এই অধোগতি রোধ করিতে হইবে

আপডেট : ২২ জুন ২০২৩, ০৪:০০

জমি কিংবা অন্য সকল সহায়সম্পত্তি লইয়া বিরোধের জের ধরিয়া সন্তানের হাতে পিতা কিংবা মাতার খুনের ঘটনা আমরা প্রায়শই পত্রপত্রিকায় দেখিয়া থাকি। অনলাইনে সার্চ দিলে এই ধরনের মর্মান্তিক দুঃখজনক খবরের অভাব হইবে না। কয়েক মাস পূর্বে ময়মনসিংহে লিখে দেওয়া জমির দাগ নম্বর ভুল হইবার কারণে ছেলের দায়ের কোপে পিতা জয়নুদ্দিন মারা যান। ফরিদপুরে পিতা হারুণ অর রশিদকে হত্যার দায়ে ছেলে মিলন চৌধুরীকে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়াছে আদালত। অন্যদিকে সিলেটের গোলাপগঞ্জে পিতা ও মাতাকে হত্যার দায়ে আতিকুর রহমান রাহেল নামে এক পাষণ্ডকে মৃত্যুদণ্ড দিয়াছে আদালত। এই ধরনের খবরের ইয়ত্তা নাই। মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত—সৃষ্টির সেরা জীব; কিন্তু কিছু মানুষ  মাঝেমধ্যে এমনই কিছু অমানবিক কাজ করিয়া বসে—যাহা তাহার মনুষ্যত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলিয়া দেয়।

কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একজন সন্তান কেবল সম্পত্তির কারণে তাহার পিতা বা মাতাকে হত্যা করিবার কথা চিন্তা করিতে পারে? আমরা দেখিতেছি ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও প্রতিযোগিতার যুগে মানুষ অত্যধিক আত্মকেন্দ্রিক হইয়া পড়িয়াছে। দেখা যাইতেছে, আমরা যেই সমাজে বাস করিতেছি সেইখানে মানুষে-মানুষে বিশ্বাস, আস্থা, ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সৌহার্দ-সম্প্রীতি যেন অভিধানের ভিতরেই আবদ্ধ হইয়া পড়িতেছে। প্রকাশিত সংবাদসমূহের বাহিরেও দেশের শতসহস্র গৃহকোণে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা রহিয়াছে, যাহার খুব সামান্য অংশই চার দেওয়ালের বাহিরে আসিতে পারে। যিনি তাহার পিতা-মাতাকে ‘বোঝা’ মনে করিতেছেন, তিনিও তো একদিন বৃদ্ধ হইবেন! স্কুলের পাঠ্যবইতে এখনো ভাব-সম্প্রসারণ হিসাবে পড়ানো হয়—দাঁত থাকিতে মানুষ দাঁতের মর্ম বোঝে না। এই ভাবটি সম্প্রসারণে অবধারিতভাবে চলিয়া আসে পিতা-মাতার কথা। অর্থাৎ মানুষ বহু ক্ষেত্রেই পিতা-মাতা বাঁচিয়া থাকিতে তাহাদের মর্ম যথাযথভাবে উপলব্ধি করিতে পারেন না। নূতন যুগ, নূতন জীবন; মানুষ অত্যধিক আত্মকেন্দ্রিক। ইহার সহিত রহিয়াছে পারিপার্শ্বিক শিক্ষা। সেই কারণে পত্রপত্রিকা খুলিলেই দেখা যায় বিভিন্ন স্থানে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তথা ‘মাতা-পিতা’র উপর নির্যাতন চলিতেছে বিবিধ পন্থায়। নিশ্চয়ই আমাদের সমাজে এখনো ভালো সন্তানের সংখ্যাই অধিক; কিন্তু মাত্র ১০ শতাংশও যদি কুপুত্র থাকে, তাহা হইলে মোট বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কমপক্ষে অর্ধকোটি পিতা-মাতা প্রতিনিয়ত বিবিধ নির্যাতনের শিকার হইতেছেন। সংখ্যাটি কিন্তু বিপুল! এই জন্য ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণের আইন করা হয়। এই আইনটিই সভ্য সমাজে লজ্জার প্রতীকও বটে। কারণ, যাহাদের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর আলো-বাতাস পাইলাম, তাহাদের কিনা বৃদ্ধ বয়সে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করিলাম! এই ধরনের কুসন্তানদের জন্যই ‘সোজা আঙুলে ঘি উঠে না’ বিধায় ‘আঙুল বাঁকা করিয়া’ এই আইন তৈরি করিতে হইয়াছে বটে; কিন্তু দুঃখের সহিত বলিতে হয়, আইন আছে কি নাই, তাহা জানেনই না অধিকাংশ বৃদ্ধ পিতা-মাতা কিংবা নির্যাতনকারী সন্তান। এই কারণে আইন থাকা সত্ত্বেও দেখা যাইতেছে অনেক পরিবারেই বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানের নিকট হইতে ভরণপোষণ পাইতেছেন না; বঞ্চনার শিকার হইতেছেন।

নির্যাতনকারী সন্তানেরা কি জানেন না—মহান সৃষ্টিকর্তা পবিত্র কুরআন শরিফ ও হাদিসে বারংবার তাহার ইবাদতের পরই পিতা-মাতার খেদমতের কথা বলিয়াছেন এবং পিতা-মাতার খেদমত করাকে ফরজে আইন ইবাদত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন! হিন্দুধর্মের মনুসংহিতায়ও বলা হইয়াছে—সন্তানের জন্য পিতা-মাতা যেই ক্লেশ সহ্য করেন পুত্রপুত্রী শত শত বছরে, শত শত জন্মেও সেই ঋণ পরিশোধ করিতে সমর্থ নহে। তবে সন্তান অমানুষ হওয়ার জন্য তাহাদের পিতা-মাতারও কিঞ্চিত দায় রহিয়াছে। সন্তান যাহাতে অমানুষ হইতে না পারে সেই ব্যাপারে গুড প্যারেন্টিং গুরুত্বপূর্ণ। পিতা-মাতাকেও ইহা মনে রাখিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন