোসেন এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। কবির নাম ছিল সুফিয়া খাতুন, বিয়ের পর স্বামীর নামানুসারে তাঁর নাম হলো ‘সুফিয়া এন হোসেন। স্বামী নেহাল হোসেনের উৎসাহ উদ্দীপনায় তাঁর সাহিত্যচর্চা আত্মপ্রকাশ করেছিল সেই বয়সে। স্বামীর ব্যবস্থাপনায় তাঁর প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’ প্রকাশিত হয়। বলা প্রয়োজন কবির সাহিত্যচর্চার প্রেরণা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ও রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। ১৯৩২ সালে স্বামী নেহাল হোসেনকে হারিয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। এই সংগ্রামী দৃঢ়চেতা এবং মার্জিত ব্যক্তিত্বের অধিকারীর জীবনে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীর সহমর্মিতায় তিনি লক্ষ্যে বীরদর্পে এগিয়ে গেছেন। ১৯৩৯ সনে কবির হিতাকাঙ্ক্ষী এডভোকেট কামাল উদ্দিন খাঁনকে বিয়ে করে, বেগম সুফিয়া কামাল হিসাবে পরিচিতি পান। ১৯৭৭সাল অবধি তাঁদের দাম্পত্য জীবন কেটেছে। তাঁদের সংসারেই বাংলাদেশের আলোকিত নারী, নারীর অধিকার আদায় ও নারীজাগরণের আলোকবর্তিকা এডভোকেট সুলতানা কামালের জন্ম।
দেশভাগের পর থেকেই তিনি রাজনীতি সচেতন নারী হিসাবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করলেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথকে যখন তৎকালীন সরকার নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন তখন বেগম সুফিয়া কামাল তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এভাবে বিভিন্ন সংগ্রামে ৫২এর ভাষা আন্দোলন, ৬৮এর অসহযোগ আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যূত্থান, ৭১এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগ্রামসহ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, এ নারী জাগরণের অগ্রদূত, এবং সাহিত্যচর্চা ইত্যাদি নিয়ে সুফিয়া কামাল এর জীবন একসূত্রে ছিল গাঁথা।
১৯৭১সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের বাসায় বন্দী জীবন যাপন করেছেন। কিন্তু শুধু বসে থাকেননি, যুদ্ধকালের সেই বন্দী জীবনের যাতনা প্রতিদিন লিখে গেছেন একটি গোপন খাতায়। তাঁর এই স্মৃতিচারণের কথা ‘একাত্তরের ডায়েরি’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। সবচেয়ে স্মরণীয় কাজ ছিল, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনীর হাতে নির্যাতিতা, ক্ষতিগ্রস্ত, অসহায় মা বোনদের পাশে থাকা। কয়জন পারে এ বিশাল দায়িত্ব পালন করতে! সুফিয়া কামাল আজীবন সাহিত্য সাধনা এবং একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলন ও সংগঠনে আমৃত্যু ব্যাপৃত থাকার ঐতিহাসিক ঘটনাবলি এবং বিচিত্র ঘাত প্রতিঘাত ডিঙিয়ে তাঁর জীবনকে তিনি নিজেই নির্মাণ করেছিলেন। সতত জানাই অতল শ্রদ্ধা।

ইত্তেফাক/এসসি